প্রায় ৯৭ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হওয়ার পরও চালু হচ্ছে না গাজীপুর-এয়ারপোর্ট বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প। প্রায় ১৪ বছর অপেক্ষার পরও আধুনিক গণপরিবহনসেবা না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গাজীপুরের সচেতন নাগরিক সমাজ। প্রকল্পের অবকাঠামো ভেঙে ফেলা বা প্রকল্পটি পরিত্যক্ত করার পরিবর্তে দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণ অনুসন্ধান করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. খসরু মিয়া।
তিনি বলেন, গাজীপুর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প, বাণিজ্যিক ও জনবহুল এলাকা। রাজধানীর কাছাকাছি অবস্থান হওয়া সত্ত্বেও দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা, দীর্ঘ যাত্রার সময়, তীব্র যানজট ও অকার্যকর গণপরিবহনের কারণে এ অঞ্চলের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ঢাকা ও গাজীপুরের মধ্যে যাতায়াত করতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকেন। এতে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, উৎপাদনশীলতা কমছে, পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই গাজীপুর-এয়ারপোর্ট বিআরটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল উল্লেখ করে অধ্যাপক খসরু মিয়া বলেন, প্রায় ১৪ বছর অপেক্ষার পরও গাজীপুরবাসী কাঙ্ক্ষিত আধুনিক গণপরিবহনসেবা পাননি। এ অঞ্চলের মানুষের জন্য দ্রুত, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহনব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি।
তিনি বলেন, বিআরটি চালু হলে গাজীপুরে আধুনিক আবাসন ও আবাসন ব্যবসার সম্প্রসারণ ঘটবে। বিমানবন্দর থেকে প্রায় ২০ মিনিটের দূরত্বের কারণে এ অঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের হোটেল, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে ঢাকার ওপর জনসংখ্যা ও যোগাযোগের চাপ কমবে এবং স্থানীয় ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
প্রকল্পের প্রায় ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পরও এর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন ডুয়েটের এই অধ্যাপক। তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন বা পরিচালনায় কারিগরি, ব্যবস্থাপনাগত কিংবা পরিচালনাগত কোনো সমস্যা থাকলে তা চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে। পরিচালনাপদ্ধতিতে সমস্যা থাকলে তা পরিবর্তন করতে হবে। যান চলাচল ব্যবস্থাপনায় জটিলতা থাকলে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে তা নিরসন করা সম্ভব বলে তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, ঢাকার মেট্রোরেল পরিচালনায় সরকার বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে প্রস্তুত থাকলেও গাজীপুরের বিআরটি চালুর ক্ষেত্রে অনীহা কেন, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অনীহার পেছনে কোনো গোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রকল্পে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি কিংবা ব্যক্তিগত যানবাহন ও অকার্যকর বাস ব্যবসার স্বার্থ রক্ষাকারীরা এর বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছেন কি না, সেটিও অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
সংবাদ সম্মেলনে বিআরটি প্রকল্প দ্রুত চালুর জন্য সাত দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, প্রকল্প চালুর নির্দিষ্ট সময়সীমাসহ কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা, নির্মিত অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং অবশিষ্ট কাজ দ্রুত শেষ করা।
এ ছাড়া প্রকল্প বাতিল, নির্মিত অবকাঠামো ভেঙে ফেলা কিংবা মূল পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনার আগে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবহন মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানানো হয়। রেল, মেট্রোরেল, স্থানীয় বাসসহ অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে সমন্বয় করে সমন্বিত পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার কথাও বলা হয়।
প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গাজীপুরবাসী, পরিবহন বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়ার দাবি জানিয়ে সংগঠনটি বলেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিআরটি করিডোরের বিকল্প হিসেবে ঢাকা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ), ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের অনুমোদিত সালনা-উত্তরা-দৌড় এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের দাবিও জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর সদরের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আফজাল হোসেন কায়সার, গাজীপুর ঐতিহ্য ও উন্নয়ন সংগঠনের সভাপতি প্রকৌশলী মো. শামসুল হক, পুবাইল আদর্শ কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. আব্দুল লতিফ, গাজীপুর মেট্রো বালিকা কলেজের সভাপতি অধ্যাপক মো. মোখলেছুর রহমান, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির গাজীপুর মহানগর শাখার সভাপতি মো. ফরহাদ হোসাইন, গাজীপুর ঐতিহ্য ও উন্নয়ন সংগঠনের সদস্য মো. আশরাফুল আলমসহ অন্যরা।
এএইচ/এসআই




