বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) অডিট বিভাগের যুগ্ম নিয়ন্ত্রক (অডিট) পদে চলতি দায়িত্বে থাকা মো. আল-আমিনের বিরুদ্ধে অসদাচরণ, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অশোভন আচরণ এবং দাফতরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগে গত ৫ অক্টোবর তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে বিএডিসি কর্তৃপক্ষ। নোটিশে সাত দিনের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেছে।
বিএডিসি সচিব আবু জাফর রাশেদ স্বাক্ষরিত নোটিশে একাধিক ঘটনার বিবরণ তুলে ধরে আল-আমিনের বিরুদ্ধে কেন বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির কাজে হস্তক্ষেপ, মূল্যায়নে ব্যবহৃত ল্যাপটপ নিয়ে যাওয়া, কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়া, দাফতরিক নথি ছুড়ে মারা এবং অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে সাময়িক বরখাস্তসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও ব্যাখ্যা চেয়েছে কর্তৃপক্ষ।
নোটিশে উল্লিখিত অভিযোগগুলো এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়। তবে অভিযোগের ধরন ও দাফতরিক কার্যক্রমে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিএডিসির প্রশাসনিক মহলে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিএডিসির নোটিশ অনুযায়ী, আল-আমিনকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি উঠেছে MIEFP প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির কার্যক্রম নিয়ে। গত ৪ অক্টোবর দরপত্র মূল্যায়নের সময় সংশ্লিষ্ট কক্ষে গিয়ে তাকে কমিটির সভাপতি করা হয়নি কেন, তা নিয়ে আপত্তি জানান আল-আমিন।
নোটিশে বলা হয়েছে, ড. মো. শাফায়েত হোসেনকে কমিটির সভাপতি করায় তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান। একপর্যায়ে শাফায়েত হোসেনকে সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করানোর হুমকি দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে।
একজন অডিট কর্মকর্তার দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভাপতির পদ নিয়ে এ ধরনের আপত্তি তোলার বিষয়টি তার দাফতরিক ভূমিকা ও এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে এ বিষয়ে আল-আমিনের বক্তব্য পাওয়া গেলে ঘটনার প্রেক্ষাপট আরও স্পষ্ট হবে।

নোটিশে আরও বলা হয়েছে, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের সঙ্গে উত্তপ্ত পরিস্থিতির একপর্যায়ে আল-আমিন মোবাইল ফোনে কয়েকজন বহিরাগত ব্যক্তিকে সেখানে আসতে বলেন। পরে তিনি দরপত্র মূল্যায়নে ব্যবহৃত একটি ল্যাপটপ নিয়ে চলে যান বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ল্যাপটপটি নিয়ে যাওয়ার অভিযোগকে দাফতরিক শৃঙ্খলা ও মূল্যায়ন কার্যক্রমের স্বচ্ছতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারি দরপত্র মূল্যায়নের মতো সংবেদনশীল কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ ও তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও এ ঘটনা প্রশ্ন তৈরি করেছে।
একই ঘটনায় দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্যসচিবের কক্ষে কর্মকর্তারা অবস্থানকালে একজন অপরিচিত ব্যক্তি দরজা ঠেলে ‘শাফায়েত কে?’ জানতে চান বলে নোটিশে উল্লেখ রয়েছে। পরে অন্য কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে ওই ব্যক্তি সেখান থেকে চলে যান।
ওই ব্যক্তি কে ছিলেন, কী উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়েছিলেন এবং কার নির্দেশে দাফতরিক এলাকায় প্রবেশ করেছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
নোটিশে গত ৩০ জুনের একটি ঘটনার বিবরণও রয়েছে। অডিট-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনার সময় আল-আমিন নিয়ন্ত্রকের (অডিট) কক্ষে গিয়ে কর্মশালা ও ত্রিপক্ষীয় সভা সম্পর্কে তাকে কেন অবহিত করা হয়নি, তা জানতে চান বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ সময় উচ্চস্বরে কথা বলা, দোষারোপ করা এবং সভা করতে না দেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। একই ঘটনায় সদস্য পরিচালক (অর্থ) ও চেয়ারম্যান সম্পর্কে অশালীন মন্তব্য করার অভিযোগও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সদস্য পরিচালক (অর্থ)-এর দফতরে অডিট-সংক্রান্ত একটি নথি ছুড়ে মারার অভিযোগ আনা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ এসব আচরণকে দাফতরিক শৃঙ্খলা ও পেশাগত আচরণের পরিপন্থি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
আল-আমিনের বিরুদ্ধে কর্মস্থলে অননুমোদিত অনুপস্থিতির অভিযোগও রয়েছে। নোটিশে ৬ আগস্টের একটি স্মারকের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, তিনি গত ৩০ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া অফিসে অনুপস্থিত ছিলেন। এর আগেও তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ করা হয়েছিল বলে নোটিশে উল্লেখ রয়েছে।
এ বিষয়ে কৈফিয়ত তলবের চিঠি পাওয়ার পর সেটি ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগও আনা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতাদের ডেকে এনে নিয়ন্ত্রক (অডিট)-এর সঙ্গে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
নোটিশে গত ৪ অক্টোবরের আরেকটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তাকে চেয়ারম্যানের দফতরে ডেকে তাদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হচ্ছিল। এ সময় আল-আমিন চেয়ারম্যানের কক্ষে গিয়ে তাকে না জানিয়ে কেন ওই কর্মকর্তাদের ডাকা হয়েছে এবং তাদের কাছে কেন তথ্য চাওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বলে নোটিশে বলা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ তার এ আচরণকে গুরুতর অসদাচরণ ও অপেশাদার আচরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
দাফতরিক অসদাচরণের অভিযোগের পাশাপাশি বিএডিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে আল-আমিনের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কোন কর্মকর্তা কোথায় বদলি বা পদায়িত হবেন, সেই বিষয়েও তিনি প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেন।
বিভিন্ন প্রকল্পের দরপত্র সংক্রান্ত কার্যক্রমেও তার ভূমিকা নিয়ে প্রতিষ্ঠানের কিছু কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। টেন্ডার বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
বিএডিসির কারণ দর্শানোর নোটিশে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ১৯৯০-এর সংশ্লিষ্ট বিধির উল্লেখ করা হয়েছে। এতে দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও অসদাচরণের অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়ার পাশাপাশি সাময়িক বরখাস্তসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা কেন নেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. আল-আমিনের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এমআর/এফএ




