বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

মধ্যপ্রাচ্যের সংকট: সামরিক শক্তি নয়, কূটনীতিই সমাধানের পথ

মো. মুখলেছুর রহমান
প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৩ পিএম

শেয়ার করুন:

মধ্যপ্রাচ্যের সংকট: সামরিক শক্তি নয়, কূটনীতিই সমাধানের পথ
ছবি- ঢাকা মেইল

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আবেগ, রাজনৈতিক পক্ষপাত কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্যের পরিবর্তে তথ্য, প্রমাণ ও বাস্তব কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। কোনো রাষ্ট্রের প্রকাশ্য ঘোষণা, কূটনৈতিক অবস্থান এবং বাস্তব নীতির মধ্যে কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে, তা বিবেচনা না করলে আঞ্চলিক রাজনীতির প্রকৃত চিত্র বোঝা শুধু কঠিনই নয়, ক্ষেত্রবিশেষে অসম্ভবও বটে।

সৌদি আরব, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইয়েমেনের হুতি আন্দোলনসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন। প্রত্যেকের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। তবে সেই স্বার্থ রক্ষার নামে নেওয়া কোনো পদক্ষেপের মানবিক পরিণতি, আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য এবং আঞ্চলিক শান্তির ওপর প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে কেবল দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের সংঘাত হিসেবে দেখলে বাস্তবতার বহু জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ দিক অস্পষ্ট রয়ে যাবে। এই অঞ্চলের সমস্যাগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন, নিরাপত্তা-উদ্বেগ, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা, জ্বালানি ও বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কৌশলগত হিসাব। এসব উপাদানকে সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করাই বাস্তবসম্মত সমাধানের প্রথম শর্ত।

সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। দুই দেশের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, নিরাপত্তা-উদ্বেগ এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা বিভিন্ন সময়ে ইয়েমেনসহ বৃহত্তর অঞ্চলের পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করেছে। তবে এই সম্পর্ককে শুধু ধর্মীয় বা আদর্শিক বিরোধের মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ক্ষমতা, আঞ্চলিক মিত্রতা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু এই সম্পর্কের ভিত্তিতে সৌদি আরবের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের স্বার্থে পরিচালিত বলে আখ্যায়িত করা সমীচীন হবে না। একইভাবে, ইরানের আঞ্চলিক নীতি নিয়ে সমালোচনা থাকলেও তার প্রতিটি পদক্ষেপকে কেবল আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা হিসেবে গন্য করা সুবিবেচনাপ্রসূত হবে না।

প্রতিটি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে দেখতে হবে, তাদের ঘোষিত নীতি বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে। সামরিক সহযোগিতা, অস্ত্র ক্রয় ও বিক্রয়, কূটনৈতিক চুক্তি, বাণিজ্যিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ এবং সংঘাত নিরসনে গৃহীত উদ্যোগ—এসব তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলোর প্রকৃত ভূমিকা সম্পর্কে অধিকতর নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া সম্ভব।

বিশেষত ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে সৌদি আরবসহ আরব রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকা গভীরভাবে মূল্যায়ন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ন্যায়সংগত অধিকার সমর্থনের ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার কার্যকারিতা নির্ভর করে বাস্তব কূটনৈতিক উদ্যোগ, মানবিক সহায়তা, আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির প্রচেষ্টা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানে সংশ্লিষ্ট দেশ সমূহের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও অবদানের ওপর।

গাজার মানবিক সংকট মোকাবিলা, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আরব রাষ্ট্রগুলো কী ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে এবং সেসব উদ্যোগের বাস্তব ফলাফল কী—এসব প্রশ্নের উত্তর তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতেই খুঁজতে হবে। একই মানদণ্ড যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ইরান এবং অন্যান্য প্রভাবশালী রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে বিভিন্ন দেশের বিশ্লেষকেরা ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। কেউ যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নীতিকে গুরুত্ব দেন, কেউ ইসরায়েলের নিরাপত্তা কৌশলকে প্রধান বিবেচ্য মনে করেন, আবার কেউ ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং হুতি আন্দোলনের সামরিক তৎপরতার ওপর জোর দেন।

এসব বিশ্লেষণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও যুক্তি পাওয়া যেতে পারে। তবে কোনো বিশ্লেষকের জাতীয়তা, ধর্মীয় পরিচয়, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিতে তার বক্তব্যকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সত্য বা মিথ্যা বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। বক্তব্যের পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে, তথ্যের উৎস কতটা নির্ভরযোগ্য, যুক্তির মধ্যে অসংগতি আছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনার প্রেক্ষাপট যথাযথভাবে বিবেচিত হয়েছে কি না—এসব বিষয়ই হওয়া উচিত মূল্যায়নের ভিত্তি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্যের ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। কোনো বিশ্লেষকের নামে প্রচারিত উদ্ধৃতি প্রকাশের আগে মূল সাক্ষাৎকার, ভিডিও, নিবন্ধ কিংবা নির্ভরযোগ্য সংবাদসূত্র যাচাই করা জরুরি। বক্তব্যের আংশিক অংশ উদ্ধৃত করলে তার অর্থও পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আকর্ষণীয় বক্তব্যের চেয়ে যাচাইযোগ্য তথ্যকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

ইয়েমেনের সংঘাতকে শুধু সৌদি আরব ও ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করলে দেশটির নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা উপেক্ষিত হয়। ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা, বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ—সব মিলিয়ে সংকটটি জটিল আকার ধারণ করেছে।

হুতি আন্দোলনের সামরিক তৎপরতা এবং বিভিন্ন পক্ষের সংঘাত ইয়েমেনের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। অন্যদিকে, সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানের প্রভাব, বিধিনিষেধ এবং বন্দর ও বিমানবন্দরের কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা নিয়েও মানবিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন রয়েছে। এসব বিষয়ের প্রতিটি আলাদাভাবে যাচাই করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

ইয়েমেনের সংকট নিরসনে কোনো একটি পক্ষকে সম্পূর্ণ নির্দোষ কিংবা অন্য পক্ষকে সব সমস্যার একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা সমাধানের পথকে সংকুচিত করতে পারে। বরং সংঘাতের বিভিন্ন পর্যায়ে কার কী ভূমিকা ছিল, কোন পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে এবং কোন উদ্যোগ রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি করেছে—এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, জ্বালানি এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা কোনো পক্ষের রাজনৈতিক বিজয়ের অপেক্ষায় রাখা যায় না।

ইয়েমেন ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নিরসনে কয়েকটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

প্রথমত, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংলাপ নিশ্চিত করতে হবে। ইয়েমেনের সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রধান পক্ষগুলোকে আলোচনায় আনতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার, হুতি আন্দোলন, দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষের রাজনৈতিক উদ্বেগ ও স্বার্থকে বিবেচনায় নিতে হবে। শুধু সামরিক শক্তির ভারসাম্য দিয়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

দ্বিতীয়ত, মানবিক সহায়তার অবাধ ও নিরাপদ প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি এবং অন্যান্য জরুরি পণ্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে অযৌক্তিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা জরুরি। নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রয়োজন থাকলেও তা যেন মানবিক সহায়তা বিলম্বিত বা বাধাগ্রস্ত করার কারণ হয়ে না দাঁড়ায় - সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে। 

বন্দর ও বিমানবন্দরের কার্যক্রম এমনভাবে পরিচালনা করা দরকার, যাতে বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং সাধারণ মানুষের জরুরি প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে।

তৃতীয়ত, সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমানো, পারস্পরিক নিরাপত্তা-উদ্বেগ নিয়ে আলোচনা এবং আঞ্চলিক সংঘাত প্রশমনে সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা ও আস্থা তৈরির ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।

চতুর্থত, আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভূমিকা হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ ও জবাবদিহিমূলক। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশ, চীন, রাশিয়া এবং জাতিসংঘের উচিত যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা ও রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া। কোনো একক শক্তির সামরিক আধিপত্যের ওপর নির্ভর না করে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা-উদ্বেগ এবং সংঘাতের মূল কারণগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে।

পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুসরণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বেসামরিক মানুষ ও বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা, নির্বিচার হামলা চালানো কিংবা মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। হাসপাতাল, পানি সরবরাহব্যবস্থা, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং খাদ্য সরবরাহের অবকাঠামোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য তদন্ত ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করতে হবে।

ষষ্ঠত, ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে দেশটির জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। বাইরের শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে ইয়েমেনের জনগণ যেন অনির্দিষ্টকাল ধরে যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে না থাকে। রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিকে শান্তি-প্রক্রিয়ার অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।


ফিলিস্তিনের সংকট এবং ইয়েমেনের যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক নয়। তবে উভয় ক্ষেত্রেই বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, মানবিক সহায়তা, আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ এবং জবাবদিহির প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।

ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা ও ন্যায়সংগত অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি যেমন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে, তেমনি ইয়েমেনের জনগণের জীবন, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নও উপেক্ষা করা যায় না। কোনো রাষ্ট্রের পরিচয়, সামরিক শক্তি, কৌশলগত মিত্রতা কিংবা আন্তর্জাতিক প্রভাবের কারণে মানবাধিকারের মানদণ্ড বদলে যাওয়া উচিত নয়।

আরব রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে আরও কার্যকর কূটনৈতিক ভূমিকা প্রত্যাশা করা সংগত। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশ, চীন, রাশিয়া এবং অন্যান্য প্রভাবশালী রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে—তারা যেন নিজেদের মিত্র ও প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করে। মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনকে কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহারের উপকরণে পরিণত করা হলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়।

মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের দরকার শান্তি, আধিপত্যের প্রতিযোগিতা নয়।

মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের স্থায়ী সমাধান সামরিক শক্তির প্রদর্শন কিংবা প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার প্রতিযোগিতার মধ্যে নিহিত নয়। সামরিক সক্ষমতা কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু তা একা রাজনৈতিক বৈধতা, সামাজিক স্থিতিশীলতা কিংবা দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না। বরং সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে মানবিক বিপর্যয়, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং আঞ্চলিক অবিশ্বাস আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সৌদি আরবের নিরাপত্তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ইয়েমেনের মানুষের জীবন ও মর্যাদাও গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক স্বার্থ বিবেচ্য, কিন্তু তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষের সামরিক তৎপরতা অন্য দেশের বেসামরিক মানুষের জন্য হুমকি সৃষ্টি করলে তারও জবাবদিহি থাকতে হবে। একইভাবে, ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষা এবং গাজার মানবিক সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকা অপরিহার্য।

এখন প্রয়োজন দোষারোপের প্রতিযোগিতা নয়; প্রয়োজন প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ, মানবিক দায়বদ্ধতা এবং বাস্তবসম্মত কূটনীতি। ইয়েমেনের যুদ্ধ ও মানবিক সংকট নিরসন, সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমন, ফিলিস্তিনিদের ন্যায়সংগত অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগগুলোকে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার পরিপূরক অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

মধ্যপ্রাচ্যের জনগণের ভবিষ্যৎ কোনো একক রাজতন্ত্র, সামরিক জোট কিংবা বৈশ্বিক শক্তির কৌশলগত হিসাবের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। সেই ভবিষ্যতের ভিত্তি হতে হবে জনগণের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পারস্পরিক সম্মান এবং ন্যায়ভিত্তিক আঞ্চলিক সহযোগিতা।

শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু আলোচনার আহ্বান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আলোচনায় বসার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বাস্তব পদক্ষেপ এবং সব পক্ষের জন্য প্রযোজ্য জবাবদিহি। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ সামরিক আধিপত্যের প্রতিযোগিতায় নয়, বরং ন্যায়সংগত রাজনৈতিক সমাধান ও কার্যকর কূটনীতির মধ্যেই নিহিত।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক এবং মানবাধিকার কর্মী

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর