বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

উদ্বেগজনক মূলধন ঘাটতি, ব্যাংক খাতে ‘অশনি সংকেত’!

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
প্রকাশিত: ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৪৫ পিএম

শেয়ার করুন:

উদ্বেগজনক মূলধন ঘাটতি, ব্যাংক খাতে ‘অশনি সংকেত’!
  • ২৩ ব্যাংকের ঘাটতি বেড়ে ২.৮২ লাখ কোটি
  • তিন মাসে মূলধন ঘাটতি বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ
  • রাষ্ট্রায়ত্ত ৪ ব্যাংকের ঘাটতি ৩৭ হাজার কোটি
  • বেসরকারি ৯ ব্যাংকের ঘাটতি ৩৬ হাজার কোটি
  • ৮ ইসলামি ব্যাংকের ঘাটতি এক লাখ ৭৬ হাজার কোটি
  • ২ বিশেষায়িত ব্যাংকের ঘাটতি ৩২ হাজার কোটি

দেশের ব্যাংকিং খাতে মূলধন সংকট উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধির প্রভাবে গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ২৩টি ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। অথচ একই বছরের জুন শেষে এ ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা।


বিজ্ঞাপন


বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে এই চিত্র উঠে এসেছে।

ব্যাংকের মোট ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম মূলধন বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে কোনো ব্যাংকের নিজস্ব মূলধন (পরিশোধিত মূলধন, সংরক্ষিত আয় ইত্যাদি) সেই নির্ধারিত মাত্রার নিচে নেমে গেলে যে ঘাটতি সৃষ্টি হয়, তাকে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বলা হয়। এটি সাধারণত খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, প্রভিশন ঘাটতি বা আর্থিক ক্ষতির ফলে তৈরি হয় এবং ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ, দুর্বল নজরদারি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ঋণ অনুমোদনের সংস্কৃতি ব্যাংক খাতকে এই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় নিয়ে এসেছে। মূলধনের বড় ধরনের ঘাটতির ফলে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ক্ষেত্রেও চাপ তৈরি হচ্ছে।

তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণে ব্যর্থ হয় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো। ফলে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৪ হাজার ২৩১ কোটি টাকা, যা সরাসরি মূলধন সংকটকে আরও গভীর করেছে। তবে অন্যান্য ব্যাংকগুলোতে এ ধরনের ঘাটতি নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


বিজ্ঞাপন


বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার সূচক বা সিআরএআর নেমে যায় ঋণাত্মক ২ দশমিক ৯০ শতাংশে, যেখানে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী এটি কমপক্ষে ১০ শতাংশ থাকা প্রয়োজন। এর আগে জুন শেষে এই হার ছিল ইতিবাচক ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

আরও পড়ুন

রিজার্ভের তিন গুণেরও বেশি বিদেশি ঋণ

ব্যাংক-শেয়ারবাজারে অনিশ্চয়তা, সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকছেন বিনিয়োগকারীরা!

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি ব্যাংকের এমডি ঢাকা মেইলকে বলেন, মূলধন হলো ব্যাংকের মেরুদণ্ড। এটি দুর্বল হলে ব্যাংক স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না। ব্যাংকের মূলধন দুর্বল হলে বড় অংকের ঋণ বা একক গ্রাহককে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিদেশি ব্যাংক থেকে অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রেও মূলধনের শক্তি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিদেশি অংশীদাররা ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করেই বিনিয়োগ করে।

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি ব্যাংকের মোট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকের ঘাটতি সর্বোচ্চ ১৯ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা। এছাড়া অগ্রণী ব্যাংকের ৮ হাজার ১২৫ কোটি, রূপালী ব্যাংকের ৫ হাজার ৬৫৫ কোটি এবং বেসিক ব্যাংকের ৩ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে।

Bank2

বেসরকারি খাতের ৯টি ব্যাংকও মূলধন সংকটে পড়েছে, যেখানে মোট ঘাটতির পরিমাণ ৩৬ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঘাটতি সর্বোচ্চ ১০ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা। এরপর এবি ব্যাংক (৭ হাজার ২০৫ কোটি), পদ্মা ব্যাংক (৫ হাজার ৮৩৭ কোটি), প্রিমিয়ার ব্যাংক (৪ হাজার ৭৩৩ কোটি), আইএফআইসি ব্যাংক (৪ হাজার ৪৫৫ কোটি), বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক (১ হাজার ৯৬৮ কোটি), ইউসিবি (১ হাজার ২৮৮ কোটি), এনআরবিসি ব্যাংক (৪৩৬ কোটি) এবং সীমান্ত ব্যাংক (৩৪ কোটি টাকা) ঘাটতিতে রয়েছে।

আরও পড়ুন

এবারও গতানুগতিক মুদ্রানীতি!

বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু

সবচেয়ে বেশি চাপ দেখা গেছে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোতে। এ খাতে মোট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৫ হাজার ৮২২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি সর্বোচ্চ ৬৫ হাজার ৯০ কোটি টাকা। ইউনিয়ন ব্যাংকের ২৭ হাজার ১০৩ কোটি, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ২২ হাজার ৯৮২ কোটি, এক্সিম ব্যাংকের ২২ হাজার ৬২৫ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ২২ হাজার ১১৪ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৩ হাজার ৭৫৮ কোটি, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের ২ হাজার ১২ কোটি এবং আল-আরাফাহ্ ব্যাংকের ১৩৮ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে।

বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মধ্যেও সংকট প্রকট। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৮০৪ কোটি টাকা এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি ২ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, মূলধন ঘাটতির কারণে ব্যাংকগুলো ঝুঁকি নিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে। অনেক ব্যাংক এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ঋণঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বিদেশি ব্যাংকগুলোর আগ্রহও কমছে, ফলে অর্থায়নের ব্যয় বাড়ছে।

তিনি সংকট উত্তরণে দ্রুত আইনি নিষ্পত্তি, কার্যকর ব্যাংক রেজুলেশন কাঠামো চালু এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি খেলাপিদের তালিকা প্রকাশ ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, খেলাপি ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রভিশন সংরক্ষণের চাপও বাড়ছে। কিন্তু ব্যাংকগুলো পর্যাপ্ত মুনাফা করতে না পারায় প্রভিশন ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত মূলধন সংকটে রূপ নিচ্ছে। তার মতে, সমস্যাগ্রস্ত কয়েকটি ব্যাংকের কারণেই সামগ্রিকভাবে খাতের সিআরএআর ঋণাত্মক হয়েছে, যদিও অন্যান্য ব্যাংকের অবস্থা তুলনামূলক ভালো।

টিএই/জেবি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর