বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

রাত পোহালেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, ৩৫ বছর পর ফিরছে ভোটের সেই উত্তাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৭ পিএম

শেয়ার করুন:

রাত পোহালেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, ৩৫ বছর পর ফিরছে ভোটের সেই উত্তাপ
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দুই প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও কর্নেল অলি আহমদ

দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট)। এদিন জাতীয় সংসদ ভবনে এই নির্বাচনের আয়োজন করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইতোমধ্যে নির্বাচনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। 

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আবারও রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক প্রার্থী থাকায় সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্ধারিত হবে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি। ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সরাসরি ভোটের মুখোমুখি হচ্ছেন দুই প্রার্থী— বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম।

আরও পড়ুন: মির্জা ফখরুলের জন্য ভোট চাইলেন প্রধানমন্ত্রী

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ অধিবেশন কক্ষে বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ হবে। ভোট দেবেন জাতীয় সংসদের ৩৪৯ জন সদস্য। একাধিক প্রার্থী থাকায় ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোট হবে এবং ভোটগ্রহণ শেষে সেখানেই গণনা করে ফল ঘোষণা করা হবে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন দলের সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হয়েছেন কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে দুজনের প্রার্থিতাই বৈধ ঘোষণা করা হয়। ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিনেও কেউ প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় দুজনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা চূড়ান্ত হয়।

নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, গত ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা এবং ১৬ আগস্ট যাচাই-বাছাই শেষে দুজনের মনোনয়ন বৈধ হয়। আগামীকাল ভোটের মধ্য দিয়ে শেষ হবে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়া। নির্বাচনের নির্বাচনি কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন।

কারা ভোটার, কীভাবে হবে ভোট

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এবারের ভোটার তালিকায় রয়েছেন ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য। চট্টগ্রাম-৪ আসনে নির্বাচিত একজন প্রার্থী আদালতের নির্দেশনায় অযোগ্য হওয়ায় সেখানে বর্তমানে কোনো ভোটার নেই।

সংসদে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুলের জয়ের সম্ভাবনাই বেশি বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও সংশ্লিষ্টদের ধারণা। তবে ভোটের আনুষ্ঠানিকতা, বিরোধী প্রার্থী অলি আহমদের প্রাপ্ত ভোট এবং দলীয় অবস্থানের বাইরে কোনো ভোট যায় কি না—এসব বিষয়ও এবারের নির্বাচনে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিতে পারছেন না মির্জা আব্বাস

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনি কর্তা হিসেবে নির্বাচন পরিচালনা করবেন। বৈধ একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোট দিতে হয়। ভোটগ্রহণ ও ভোট গণনা প্রকাশ্যেই অনুষ্ঠিত হবে। কোনো প্রার্থী সর্বোচ্চ ভোট পেলে তিনিই নির্বাচিত হবেন। দুই প্রার্থী সমান সর্বোচ্চ ভোট পেলে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণের বিধান রয়েছে।

আগামীকাল সংসদ অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ চলাকালে সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত স্থান থাকবে এবং ভোটের কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচারের সুবিধাও রাখা হয়েছে বলে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে।

৩৫ বছর আগে কেমন ছিল সেই নির্বাচন?

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোট হয়েছিল ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর। এরশাদ সরকারের পতনের পর জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেটিই ছিল সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোট।

সেবার ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী ছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী। ৩৩০ সদস্যের সংসদে ভোট পড়ে ২৬৪টি। আবদুর রহমান বিশ্বাস পান ১৭২ ভোট, আর বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট। ফলে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

সেই নির্বাচনে ৬৬ জন সংসদ সদস্য ভোট দেননি। বিভিন্ন দলের সদস্যদের মধ্যে কে কোন প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছেন, তা নিয়েও তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও উত্তেজনা ছিল।

আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: দুপুর ১২টায় ব্যালট নিয়ে সংসদে যাবে ইসি

১৯৯১ সালের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী না থাকায় আর সংসদে ভোটাভুটির প্রয়োজন হয়নি। একক প্রার্থী থাকায় পরবর্তী রাষ্ট্রপতিরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক ধরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ছিল মূলত আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া।

এবার সেই ধারায় ছেদ পড়ছে। দুই প্রার্থী থাকায় ১৯৯১ সালের পর প্রথমবারের মতো আবারও সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন।

সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাবে মির্জা ফখরুলের জয় অনেকটাই নিশ্চিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে আগামীকালের নির্বাচনে মূল প্রশ্ন শুধু কে রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন—তা নয়; বরং অলি আহমদ কত ভোট পান, বিরোধী জোটের ভোট কতটা অটুট থাকে এবং দলীয় অবস্থানের বাইরে কোনো ভোটের বিচ্যুতি ঘটে কি না, সেদিকেও নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের।

জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর