মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

পূজার আগে ৩৪ স্থানে হামলা-ভাঙচুরের অভিযোগ, পুলিশের যাচাইয়ে ভিন্ন তথ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২৩ পিএম

শেয়ার করুন:

পূজার আগে ৩৪ স্থানে হামলা-ভাঙচুরের অভিযোগ, পুলিশের যাচাইয়ে ভিন্ন তথ্য
বাংলাদেশ পুলিশ।

চলমান দুর্গাপূজার আগে দেশের ৩৪টি স্থানে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর ও মন্দিরে চুরির ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছিল। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে গণমাধ্যমে এসব খবর প্রকাশিত হয়। কিন্তু পুলিশের মাঠপর্যায়ে তদন্ত ও তথ্য যাচাইয়ে এসব ঘটনার অধিকাংশের ক্ষেত্রে ভিন্ন কারণ উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে নিজেদের মধ্যে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, সরকারি বরাদ্দ বণ্টন নিয়ে বিরোধ, পেশাদার বা অভ্যাসগত চোর কর্তৃক মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি এবং মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা।

পুলিশের মাঠপর্যায়ের যাচাই অনুযায়ী, এসব ঘটনার পেছনে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করা, সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করা কিংবা নির্বিঘ্নে দুর্গাপূজা উদ্‌যাপনে বাধা দেওয়ার উদ্দেশ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের উদ্দেশ্যে ঘটনাগুলো ঘটেছে বলে প্রচার করা হলেও যাচাইয়ে এর সত্যতা পাওয়া যায়নি বলেও জানিয়েছে পুলিশ। সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাতে বাংলাদেশ পুলিশের ফেইসবুক পেজে এক পোস্টে এসব তথ্য জানানো হয়।

পোস্টে পুলিশ বলছে, ‘শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে প্রকৃত অর্থে দুর্বৃত্তদের মাধ্যমে সংগঠিত হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর এবং মন্দিরে চুরির ঘটনাগুলোতে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দিয়ে পরিস্থিত স্বাভাবিক রাখা, আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, অধিকাংশ ঘটনায় প্রকৃত আসামি গ্রেফতার ও চোরাই মালামাল উদ্ধার, বিবাদমান পক্ষগুলোর সাথে সমঝোতা এবং পূজা মণ্ডপের সার্বিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রেখেছে।

‘বর্তমানে সারাদেশে প্রায় ৩৩ হাজারের বেশি পূজা মণ্ডপে নিরাপদে নির্বিঘ্নে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাাপূজা উদযাপিত হচ্ছে। ’

পুলিশের পোস্টে কয়েকটি ঘটনার বর্ণনাও তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো-

১, গত ১৬ অক্টোবর দুপুর আনুমানিক আড়াই টায় নারায়ণঞ্জের আড়াইহাজার থানাধীন দুর্গাপূজা মণ্ডপ কেন্দ্র নং-১৯, ‘রামচন্দ্রদী মধ্য মনিপাড়া সার্বজনীন দুর্গাপূজা মণ্ডপ’ (অস্থায়ী মণ্ডপ)-এর প্রতিমা গাড়ি হতে নামিয়ে পূজা মণ্ডপে স্থাপনের জন্য নেওয়ার সময় অসুরের ডানহাত সামান্য ভেঙে যায়। অসাবধানতাবশত ঘটনাটি ঘটেছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। 

পূজা মণ্ডপের সভাপতি মোহন বাশি দাস এবং সাধারণ সম্পাদক রাজিব চন্দ্র দাস প্রতিমা গাড়ি হতে নামিয়ে পূজা মণ্ডপে স্থাপনের জন্য নেওয়ার সময় সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এ ঘটনায় আড়াইহাজার থানায় জিডি করা হয়েছে (জিডি নং-৯৫০, তারিখ-১৭/১০/২০২৬)।

২, গত ৫ অক্টোবর বিকেল আনুমানিক ৪ ঘটিকায় ময়মনসিংহ জেলার কোতোয়ালি থানাধীন ঋষিপাড়া এলাকায় সুপারি পাড়াকে কেন্দ্র করে পল্লব দাসের পরিবারের সাথে প্রতিবেশী জীবন ঋষির পরিবারের কথা-কাটাকাটি হয়। এই ঘটনার জেরে অনুমান বিকেল ৫ টা ৫৫ মিনিটে জীবন ঋষি, তার ছেলে জয়ন্ত ও ভাগনে রায়মোহন প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়ে মারলে ময়না রানী দাস (৫৮) আহত হয় এবং ঢিলের আঘাতে মণ্ডপের সামনে রং করার জন্য রাখা গণেশ মূর্তির কিছু অংশ ভেঙে যায়।

পূজা মণ্ডপের সভাপতি নৃপেন্দ্র দাস এবং সাধারণ সম্পাদক পরিমল চন্দ্র দাস জানান, দুই পরিবারের পূর্ব বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় জিডি করা হয়েছে (জিডি নং-৫৫৪, তারিখ ০৫/১০/২০২৬খ্রি)।

৩, গত ১৫ অক্টোবর সকাল আনুমানিক বেলা ১১ টায় পাবনা জেলার সুজানগর থানাধীন ভায়না এলাকায় মথুরাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন রাধানগর সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের পূজামণ্ডপের শামিয়ানা একজন মানসিক ভারসাম্যহীন নারী ছিঁড়ে ফেলেন।

এ ঘটনায় মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে পুলিশকে অবহিত করা হলে সুজানগর থানা পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে হেফাজতে নেয়।

স্থানীয়দের তথ্যমতে, মহিলাটি ঘটনার পূর্বে ৪-৫ দিন ধরে ওই এলাকায় অবস্থান করছিলেন।

মণ্ডপের সভাপতি সমীর কুমার সরকার এবং সাধারণ সম্পাদক মিলন কুমার সরকার মহিলাটির মানসিক ভারসাম্যহীনতার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

এ ঘটনায় সুজানগর থানায় জিডি করা হয়েছে (জিডি নং-৮৪৭, তারিখ ১৫ /১০/২০২৬ খ্রি)।

৪, গত ১ অক্টোবর সকাল আনুমানিক সকাল ৯ টায় ঠাকুরগাঁও জেলার ভুল্লী থানাধীন ভাতগাঁও এলাকায় শ্রী শ্রী রসিক রায় জিঁউ ইসকন মন্দিরে প্রতিমা স্থাপনকে কেন্দ্র করে সনাতন সম্প্রদায়ের ৭০-৮০ জন লোক লাঠিসোঁটা নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করে।

এসময় তারা মন্দিরে অবস্থানরত ইসকন সম্প্রদায়ের ৪-৫ জনকে মারধর ও মালামাল ভাঙচুর করে মন্দির থেকে বের করে দিয়ে ইসকন সম্প্রদায়ের প্রতিমা সরিয়ে নিজেদের প্রতিমা স্থাপন করে। পরবর্তীতে ইসকন সম্প্রদায়ের ১০০-১২০ জন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে বাধা প্রদান করলে উভয়পক্ষের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে।

পরবর্তীতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে আলোচনা করে সমঝোতার ভিত্তিতে ইসকন মন্দিরের পুরাতন প্রতিমা সরিয়ে নতুন করে তৈরিকৃত প্রতিমা প্রতিস্থাপন করা হয়।

এলাকার পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি মনোরঞ্জন সিংহ জানান, ঘটনাটি মূলত হিন্দুধর্মের ইসকন সম্প্রদায় এবং সনাতন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধের জের ধরে সংগঠিত হয়।

এ ঘটনায় ভুল্লী থানায় জিডি করা হয়েছে (জিডি নম্বর- ৪২, তারিখ-০১/১০/২০২৬ খ্রি.)।

৫, গত ২ অক্টোবর রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টায় ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী থানাধীন কাশিডাঙ্গী বৈরাগীপাড়া এলাকায় পাশাপাশি অবস্থিত কৃষ্ণ মন্দির ও কালী মন্দিরের দুই পক্ষের মধ্যে সরকারি বরাদ্দের অর্থ নিয়ে বিরোধের জেরে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে হাতাহাতি ও মারামারি সংঘটিত হয়। 

জানা যায়, কৃষ্ণ মন্দিরের সভাপতি কৈলাস মোহন্ত (৪৫) ও কালী মন্দিরের সভাপতি সুধীর মোহন্ত (৪৮) নিজ নিজ মন্দিরের উন্নয়নের জন্য জেলা পরিষদ, ঠাকুরগাঁও বরাবর আর্থিক অনুদানের আবেদন করেন।

কৃষ্ণ মন্দিরের নামে ১ লাখ টাকা সরকারি বরাদ্দ এসেছে জানতে পেরে উভয়পক্ষ টাকা নিজেদের আবেদনের বিপরীতে বরাদ্দ হয়েছে দাবি করায় বিরোধের সূত্রপাত হয়।

এ ঘটনায় বালিয়াডাঙ্গী থানায় জিডি করা হয়েছে (জিডি নম্বর- ১২৭, তারিখ-০৩/১০/২০২৬ খ্রি.)।

৬, গত ৪ অক্টোবর আনুমানিক বিকেল সাড়ে ৪টায় টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার থানাধীন নলখী পাড়া এলাকায় পূর্ণচন্দ্র নাট মন্দিরের নবগঠিত অস্থায়ী কমিটির আয়োজনে সার্বজনীন দুর্গা উৎসব ২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে প্রতিমা স্থাপনের স্থান নির্ধারণ (মন্দিরের ভিতরে না বাহিরে) সংক্রান্ত আলোচনা হয়।

আলোচনায় প্রতিমা স্থাপনকে কেন্দ্র করে সভাপতি জয়রথ পাল ও সাধারণ সম্পাদক দুলাল চন্দ্র পাল পক্ষদ্বয়ের লোকজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়।

একপর্যায়ে উভয় পক্ষের লোকজনের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে।  সংবাদ পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

সাধারণ সম্পাদক দুলাল চন্দ্র পালের লোকজন প্রতিমা মন্দিরের ভিতরে স্থাপন করে সার্বজনীন রাঁধা গোবিন্দ নাট মন্দিরের নামকরণ করে একটি ব্যানার ঝুলিয়ে দেয়।

দেলদুয়ার থানা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি রঘুনাথ বসাকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ঘটনার পরবর্তীতে স্থানীয় সংসদ সদস্যের মধ্যস্থতায় এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের মধ্যে সমঝোতা হয় এবং পূজা চলাকালীন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে না মর্মে সকলে অঙ্গীকারবদ্ধ হন।

বর্তমানে শান্তিপূর্ণ এবং উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা উদযাপিত হচ্ছে।

ওই ঘটনায় দেলদুয়ার থানায় জিডি করা হয়েছে (জিডি নম্বর- ১৫৩, তারিখ-০৪/১০/২০২৬ খ্রি.)।

এএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর