জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্যমতে, গত ২১ এপ্রিল প্রস্তুত করা তালিকা অনুযায়ী, এ বছর চট্টগ্রাম মহানগর ও উপজেলাগুলোতে স্থানীয়ভাবে ৭ লাখ ৮৩ হাজার ১৫১টি গবাদিপশু হৃষ্টপুষ্ট করা হয়েছে। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৬০ হাজার ৮৮২। এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে ৭৭ হাজার ৭৩১টি, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হ্রাস।
পূর্ববর্তী বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৪ সালে উৎপাদন ছিল ৮ লাখ ৫২ হাজার ৩৫৯, ২০২৩ সালে ৮ লাখ ৪২ হাজার ১৬৫ এবং ২০২২ সালে ৭ লাখ ৯১ হাজার ৫০১। সে হিসাবে, চলতি বছরের উৎপাদন গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
পশুভিত্তিক হিসাবেও উৎপাদন কমেছে। এ বছর স্থানীয়ভাবে হৃষ্টপুষ্ট গরুর সংখ্যা ৪ লাখ ৯৯ হাজার ২৭৯টি, যা গত বছর ছিল ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৮১৩। ছাগল ১ লাখ ৯৪ হাজার ৫১৯টি, যা গত বছর ছিল ২ লাখ ৫১ হাজার ৭৪। মহিষ ৪৭ হাজার ৮৩৪টি, যা গত বছর ছিল ৬৪ হাজার ১৬৩। ভেড়ার সংখ্যা কমে ৪১ হাজার ৪২৩-এ দাঁড়িয়েছে, যা গত বছর ছিল ৫৫ হাজার ৬৯৭।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের হিসাবে, এ বছর চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর চাহিদা ৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৭১টি। সেই হিসাবে স্থানীয় উৎপাদনের তুলনায় প্রায় ৩৫ হাজার ৫২০টি পশুর ঘাটতি রয়েছে। যদিও গত বছরের তুলনায় চাহিদা কমেছে প্রায় ৭৭ হাজার ৫৯৮টি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থনৈতিক চাপে অনেক ক্রেতা বড় পশুর বদলে ছোট পশুর দিকে ঝুঁকছেন। এতে সামগ্রিক চাহিদা কিছুটা কমেছে।
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা জানান, প্রতিবছরের মতো এবারও রংপুর, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, নোয়াখালী ও পার্বত্য জেলাগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক গবাদিপশু চট্টগ্রামে আসবে। এতে স্থানীয় ঘাটতি পূরণ হওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত পশুও থাকতে পারে। ফলে শেষ পর্যন্ত বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে বলে তারা মনে করছেন।
তবে খামারিদের অভিযোগ ভিন্ন। তাদের মতে, উৎপাদন কমার পেছনে মূল কারণ গোখাদ্য, ওষুধ ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি। বাজারে কার্যকর তদারকি না থাকায় গোখাদ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দাম দ্বিগুণের কাছাকাছি বেড়েছে বলেও দাবি করেন তারা।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মালিক মোহাম্মদ ওমর বলেন, গোখাদ্যের দাম গড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু এ খাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ বা মনিটরিং কার্যত নেই। এতে উৎপাদকরা ইচ্ছামতো দাম বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন। তিনি বলেন, সাধারণ পণ্যের ক্ষেত্রে বাজার তদারকি থাকলেও গোখাদ্যের ক্ষেত্রে তা নেই, যা খামারিদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যেসব খামারির বিকল্প আয়ের উৎস নেই, তারা খরচ সামাল দিতে না পেরে খামার বন্ধ করে দিচ্ছেন। ফলে জেলায় খামারের সংখ্যা কমে যাচ্ছে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে উৎপাদনে।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন এলাকার খামারি মো. রুবেল বলেন, শুধু গোখাদ্য নয়, ওষুধ ও অন্যান্য খরচও বেড়েছে। কৃমিনাশকসহ বিভিন্ন ওষুধের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একজন শ্রমিকের পেছনে মাসে ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালাতে অতিরিক্ত খরচ হয়, যা উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেয়।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাবও খামারে পড়েছে। পরিবহন খরচ বাড়ায় গোখাদ্যের দাম আরও বেড়েছে। সব মিলিয়ে উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় অনেক খামারি পশু হৃষ্টপুষ্টকরণ কমিয়ে দিয়েছেন।
এ অবস্থায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খামার টিকিয়ে রাখতে গোখাদ্যের বাজারে নিয়ন্ত্রণ, প্রণোদনা এবং সহজ শর্তে ঋণসহ নীতিগত সহায়তা জরুরি। অন্যথায় ভবিষ্যতে স্থানীয় উৎপাদন আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।