- প্রতি ১০ মিটার কালভার্ট মেরামতে প্রায় সোয়া কোটি টাকা ব্যয়
- কম্পিউটার ও সফটওয়্যারে ব্যয় প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা
- ৪ কোটি টাকার মনোহারি সামগ্রী কেনার প্রস্তাব
- প্রকল্প হলেই কম্পিউটার-গাড়ি কেনার সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের
- ৪৯৫টি উপজেলার ভাঙা রাস্তা মেরামত করা হবে
গ্রামীণ সড়ক সংস্কারের জন্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। দেশের ৬৪ জেলার ৪৯৫টি উপজেলায় ৫ হাজার ২২০ কিলোমিটার ভাঙা ও ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ সড়ক পুনর্নির্মাণ ও শক্তিশালী করার পাশাপাশি ৭ হাজার মিটার ক্ষতিগ্রস্ত সেতু ও কালভার্ট পুনর্নির্মাণ করা হবে। চলতি বছর শুরু হয়ে ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।
তবে পুরোনো রাস্তা ও কালভার্ট পুনর্নির্মাণের এই প্রকল্পে মূল অবকাঠামোগত কাজের পাশাপাশি কম্পিউটার, সফটওয়্যার, রোড রোলার, মোটরসাইকেল, জিপ ও মনোহারি সামগ্রী কেনায়ও বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ৮০টি কম্পিউটার কিনতে প্রায় ১ কোটি টাকা, সফটওয়্যারে ৩০ লাখ টাকা, ৬৪টি রোড রোলার কিনতে প্রায় ৭৭ কোটি টাকা, পরামর্শক সেবায় ১৪ কোটি টাকা এবং মনোহারি সামগ্রী কিনতে প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৪০টি মোটরসাইকেল ও দুটি জিপ কেনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৯৬৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সড়ক পুনর্নির্মাণ ও শক্তিশালীকরণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটার সড়কে গড়ে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা ব্যয় হবে। অন্যদিকে প্রতি ১০ মিটার কালভার্ট মেরামতে প্রায় সোয়া কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। রাস্তা সংস্কারের প্রকল্পে এসব আনুষঙ্গিক খাতে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দের যৌক্তিকতা এবং বিভিন্ন কাজের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, প্রকল্প হলেই কম্পিউটার, গাড়ি ও বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
৮০ কম্পিউটারে ১ কোটি টাকা
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে কম্পিউটার কেনার বিষয়টি। ৮০টি কম্পিউটার কিনতে প্রায় ১ কোটি টাকা এবং সফটওয়্যার কিনতে আরও ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ কম্পিউটার ও সফটওয়্যারে মোট ব্যয় হবে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
আরও পড়ুন: প্রকল্পের ২৩ শতাংশই অনিয়ম!
পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব মো. মামুন আল রশিদ ঢাকা মেইলকে বলেন, প্রকল্প কার্যালয়ে কতজন লোক কাজ করবে, সেটি বিবেচনা করেই কম্পিউটারের প্রয়োজন নির্ধারণ করা উচিত। কিন্তু ৮০টি কম্পিউটার তার কাছে অতিরিক্ত মনে হয়। জেলা কার্যালয়গুলোতে কম্পিউটার দেওয়ার প্রয়োজন হলে সেটি প্রকল্পের আওতায় না করে নিয়মিত বাজেট থেকে করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, প্রকল্প হলেই কম্পিউটার, গাড়ি, জ্বালানি ও বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনার যে প্রবণতা রয়েছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সরকার কৃচ্ছ্রসাধনের নীতির কথা বলছে। কিন্তু প্রকল্পের আওতায় কম্পিউটার, গাড়ি ও রোড রোলার কেনার মতো ব্যয় রাখা সেই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কালভার্টে সোয়া কোটি টাকা
শুধু সড়ক নির্মাণ ব্যয় নয়, কালভার্ট মেরামতের খরচ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রকল্পে প্রতি ১০ মিটার কালভার্ট মেরামতের জন্য প্রায় সোয়া কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি মিটার কালভার্টে ব্যয় হবে প্রায় ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকা।
মামুন আল রশিদ বলেন, প্রকল্পের প্রতিটি খাতের ব্যয় আলাদাভাবে যাচাই করা দরকার। বিশেষ করে সড়ক ও কালভার্টের কাজের ব্যয়ের সঙ্গে বাজারদর এবং একই ধরনের চলমান প্রকল্পের ব্যয় তুলনা করে দেখা উচিত। তা না হলে বড় প্রকল্পের আড়ালে অতিরিক্ত ব্যয়ের সুযোগ থেকে যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, গ্রামীণ সড়ক পুনর্নির্মাণে এত বেশি খরচ স্বাভাবিক নয়। মেরামত বা পুনর্বাসনের কাজে এত বেশি ব্যয় হওয়ার কথা নয়। এসব ব্যয়ের মধ্যে অস্বাভাবিকতা আছে কি না, তা যাচাই করা দরকার।
৬৪ রোড রোলারে ৭৭ কোটি
প্রকল্পে ৬৪টি রোড রোলার কেনার জন্য প্রায় ৭৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। রোড রোলার সড়ক নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণে প্রয়োজনীয় যন্ত্র হলেও এগুলো কেনার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কারণ, প্রকল্পের মূল সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ ঠিকাদারদের মাধ্যমে করানো হবে। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নির্মাণযন্ত্র ঠিকাদারদের কাছেই থাকার কথা। তাহলে প্রকল্পের অর্থে বিপুলসংখ্যক রোড রোলার কেনার প্রয়োজন কেন, সেই প্রশ্ন উঠছে।
পরামর্শক খাতে ১৪ কোটি
প্রকল্পের কাজ দেখভাল ও কারিগরি সহায়তার জন্য পরামর্শক নিয়োগে ১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সড়ক ও কালভার্ট পুনর্নির্মাণের মতো কাজে এলজিইডির নিজস্ব প্রকৌশলী ও কারিগরি জনবল থাকার পরও এত বড় অঙ্কের পরামর্শক ব্যয় কেন প্রয়োজন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
মামুন আল রশিদ ঢাকা মেইলকে বলেন, ১৪ কোটি টাকা পরামর্শকের জন্য ধরা তার কাছে মাত্রাতিরিক্ত মনে হয়েছে। এগুলো নতুন রাস্তা নয়, মূলত মেরামত ও পুনর্বাসনের কাজ। এলজিইডির উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের সড়কের জন্য নির্দিষ্ট নকশা ও কারিগরি কাঠামো আগে থেকেই আছে। প্রতিটি সড়কের জন্য আলাদা করে পূর্ণাঙ্গ নকশা করার প্রয়োজন নেই।
৪ কোটি টাকার মনোহারি সামগ্রী
প্রকল্পে প্রায় ৪ কোটি টাকার মনোহারি সামগ্রী কেনার প্রস্তাবও রয়েছে। অফিস পরিচালনার জন্য এসব সামগ্রী প্রয়োজন হতে পারে। তবে এই খাতে কী ধরনের পণ্য, কী পরিমাণে এবং কী দামে কেনা হবে, তা স্পষ্ট না হলে ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া ১৪০টি মোটরসাইকেল ও দুটি জিপ কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। মোটরযান পরিচালনার জন্যও অর্থ চাওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে সাবেক পরিকল্পনা সচিব বলেন, প্রকল্প হলেই গাড়ি কেনার সংস্কৃতি থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বের হয়ে আসতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মাঠপর্যায়ে কিছু যানবাহনের প্রয়োজন হতে পারে। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান গাড়ি ব্যবহার কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী ভাড়া নেওয়ার সুযোগ থাকলে তা বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে প্রকল্প ব্যয় কমানো সম্ভব হবে।
প্রকল্পের পক্ষে যুক্তি
তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের যুক্তি, দেশের ৬৪ জেলার ৪৯৫টি উপজেলায় একযোগে বড় পরিসরে কাজ করতে হলে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, নকশা, মান নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশগত বিষয় ও কাজের তদারকিতে বিশেষজ্ঞ সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। এ কারণে পরামর্শক সেবার জন্য অর্থ রাখা হয়েছে।
প্রকল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো দেশের গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা। স্থানীয় সরকার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে গ্রামীণ এলাকায় বিভিন্ন শ্রেণির মোট ৪ লাখ ১০ হাজার ৫৩০ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে পাকা সড়ক প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার ১৮১ কিলোমিটার। পাকা সড়কের মধ্যে গ্রাম সড়ক রয়েছে প্রায় ৯৮ হাজার ২৩২ কিলোমিটার।
এই বিপুল সড়ক নেটওয়ার্কের প্রায় ৩১ হাজার ৪৩৪ কিলোমিটার বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়া, অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ, বর্ষায় পানি জমে থাকা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এসব সড়কের স্থায়িত্ব কমেছে।
সরকার ক্ষতিগ্রস্ত সব সড়ক একসঙ্গে সংস্কার না করে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো বাছাই করে ৫ হাজার ২২০ কিলোমিটার সড়ক পুনর্নির্মাণ ও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে।
কৃষি ও জনজীবনে প্রভাব
গ্রামীণ সড়ক শুধু মানুষের চলাচলের পথ নয়, এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত দেশের কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতি। মাঠ থেকে ধান, সবজি, মাছ, ফলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য বাজারে নিতে এসব সড়ক ব্যবহার করেন কৃষকেরা। সড়ক ভালো থাকলে কম সময়ে ও কম খরচে পণ্য বাজারে নেওয়া যায়। সড়ক খারাপ হলে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়, পণ্য নষ্ট হয় এবং কৃষককে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হয়।
শিক্ষার্থী ও রোগীদের জন্যও গ্রামীণ সড়কের গুরুত্ব রয়েছে। প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত এবং রোগীদের উপজেলা বা জেলা শহরের হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে সড়ক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. মাহমুদুল হোসাইন খান জানান, সারা দেশে গ্রামীণ সড়ক নেটওয়ার্ক পুনর্বাসনের মাধ্যমে যোগাযোগব্যবস্থা সহজ ও টেকসই হবে। এর ফলে প্রকল্প এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারিত হবে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনেও প্রকল্পটি সহায়ক হবে।
পরামর্শক ব্যয়ের ব্যাখ্যা
পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার বলেন, ১০৭ কোটি টাকা কোরিয়ান সরকারের অনুদানের অর্থ। ৬৫ কোটি টাকা পরামর্শক খাতে ধরা হলেও সেটিও ওই অনুদানের অর্থ। বড় সেতুগুলোতে কোনো ত্রুটি তৈরি হচ্ছে কি না, তা আগে থেকেই শনাক্ত করার জন্য কোরিয়া থেকে বাংলাদেশে প্রযুক্তি হস্তান্তর করা হবে। এই প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কোরিয়ার পরামর্শকেরা কাজ করবেন এবং তাদের বেতনও ওই অনুদানের অর্থ থেকেই দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, মূল প্রয়োজন হলো এই জ্ঞান নিজেদের মধ্যে তৈরি করা। ১০০ থেকে ১২০ কিংবা ১৫০ জন প্রকৌশলীকে এই কারিগরি জ্ঞানে দক্ষ করে গড়ে তোলা দরকার। প্রকল্পের মাধ্যমে সেই সক্ষমতা তৈরি হবে। বড় সেতুগুলোতে কিছু বিশেষ ডিভাইস স্থাপন করা হবে। সেগুলো পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের বিষয়ও কোরিয়ার কাছ থেকে শেখানো হবে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, পরামর্শকদের পেছনে যে ব্যয় হচ্ছে, তার অন্যতম উদ্দেশ্য প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিত করা। প্রকল্পের মাধ্যমে নিজেদের লোকজনকে প্রশিক্ষিত করা এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি জ্ঞান অর্জনের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এএইচ/এআর




