মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

নিয়োগ পদোন্নতিতে ‘এলাহি কাণ্ড’, চাকরিচ্যুত হয়ে ‘বিশৃঙ্খলা’

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
প্রকাশিত: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০৭ পিএম

শেয়ার করুন:

bank
ছবি- ঢাকা মেইল
# নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বৈধতা দিতে এইচআর নীতিমালা পরিবর্তন
# ১০,৮৩২ নিয়োগের চট্টগ্রামেরই ৮,৫৪২, পটিয়ার ৫,১৪৮ জন
# ২১ বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত থাকলেও ৮ বছরেই ডিএমডি
# শীর্ষ পর্যায়ের ৮৩ কর্মকর্তাকে অস্বাভাবিক দ্রুত পদোন্নতি
# অতিরিক্ত নিয়োগে ব্যয় বেড়েছে শত কোটি টাকা
# মূল্যায়ন পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ায় চাকরিচ্যুত হয়ে বিশৃঙ্খলা

জাতীয় পত্রিকায় কোনো বিজ্ঞপ্তি নেই, নেওয়া হয়নি লিখিত পরীক্ষা, অনেক ক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষাও ছিল না—তবু নিয়োগ পেয়েছেন হাজার হাজার কর্মকর্তা। এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা সাত বছরে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-তে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে এমন চিত্র উঠে এসেছে, যা দেশের ব্যাংকিং খাতের সুশাসন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্র্বতী সরকারে সময়ে বিভিন্ন ধাপ অনুসরণ করে চাকরিচ্যুত করা হয় এই ধরনের ‘অবৈধ’ নিয়োগপ্রাপ্তদের। তবে বিএনপি সরকার গঠনের পর তারা ব্যাংক খাত অস্থিতিশীল করতে উঠেপড়ে লেগেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ব্যাংক খাতের ‘মাফিয়া’ খ্যাত এস আলমকে ফিরিয়ে আনার দাবিও তুলছে।


বিজ্ঞাপন


বাংলাদেশ ব্যাংক ও চারটি অডিট প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত মোট ১০ হাজার ৮৩২ জন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৮ হাজার ৫৪২ জন নিয়োগ পেয়েছেন জাতীয় দৈনিকে কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ছাড়াই। নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সময় ব্যাংকের জনবল ছিল ১৩ হাজার ৫১৫ জন, যা সাত বছরে বেড়ে দাঁড়ায় ২১ হাজার ৭০৬ জনে। এই সময়ে প্রায় ২ হাজার কর্মকর্তা অবসরে গেলেও মোট নিয়োগ দেওয়া হয় ১২ হাজার৩৮৬ জনকে। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ নিয়োগই হয়েছে কোনো ধরনের পাবলিক বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই। অডিট সংশ্লিষ্টদের মতে, এই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুধু অস্বচ্ছই নয়, বরং দেশের প্রচলিত নিয়োগ ব্যবস্থাকে পাশ কাটানোর একটি সুসংগঠিত প্যাটার্ন নির্দেশ করে।

নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বৈধতা দিতে এইচআর নীতিমালা পরিবর্তন

অডিট প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বৈধতা দিতে ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালার ৭.০৪ নম্বর ধারায় পরিবর্তন আনা হয়। সেখানে বলা হয়, জরুরি প্রয়োজনে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শিথিল করে জনবল নিয়োগ দিতে পারবেন। এই ধারাটি ব্যবহার করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, লিখিত পরীক্ষা ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন—এসব নিয়ম প্রায় পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়।

প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহের জন্য একটি অপ্রচলিত পদ্ধতি চালু করা হয়। চট্টগ্রামের পটিয়ায় গ্রুপ চেয়ারম্যানের বাসভবন এবং আসাদগঞ্জে কার্যালয়ে ‘জেনারেল’, ‘ক্যাশ’, ‘পুরুষ, ‘নারী’, ‘ডিপ্লোমা’ ইত্যাদি ক্যাটাগরির নামে বক্স রাখা হতো। প্রার্থীরা এসব বক্সে জীবনবৃত্তান্ত জমা দিতেন। সেখান থেকে বাছাই করা আবেদনগুলো প্রধান কার্যালয়ে পাঠিয়ে সরাসরি নিয়োগপত্র ইস্যু করা হতো—কোনো উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ছাড়াই। অডিট সংশ্লিষ্টদের ভাষায়, এতে একটি ‘বন্ধ নিয়োগ চক্র’ তৈরি হয়, যেখানে বাইরের প্রার্থীদের অংশগ্রহণ কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।

চট্টগ্রামকেন্দ্রিক নিয়োগে আঞ্চলিক বৈষম্য

নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বড় একটি বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে আঞ্চলিক বৈষম্য। অডিট প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মোট নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে প্রায় ৮ হাজার ১০৪ জনই চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা। এর মধ্যে পটিয়া উপজেলারই রয়েছে ৫ হাজার ১৪৮ জন। ২০১৭ সালে চট্টগ্রামে ব্যাংকের জনবল ছিল ৮১১ জন, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৮৫৮ জনে। অন্যদিকে পটিয়ায় জনবল ৪২ জন থেকে বেড়ে ৪ হাজার ৩৩১ জনে পৌঁছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এ ধরনের নিয়োগের ফলে ব্যাংকের আন্তঃজেলা ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলের প্রার্থীরা কার্যত প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়েছেন।

এছাড়া ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতেও গ্রুপভুক্ত অন্যান্য প্রতিষ্ঠান—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স ও পদ্মা লাইফ ইন্স্যুরেন্স—থেকে ৪৩৯ জন কর্মকর্তাকে আনা হয়। এর মধ্যে ১৯৩ জন নিয়োগ পান কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই। বিশ্লেষকদের মতে, এটি একটি নির্দিষ্ট নেটওয়ার্কভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়।

নিয়োগ পরীক্ষায় মানদণ্ড শিথিল

প্রবেশনারি কর্মকর্তা নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও বড় ধরনের অনিয়ম ধরা পড়ে। ২০১৯ সালের ২৪তম ব্যাচে কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ৮৪০টি জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করা হয়। লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেয় ৭৬৩ জন, যেখানে পাস নম্বর ছিল ৫০ শতাংশ। কিন্তু মাত্র ৩৬ জন এই মানদণ্ড পূরণ করেন। পরবর্তী সময়ে মানদণ্ড শিথিল করে মাত্র ২০ শতাংশ নম্বর পাওয়া ৫৫২ জনকে মৌখিক পরীক্ষায় ডাকা হয়। এমনকি ১২ জনকে লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই ব্যাচের প্রার্থীদের ১০০ শতাংশই চট্টগ্রাম অঞ্চলের ছিল।

২০২১ সালের ২৫তম ব্যাচেও একই ধরনের অভিযোগ উঠে আসে। চট্টগ্রামের ১১৭ জন প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয়। ফলে চূড়ান্তভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ১৫০ জনের মধ্যে ১১০ জনই চট্টগ্রামের, অর্থাৎ ৭৩ শতাংশ। একইভাবে ট্রেইনি সহকারী কর্মকর্তা (সাধারণ) ও (ক্যাশ) পদেও প্রচলিত নিয়ম ভেঙে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ট্রেইনি সহকারী কর্মকর্তা (সাধারণ) পদে ২,২৩২ জন এবং (ক্যাশ) পদে ২,৮২৮ জন নিয়োগ পান—যাদের অধিকাংশই বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নির্বাচিত। অডিট সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে মেধা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া কার্যত ভেঙে পড়ে।

অভিজ্ঞতার শর্ত উপেক্ষা করে শীর্ষ পদে নিয়োগ

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে যোগদানের আগে অন্তত ২০ বছরের অভিজ্ঞতা এবং সহকারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগদানের ২১ বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। কিন্তু এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর এসব শর্ত শিথিল করা হয় বলে অভিযোগ। এক্ষেত্রে একজন কর্মকর্তা মাত্র ৮ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতায় উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে উন্নীত হন। একইসঙ্গে পূর্ববর্তী পদে ২ বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত থাকলেও মাত্র ১ বছর ৪ মাসের অভিজ্ঞতায় ওই পদে উন্নীত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে আরেকজন কর্মকর্তা ২০ বছরের পরিবর্তে ১৭ বছরে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হন এবং পূর্ববর্তী পদে ২ বছরের শর্তের বিপরীতে মাত্র ১ বছরের ব্যবধানে পদোন্নতি পান।

দ্রুত পদোন্নতিতে ৮৩ কর্মকর্তা

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা গেছে, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত শীর্ষ পর্যায়ের ৮৩ কর্মকর্তাকে অস্বাভাবিক দ্রুত পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নির্ধারিত সময়ের আগেই ৩টি পদোন্নতি পেয়েছেন, আরেকজন পেয়েছেন ৭টি, আরেকজন ৪টি। একইভাবে একজন নির্বাহী সহ-সভাপতি ৪টি, একজন ৩টি পদোন্নতি পেয়েছেন। অন্যান্য কর্মকর্তারাও একাধিক পদোন্নতি পেয়েছেন নির্ধারিত সময়ের আগেই। নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি পদোন্নতির জন্য কমপক্ষে ৩ বছরের অভিজ্ঞতা এবং মূল্যায়নে ৭৫ শতাংশ নম্বর প্রয়োজন। দ্রুত পদোন্নতির ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশ নম্বরের শর্ত থাকলেও তদন্তে এসবের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অতিরিক্ত নিয়োগে ব্যয় বেড়েছে শত কোটি টাকা

ব্যাংকের নির্ধারিত জনবলের বাইরে প্রায় ২,৯০০ অতিরিক্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। এর ফলে প্রতি বছর প্রায় ১০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। সাত বছরে এই অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। ট্রেইনি সহকারী কর্মকর্তা (ক্যাশ) পদে ২,৮৬৬ জনের মধ্যে অতিরিক্ত ৯৯১ জন, ট্রেইনি সহকারী কর্মকর্তা পদে ২,৩৪০ জনের মধ্যে অতিরিক্ত ৮০৯ জন, মেসেঞ্জার কাম গার্ড পদে ১,৬১৭ জনের মধ্যে অতিরিক্ত ৫৫৯ জন এবং আরডিএস পদে ১,৫২৫ জনের মধ্যে অতিরিক্ত ৫২৭ জন নিয়োগ দেওয়া হয়।

বিশ্লেষকদের অভিমত

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, সাত বছরে নিয়োগপ্রাপ্তদের অধিকাংশ একটি নির্দিষ্ট জেলা থেকে আসা চরম স্বজনপ্রীতির প্রতিফলন। এতে মেধার পরিবর্তে অনুগত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যা ব্যাংকিং খাতের পেশাদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করেছে। এত বড় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীরবতা গাফিলতির শামিল। ব্যাংকিং খাত জনগণের আমানত ও আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু এ ধরনের অনিয়ম সেই আস্থার ভিত্তিকে নষ্ট করে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ঢাকা মেইলকে বলেন, প্রবেশ পর্যায়ে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়াই প্রচলিত নিয়ম। দক্ষ কর্মকর্তা পেতে এই জায়গায় কোনো ধরনের আপস করা উচিত নয়। তিনি বলেন, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নিয়োগ দিলে ব্যাংকের সুশাসন বলে কিছু থাকে না।

বিশেষ মূল্যায়ন পরীক্ষা ও পরবর্তী পদক্ষেপ

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ইসলামী ব্যাংক এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হলে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অডিট প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য একটি বিশেষ দক্ষতা মূল্যায়ন পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এই পরীক্ষা স্থগিতের দাবিতে আদালতে রিট করা হলেও পরে আদালত বিষয়টি নিষ্পত্তি করে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, পরীক্ষা আয়োজনের ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে ২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ব্যাংকের তথ্যমতে, মোট ৫ হাজার ৩৭৪ জন কর্মকর্তার মধ্যে মাত্র ৪০২ জন পরীক্ষায় অংশ নেন এবং সবাই উত্তীর্ণ হন। বর্তমানে তারা চাকরিতে বহাল আছেন। একই সময়ে নিয়মিত প্রক্রিয়ায় নিয়োগপ্রাপ্ত ২৬১ জন কর্মকর্তাকে এই পরীক্ষা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

অন্যদিকে ৪ হাজার ৯৭২ জন কর্মকর্তা পরীক্ষায় অংশ নেননি এবং ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা পরীক্ষায় অংশ নিতে আগ্রহীদের বাধা দেওয়া, ভয়ভীতি প্রদর্শন, কর্মবিরতি, বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করেছেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এসব কর্মকাণ্ডকে শৃঙ্খলা ভঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করে এবং মানবসম্পদ নীতিমালার সংশ্লিষ্ট ধারার আওতায় তাদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা

চাকরি ফেরত চেয়ে অন্তর্র্বতী সরকারের সময় থেকেই আন্দোলন করে আসছেন চাকরিচ্যুতরা। তবে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের আন্দোলন আরও বাড়তে থাকে। সম্প্রতি এস আলমের নিয়ন্ত্রণে ছিল এমন পাঁচটি ব্যাংকের চট্টগ্রামের পটিয়া অঞ্চলের কয়েক হাজার চাকরিচ্যুত কর্মকর্তারা রাজধানী মতিঝিলে দিলকুশা এলাকায় ইসলামী ব্যাংকের সামনে অবস্থান নেয়।

গত ১৯ এপ্রিল সকালে হঠাৎ করেই মতিঝিলের দিলকুশা এলাকায় তারা অবস্থান নেন। এসময় তারা বর্তমান পর্ষদ বাতিল করতে হবে, আগের মালিকদের হাতে ব্যাংক ফিরিয়ে দিতে হবে, চাকরিচ্যুতদের পুনর্বহাল করতে হবেসহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। ওইদিন রাজধানীর ব্যাংক পাড়ায় চাকরিচ্যুতদের বিশাল আন্দোলন দেখানোর জন্য দুদিন যাবত চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজনকে ঢাকায় এনে বিভিন্ন হোটেলে রাখা হয়। আগের দিন রাতেও কয়েকশ মাইক্রো- বাসে করে তারা ঢাকায় আসেন। অভিযোগ রয়েছে, অনেককে নকল আইডি কার্ড বানিয়ে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা সাজিয়ে আন্দোলনে নিয়ে আসা হয়। 

আন্দোলনকারীদের অনেককে তাদের ব্রাঞ্চ আইডেন্টি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে অনেকেই বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন।

পরবর্তী সময়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের সামনে পাল্টা কর্মসূচি পালন করেন ব্যাংকটির গ্রাহকরা। এসময় তাদের আসতে সরে যান পটিয়া থেকে আসা চাকরিচ্যুত আন্দোলনকারীরা। ব্যাংকের সামনে এই ধরনের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির কারণে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। আতঙ্কিত হচ্ছেন গ্রাহকরা।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতি বিশ্লেষক এম হেলাল আহমেদ জনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘২০১৭ সালে জোরপূর্বক ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তনের পর ব্যাংকটিকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন তৎপরতা শুরু হয়। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এবং কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়াই বিপুল সংখ্যক জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়।’

তিনি অভিযোগ করেন, ‘এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একটি নির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বড় ধরনের দুর্নীতি ও জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল।’

হেলাল আহমেদ মনের করেন, ‘বর্তমান সংকটের সমাধানে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ব্যাংক কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। এই কমিশনের মাধ্যমে ব্যাংকের সমস্যা ও সম্ভাবনাগুলো চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত একটি সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা, যাতে ব্যাংকগুলো পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে পারে।’

ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলতাফ হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘একটি বড় প্রতিষ্ঠানে সাধারণত নিয়মের বাইরে কিছু করা হয় না। চাকরিচ্যুত কর্মীদের পুনর্বহাল হবে কি না- তা আদালতে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। চাকরিচ্যুত কর্মীরা তাদের দাবিগুলো আদালতে উপস্থাপন করেছেন। আদালত এসব বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত দেবেন।’

প্রসঙ্গত, ১৯৮৩ সালের ১৩ মার্চ দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম শরিয়াহভিত্তিক এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তৎকালীন কিছু সৎ ও দক্ষ মানুষের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই ব্যাংক খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। পর্যায়ক্রমে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এই ব্যাংকের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী হিসেবে, আমানতকারী হিসেবে, বিনিয়োগ গ্রাহক হিসেবে, বিশেষ গ্রাহক হিসেবে কিংবা শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে। সৎ পরিচালনা পর্ষদ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের সততার দরুণ আমানত-বিনিয়োগে একপর্যায়ে এক পর্যায়ে শীর্ষ অবস্থান লাভ করে ব্যাংকটি। 

এ ব্যাংকটি বাংলাদেশের বেস্ট ব্যাংক, বেস্ট ইসলামিক ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন হিসেবে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেকবার অ্যাওয়ার্ড লাভ করে। ২০১৭ সালে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের হস্তক্ষেপে ব্যাংকটি দখলে নেয় এস আলম গ্রুপ। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

টিএই/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর