লম্বা ছুটি শেষে আজ অনেকেই ফিরছেন কর্মস্থলে, নগরজীবনও ধীরে ধীরে ফিরে পাবে তার চেনা ব্যস্ততা। সড়ক, রেল ও নৌপথে বাড়বে যাত্রীর চাপ। তাই তাড়াহুড়ো নয়, বাড়তি সতর্কতাই হোক ফেরার সঙ্গী। চালক যেন পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিয়ে গাড়ি চালান, অতিরিক্ত যাত্রী বহন ও ঝুঁকিপূর্ণ যান এড়িয়ে চলুন, আর যাত্রাপথে আবহাওয়া ও যানজটের খবর রাখুন। শিশু ও বয়স্কদের দিকে বিশেষ নজর দিন, মালপত্র ও ব্যক্তিগত কাগজপত্র সামলে রাখুন। মনে রাখবেন, কর্মস্থলে এক দিন দেরিতে পৌঁছানো পুষিয়ে নেওয়া যায়; একটি দুর্ঘটনার ক্ষতি সহজে পুষিয়ে নেওয়া যায় না। নিরাপদে ফিরুন, সুস্থভাবে কাজে যোগ দিন—আপনার অপেক্ষায় আছে পরিবার, আপনার কর্মস্থল।
সপ্তাহের হিসাব মেলাতে বসলে দেখা যায়, মানুষের ব্যক্তিগত খাতায় ছুটি থাকলেও রাষ্ট্রের খাতায় ছুটি বলে কিছু নেই। কোথাও স্বাধীনতার পরিসর বাড়ছে, কোথাও রান্নাঘরের চুলা জ্বালানোর গ্যাস নেই; একদিকে শিশুর জ্বর, অন্যদিকে কিশোরের হাতে অপরাধের ছায়া। পৃথিবীও আজকাল এমন এক সংসার, যেখানে প্রত্যেকেই নিজের ঘরের আগুন নেভাতে ব্যস্ত, অথচ প্রতিবেশীর বাড়িতে আগুন লাগলে তার ধোঁয়া নিজের জানালায় এসে ঢোকে। আজকের দিনের মূল সুর তাই—স্বাধীনতার স্বাদ, নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা এবং শান্তির সন্ধান।
বাংলাদেশের জন্য আজ একটি আশাব্যঞ্জক খবর আছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ফ্রিডম হাউসের Freedom on the Net 2026 প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ইন্টারনেট স্বাধীনতার স্কোর ৪৫ থেকে বেড়ে ৫০ হয়েছে। টানা দ্বিতীয় বছরের মতো বড় ধরনের ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা না ঘটাকে এই অগ্রগতির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয়েছে। তবে স্কোর বাড়লেই যে স্বাধীনতার সব দরজা খুলে গেছে, তা ভাবার কারণ নেই; প্রতিবেদনটি বাংলাদেশকে এখনও ‘আংশিক স্বাধীন’ শ্রেণিতে রেখেছে এবং অনলাইন বক্তব্যের কারণে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার উদ্বেগও উল্লেখ করেছে। স্বাধীনতা এমন এক পাখি, তাকে খাঁচা থেকে বের করাই শেষ কথা নয়, আকাশে উড়তে দেওয়াও চাই।
এদিকে ঢাকার নাড্ডা, কালাচাঁদপুর, বসুন্ধরা, জোয়ার সাহারা, ভাটারা ও বারিধারা জে ব্লকসহ কয়েকটি এলাকায় জরুরি পাইপলাইন মেরামতের জন্য আজ দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে তিতাস। স্বাধীনতার সূচক বাড়ছে, কিন্তু নাগরিকের দুপুরের রান্না চার ঘণ্টার জন্য অনিশ্চিত—উন্নয়নের এই দুই হিসাব পাশাপাশি রাখলে বাস্তবতার চেহারাটা বেশ পরিষ্কার হয়।
জনস্বাস্থ্যের খবরটি আরও উদ্বেগের। স্বাস্থ্য অধিদফতরের ২৩ অক্টোবরের হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন করে ১ হাজার ২৯৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে সাতজনের মৃত্যুর খবর এসেছে; মার্চের মাঝামাঝি থেকে এ-সংক্রান্ত মৃত্যুর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২১৪। এই সংখ্যাগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয়—প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একটি পরিবার, একটি শূন্য বিছানা, কারও অসমাপ্ত শৈশব। অথচ জনস্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের আলোচনা অনেক সময় মৌসুমি অতিথির মতো; রোগ বাড়লে আসে, রোগ কমলে বিদায় নেয়।
মশার সঙ্গে লড়াইয়ে শুধু নাগরিকের অসতর্কতাকে দায়ী করলে চলবে না, পরিচ্ছন্নতা, নজরদারি, চিকিৎসা ও টিকাদানের ব্যবস্থাও কার্যকর হতে হবে। বরগুনার পাথরঘাটায় মাদক ও কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে ২১ জনকে আটক করেছে পুলিশ; তাদের মধ্যে ছয়জনের বয়স ১৪ থেকে ১৬ বছর। নয়টি মোটরসাইকেলও জব্দ করা হয়েছে। আটক হওয়া অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়—সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় ও অভিযোগ যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
তবে ছেলেবেলার বয়সেই কেউ অপরাধের সন্দেহে পুলিশের গাড়িতে উঠলে প্রশ্নটি শুধু আইনশৃঙ্খলার থাকে না; পরিবার, শিক্ষা, মাদকপ্রবণ পরিবেশ এবং সমাজের দায়ও সেখানে এসে দাঁড়ায়।
আজ ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ দিবস। প্রতিষ্ঠার ৮১তম বছরে এসে সংস্থাটির সামনে প্রশ্নটি বেশ পুরোনো, কিন্তু উত্তরটি এখনও অধরা: পৃথিবীতে যুদ্ধ থামানোর জন্য যে প্রতিষ্ঠান, যুদ্ধ যখন পৃথিবীর একাধিক প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তার হাত এত ছোট হয়ে যায় কেন?
কালের কণ্ঠের সম্পাদকীয় ‘বিশ্ব যখন যুদ্ধের ময়দানে, জাতিসংঘ তখন কোথায়’ গাজা, ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকা এবং সংস্কারের প্রয়োজন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। জাতিসংঘের সীমাবদ্ধতা অস্বীকার করা যায় না; নিরাপত্তা পরিষদের ক্ষমতার ভারসাম্য, ভেটো এবং বড় শক্তিগুলোর স্বার্থ অনেক সময় সম্মিলিত পদক্ষেপকে আটকে দেয়। কিন্তু জাতিসংঘকে অকার্যকর বলে সরিয়ে রাখলেই কি যুদ্ধ থামবে? বরং দরকার এমন সংস্কার, যেখানে আন্তর্জাতিক আইন কেবল দুর্বল রাষ্ট্রের জন্য উপদেশ হয়ে থাকবে না, শক্তিশালী রাষ্ট্রের জন্যও বাধ্যবাধকতা হবে। অন্যদিকে, ইন্টারনেট স্বাধীনতার উন্নতি নিয়ে আমাদের আত্মতৃপ্তিরও অবকাশ সীমিত। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং দায়িত্বশীলতার সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আন্তর্জাতিক শান্তি ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও একই মাপকাঠি প্রয়োগ করা দরকার। নীতির সুবিধামতো ব্যাখ্যা বদলালে নীতিরই মান থাকে না।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সেই পুরোনো সত্যটিই আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে-যুদ্ধের দাম শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই দিতে হয়। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জলপথে তেলবাহী জাহাজে হামলা এবং নতুন সংঘাতের আশঙ্কায় বিশ্ব জ্বালানি বাজার অস্থির।
রয়টার্সের ২৩ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি মাসে হরমুজ প্রণালি ও পার্শ্ববর্তী জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। তেলের ট্যাংকারে আঘাত লাগলে তার অভিঘাত শুধু সমুদ্রের ঢেউয়ে থামে না; পরিবহন ব্যয়, পণ্যের দাম, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ওপরও পড়তে পারে। যুদ্ধের মানচিত্রে দূরত্ব মাপা হয় কিলোমিটারে, কিন্তু বাজারে তার দূরত্ব মাপা হয় টাকায়। এদিকে ফ্রান্স ও ইতালির বিভিন্ন শহরে জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম ও সরকারি ব্যয়সংকোচনের প্রতিবাদে আজ বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সে সম্ভাব্য সহিংসতা ঠেকাতে ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে; ইতালির রোম ও মিলানেও ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং ড্রোন নজরদারির পরিকল্পনা রয়েছে। মানুষ যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের চাপে রাস্তায় নামে, তখন পুলিশ দিয়ে রাস্তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কিন্তু অসন্তোষের কারণ দূর করা যায় না।
শনিবারের এই বার্তা তাই কোনো অলীক আশাবাদে দিন শেষ করতে চায় না। ইন্টারনেটে স্বাধীনতা বাড়ুক, কিন্তু সেই স্বাধীনতা যেন ভয়ের কাছে মাথা না নোয়ায়; গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক থাকুক, হাসপাতাল রোগীর ভার সামলাতে পারুক, কিশোরেরা অপরাধের বদলে সম্ভাবনার পথে ফিরুক। জাতিসংঘ যুদ্ধ থামাতে কার্যকর হোক, আর বিশ্বনেতারা বুঝুন—একটি প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হলে তার অভিঘাত অন্য মহাদেশের রান্নাঘরেও পৌঁছায়। এই পৃথিবীর সভ্যতা অনেক দূর এগিয়েছে, শুধু সভ্য মানুষের ব্যবস্থাপত্রটি এখনও পুরো লেখা হয়নি। কথাটি রসিকতা হলেও হিসাবটি নির্মম। রাষ্ট্রের সাফল্য শেষ পর্যন্ত তার নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে মাপা হয়—নিরাপদে বেঁচে থাকা, স্বাধীনভাবে কথা বলা, সময়মতো চিকিৎসা পাওয়া এবং নিশ্চিন্তে ঘরে ফেরার অধিকার দিয়ে। এই সাধারণ অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে পারলেই বড় বড় ঘোষণার আর আলাদা করে বিজ্ঞাপন দিতে হবে না।
লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব।




