- যুবদল নেতাকে গুলির ঘটনায় সন্ধান মেলে অস্ত্রটির
- পুলিশের কাছে অপরিচিত হওয়ায় অস্ত্রটি নিয়ে উদ্বেগ
- অস্ত্রটি ভারত বা পাকিস্তানের তৈরি বলে ধারণা
- ছদ্মবেশী অস্ত্র হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে শঙ্কা
দেখতে অনেকটা কলমের মতো। কিন্তু এটি মূলত একটি প্রাণঘাতী অস্ত্র। যেকোনো অপরাধ সংঘটিত করা যায় এর দ্বারা। কলমের মতো হওয়ায় এর নাম ‘পেনগান’। পকেটে বহন করা যায় সহজেই। ফলে অনায়াসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দেওয়া যায়। প্রাণঘাতী এই অস্ত্রটি নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা।
বিজ্ঞাপন
গত ৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় রাজধানীর পুরান ঢাকার নয়াবাজার এলাকায় যুবদল নেতা রাসেলকে গুলিতে আহত করে সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় অভিযান চালিয়ে 'পেনগান'সহ সোহেল ওরফে কাল্লু ও সায়মন নামে দুজনকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এরপর 'পেন গান' নামক অস্ত্রটির রোমহর্ষক তথ্য সামনে আসতে থাকে।
ডিবি পুলিশের একটি সূত্র থেকে জানা যায়, এ ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া সোহেল ওরফে কাল্লু জানান, এই 'পেন গান' ৮০ হাজার টাকায় অন্য আরেকজনের কাছ থেকে তারা কিনেছেন। পরে রাসেলের কাছে ২০ হাজার টাকা বেশি লাভে বিক্রি করতে আসেন সায়মন। সেই মোতাবেক সোহেল উরফে কাল্লু, সায়মন, রিপন দাস ও রাসেলসহ ইয়াবা সেবন করার এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে সেই 'পেনগান' দিয়েই রাসেলকে গুলি করা হয়।
অভিযানে নেমে ‘পেনগানের’ সন্ধান পায় পুলিশ
গুলির ঘটনায় মামলার পর অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে যায় গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পুলিশের কর্মকর্তা একটি সিগারেটের প্যাকেট উদ্ধার করেন। যে প্যাকেটের ভেতর পেন গানের সব যন্ত্রাংশ আলাদা আলাদা করে খুলে রাখা হয়েছে। আলাদা আলাদা যন্ত্রাংশ দেখে ডিবি পুলিশের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দেয়। পরে এসব যন্ত্রাংশ জোড়া দিয়ে দেখা যায় এটি একটি অত্যাধুনিক ক্ষুদ্রাস্ত্র। যা 'পেনগান' নামে পরিচিত।
ডিবি পুলিশের ধারণা, অস্ত্রটি ভারত কিংবা পাকিস্তানের তৈরি। তবে কলমের গায়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ না থাকায় সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এই ধরনের অস্ত্র খুলনাসহ দেশের পশ্চিমাঞ্চলে চরমপন্থীরা ব্যবহার করতে পারে বলে ধারণা পুলিশের।
যুবদল নেতাকে গুলির ঘটনায় তার ভাই বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার বাদী রাসেলের ভাই ফয়সাল হোসেন বলেন, আমার ভাইকে গুলির ঘটনা সায়মনের বাসায় ঘটে। তার আগে মোবাইল ফোনে আমার ভাইকে রিপন ডেকে নেয়। গুলি করার পর আমার ভাইকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে একটি মোটরসাইকেলে করে তারাই প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসার আগে পুলিশকে জানানোর বিষয়টি বুঝতে পেরে তারা পপুলার হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে আমার ভাইয়ের পাশে রিপনকে দেখতে পাই। সে রাত ১১টা পর্যন্ত আমার সঙ্গে হাসপাতালে ছিল। কিন্তু তখন পর্যন্ত আমরা জানতাম না যে, এই ঘটনা তারাই ঘটিয়েছে। পরে আমার ভাই বলেছে, কে তাকে গুলি করেছে।
নিরাপত্তা নিয়ে নতুন শঙ্কা, নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ
যুবদল নেতাকে গুলির ঘটনায় বিশেষ অস্ত্র উদ্ধার ও আসামি গ্রেফতারের বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার (দক্ষিণ) মো. নাসিরুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা দেখতে পেয়েছি যুবদল নেতাকে গুলির ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্রটি গতানুগতিক কোনো অস্ত্র নয়। এটি একটি বিশেষ ধরনের কলম সাদৃশ্য অস্ত্র। এটি 'পেনগান' নামে পরিচিত। এ কারণেই আমাদের আগ্রহ বেশি ছিল। কারণ এমন অস্ত্র অতীতে কখনো ব্যবহৃত হওয়ার রেকর্ড বা মামলায় আমরা ডিএমপিতে পাইনি। তাই অস্ত্রটি কীভাবে দেশে এলো, কে কে জড়িত সব কিছু উদ্ঘাটনে আমাদের একাধিক টিম কাজ করছে। অস্ত্রটি আর কোথাও ব্যবহার হয়েছে কি না সেই বিষয়ে আমরা কাজ করছি।
পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, যুবদল নেতাকে গুলির ঘটনায় জড়িতরা সবাই তার ঘনিষ্ঠ হওয়ায় আসামিদের নাম পরিচয় পেতে সমস্যা হয়নি। ঘটনার পর থেকেই আমরা ছায়া তদন্ত করছি। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় যাত্রাবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রথমে সায়মনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কেরানীগঞ্জে অভিযান চালিয়ে সোহেল উরফে কাল্লুকে গ্রেফতার করা হয়। কাল্লুর কাছ থেকে রাসেলকে গুলি করা ব্যবহৃত অস্ত্রটি উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি কী কারণে গুলির ঘটনা ঘটেছে সে বিষয়েও আমরা কাজ করছি।
আরও পড়ুন
পুলিশের জালে হানি ট্র্যাপের হোতারা!
পুলিশ জানায়, রাসেলকে গুলিতে ব্যবহৃত অস্ত্রটি একটি বিশেষ ধরনের পিস্তল। দেখতে হুবহু একটি কলমের মতো হলেও আদতে এটি একটি ঘাতক অস্ত্র। দেশে অপ্রচলিত এই অস্ত্র দিয়েই রাসেলকে গুলি করা হয়।
এ বিষয়ে সমাজবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, দেশে এখন অপরাধীরা ভয়ংকরভাবে কাজ করছে। তাদের বেপরোয়া সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিপাকে পড়ছে। নিত্যনতুন অস্ত্রের সংযোজন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এখন হুমকির মুখে। এমন বেপরোয়া অপরাধীদের সরকার শক্ত হাতে দমন করার উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় তাদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড আরও বিস্তরভাবে ছড়িয়ে পড়বে।
এই অপরাধ বিজ্ঞানী মনে করেন, এমন অপরাধীদের জামিন বাতিলসহ তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগভাবে কঠোর পদক্ষেপ জরুরি। এতে সমাজের প্রতিটি স্তরে অপরাধ কমে আসবে।
একেএস/জেবি




