- আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানে জোর
- এফএসআরইউ ত্রুটিতে গ্যাস সরবরাহে বড় ধাক্কা
- জ্বালানি সংকটে শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগ চাপে
- ২০৩০ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্য চ্যালেঞ্জে
- ২৫ হাজার কোটি টাকার তহবিলের প্রস্তাব
- জাপানের ৩১ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা
- সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ বিশেষজ্ঞদের
- জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান
বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের জ্বালানি খাতকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক উত্তেজনা, এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল বিদ্যুৎ বা গ্যাস সরবরাহের বিষয় নয়, এটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বর্তমানে বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। জ্বালানি তেল, এলএনজি ও কয়লার ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। সম্প্রতি একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এতে শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সিএনজি খাতে চাপ সৃষ্টি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার এ ধরনের ঝুঁকি ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে যদি দেশীয় জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিকল্প জ্বালানি উৎসের উন্নয়ন দ্রুত না করা হয়।
অর্থনীতির চালিকাশক্তিতে প্রভাব
জ্বালানি সংকটের প্রভাব এখন দেশের প্রায় প্রতিটি খাতে দৃশ্যমান। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সীমিত সক্ষমতায় পরিচালনা করতে হচ্ছে এবং পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। এর প্রভাব পণ্যের উৎপাদন খরচ ও বাজারমূল্যের ওপরও পড়ছে।
কৃষি খাতে সেচব্যবস্থা, কৃষিযন্ত্র পরিচালনা এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে জ্বালানির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে নির্মাণশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যাংকিং, পর্যটন ও সেবা খাতও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল।
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেছেন, জ্বালানি খাতের অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতির ওপর তার প্রভাব আরও গভীর হবে। তার ভাষায়, জ্বালানি এমন একটি উপাদান যার সঙ্গে অর্থনীতির প্রতিটি খাত যুক্ত। সরবরাহ ব্যাহত হলে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর
এ অবস্থায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সামনে আনার দাবি জোরালো হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন বিষয়ক কর্মজোট (বিডাব্লিউজিইডি) বলছে, বর্তমান পরিস্থিতি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দ্রুত বিনিয়োগ ও নীতি সংস্কারের উপযুক্ত সময়।
সংগঠনটির সদস্য সচিব হাসান মেহেদী বলেন, প্রতি ১ কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুৎ বছরে গড়ে প্রায় ৩০ হাজার টাকা সমপরিমাণ জ্বালানি আমদানি ব্যয় সাশ্রয় করতে পারে। তাই গৃহস্থালি ও কৃষিভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে সরকারি প্রণোদনা ব্যয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
সংগঠনটি নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য ২৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন, সৌরবিদ্যুতে ভর্তুকি, অব্যবহৃত জমিতে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন, ‘সবুজ জেলা’ কর্মসূচি এবং বছরে ১০ লাখ সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রস্তাব দিয়েছে।
বর্তমানে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৬৭৯ মেগাওয়াট। অথচ ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এই লক্ষ্য অর্জনে বেসরকারি খাত, স্থানীয় সরকার এবং সাধারণ নাগরিকদের সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্ব
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি জাপান বাংলাদেশের জন্য প্রায় ৩১ কোটি ২০ লাখ ডলারের ঋণ সহায়তা ঘোষণা করেছে। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চয়তা মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেই এ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
এই অর্থ রাজস্ব ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার বিভিন্ন উদ্যোগে ব্যয় করা হবে বলে জানা গেছে।
কী বলছেন খাতসংশ্লিষ্টরা
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটেরর সাবেক অধ্যাপক ড. ম. তামিম মনে করেন, শুধু এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তার মতে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) নেতারা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে সেই সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার সম্ভব নয়। এজন্য জ্বালানি সরবরাহ অবকাঠামোর উন্নয়ন ও উৎসের বহুমুখীকরণ জরুরি।
অন্যদিকে শিল্প মালিকদের সংগঠনগুলোর মতে, গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং রফতানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তারা দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
সরকারের অবস্থান
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা সুরক্ষার বিষয়। টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে আমাদের দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে এবং পরিচ্ছন্ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করতে হবে।
তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ, জ্বালানি উৎস বহুমুখীকরণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকারের পর্যায়ে রাখতে হবে। কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে শুধু বিদ্যুৎ বা গ্যাসের সরবরাহই নয়, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং টেকসই উন্নয়নের ভিত্তিও আরও শক্তিশালী হবে।
এমআর/এএস




