চট্টগ্রাম লালদীঘির পাড়ে জেলা পরিষদ ভবনে অবস্থিত অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির লালদীঘি পূর্ব কর্পোরেট শাখার ক্যাশ ভল্ট থেকে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার উধাও হয়ে গেছে। এ ঘটনায় ব্যাংকের এক কর্মকর্তাসহ দুজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) গ্রেফতারের পর আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানান সিএমপির কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ইকবাল হোসেন।
তিনি জানান, গ্রাহকের ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ব্যাংকটির সিনিয়র অফিসার ও ক্যাশ ইনচার্জ মো. কামরুল হোসেন (৪১) এবং জাফরুল্লাহ তানভীরকে (২৫) গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাদের কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন, হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ ও তথ্যের রেকর্ড এবং ৬৪ জিবির একটি পেনড্রাইভ জব্দ করা হয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে।
এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের ঘটনায় গত ১০ আগস্ট কোতোয়ালী থানায় মামলা করেন অগ্রণী ব্যাংকের লালদীঘি পূর্ব কর্পোরেট শাখার জেনারেল ম্যানেজার মোস্তাক আহমেদ। মামলায় কামরুল হোসেন ও জাফরুল্লাহ তানভীরের নামসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। পরে দুজনকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ আগস্ট নিয়মিত ব্যাংকিং কার্যক্রম ও লেনদেন শেষে নগদ অর্থের হিসাব এবং ভল্টে সংরক্ষিত অর্থের হিসাব মেলানোর সময় বড় ধরনের গরমিল ধরা পড়ে। পরবর্তী সময়ে ভল্টের হিসাব, সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র ও বিভিন্ন নথি যাচাই করে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ঘাটতি পাওয়া যায়। ব্যাংকের ক্যাশ ও ভল্টের দায়িত্বে ছিলেন সিনিয়র অফিসার কামরুল হোসেন।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ঘাটতির বিষয়ে কামরুল হোসেন সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। পরে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ব্যাংকের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, জাফরুল্লাহ তানভীরসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনের সহায়তায় ভল্ট থেকে টাকা সরিয়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে।
এজাহারে কামরুল হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে আরও বলা হয়, ভল্টে টাকা সংরক্ষণের সময় ১ হাজার টাকার নোটের বড় বান্ডিলের ভেতরে ১০০ টাকা বা তার কম মূল্যমানের নোট ঢুকিয়ে বান্ডিল সাজানো হতো। ফলে বাইরে থেকে বান্ডিল দেখে ভল্টে নির্ধারিত পরিমাণ টাকা রয়েছে বলে মনে হলেও প্রকৃত অর্থের পরিমাণ কম থাকত।
মামলার এজাহারে বলা হয়, সরিয়ে নেওয়া অর্থ জাফরুল্লাহ তানভীরের দেখাশোনার শর্তে বিনিয়োগ করে হাটহাজারীর উত্তর বুড়িশ্চর এলাকায় ইশরাত এগ্রো নামে একটি গরুর খামার গড়ে তোলা হয়। বর্তমানে ওই খামারে বিভিন্ন জাতের ৫০ থেকে ৬০টি গরু রয়েছে।
তবে জাফরুল্লাহ তানভীরের পরিবারের পক্ষ থেকে ব্যাংকের অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। তার বাবা আজিম উল্লাহ বলেন, আমার ছেলে কোনো ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী নন এবং অগ্রণী ব্যাংকের লালদীঘি শাখার গ্রাহকও নন। তিনি আগে থেকেই গরুর খামারের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তার কাছে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল— এমন কোনো ব্যাংক রেকর্ড বা প্রমাণ আমাদের দেখানো হয়নি।
আজিম উল্লাহর দাবি, ক্যাশ ইনচার্জ কামরুল হোসেন বিভিন্ন সময়ে তার ছেলেকে লাভের ভিত্তিতে টাকা দিতেন এবং পরে লাভসহ সেই টাকা নিয়ে নিতেন। গত ৯ আগস্ট দিবাগত রাত ১টার দিকে তার স্ত্রীর মোবাইল ফোনে ব্যাংক থেকে কল করে জানানো হয়, তার ছেলে লালদীঘি শাখায় আটক আছেন। পরে ১০ আগস্ট ভোরে পুলিশ তাদের আটক করে নিয়ে যায়। বৃহস্পতিবার সকালে তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করা হয়।
আজিম উল্লার দাবি, কামরুল হোসেন আগে থেকেই তার ছেলেকে লাভে ব্যবসার জন্য টাকা দিত এবং নিত। এই সুযোগে তার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে। তাকে কৌশলে ব্যাংকে ডেকে নিয়ে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম জজ কোর্টের আইনজীবী আনোয়ার হোসেন বলেন, ভল্টে এত বড় অঙ্কের অর্থের ঘাটতি পাওয়া গেলে শুধু ক্যাশ ইনচার্জের দায়ের বিষয়টি দেখেই তদন্ত শেষ করা উচিত নয়। শাখা ব্যবস্থাপনার তদারকি, ভল্ট পরিচালনার নিয়মকানুন এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যথাযথভাবে কার্যকর ছিল কি না, তাও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
প্রতিনিধি/এফএ




