বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

আরও প্রকট জ্বালানি সংকট, সমাধান কোন পথে?

মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
প্রকাশিত: ২৬ মার্চ ২০২৬, ০৮:৩৫ পিএম

শেয়ার করুন:

fuel
জ্বালানি সংকট বেড়েই চলছে। ছবি: ঢাকা মেইল
  • বাড়ছে আতঙ্ক, পাম্পগুলোতে দীর্ঘ হচ্ছে লাইন
  • সরবরাহব্যবস্থারও দুর্বলতা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা
  • অতিরিক্ত কেনার প্রবণতায় সাময়িক সংকট: মন্ত্রী
  • দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি ও অপচয় রোধের তাগিদ

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই দেশে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। ডিজেলের সংকট ততটা না থাকলেও প্রকাশ্যে হাহাকার পেট্রোল, অকটেনের। শহর নগর এমনকি গ্রামেও প্রতিটি পাম্পের সামনে গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইন। বাস্তবে যতটা না সংকট, আতঙ্কের কারণে তা আরও ঘনীভূত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, সম্ভাব্য বাজার কারসাজি এবং আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটা– এগুলোর কারণে পেট্রোল ও অকটেনের বর্তমান সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতা, কঠোর নজরদারি এবং ভোক্তা পর্যায়ে সচেতনতা– এই তিনটি দিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।


বিজ্ঞাপন


তথ্য বলছে, দেশে পেট্রোলের পুরো চাহিদাই দেশীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পেট্রোলের মোট চাহিদা ছিল চার লাখ ৬২ হাজার ৪৭৫ টন, যার শতভাগই দেশে উৎপাদন হয়েছে। অপরিশোধিত তেল থেকে ১৬ শতাংশ উৎপাদন করে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। বাকি ৮৪ শতাংশ বেসরকারি রিফাইনারি থেকে উৎপাদিত হয়। অকটেনের ক্ষেত্রেও বড় অংশ দেশেই উৎপাদিত হয়, মূলত কনডেনসেট থেকে। প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের সময় পাওয়া এই উপজাত তরল পদার্থ পরিশোধন করে অকটেন তৈরি করা হয়। গত অর্থবছরে প্রায় পাঁচ লাখ ৯৭ হাজার টন কনডেনসেট সংগ্রহ ও পরিশোধন করা হয়েছে। তবে অকটেনের চাহিদা পূরণে ঘাটতি রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চার লাখ ১৫ হাজার টন চাহিদার বিপরীতে দুই লাখ ৩৪ হাজার ৮৩ টন এমন অকটেন আমদানি করে বিপিসি।

আরও পড়ুন

জ্বালানি তেলের মজুত পর্যাপ্ত, তবুও কেন সংকট?

গত পাঁচ বছরে পেট্রোল ও অকটেনের ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে পেট্রোল বিক্রি হয়েছিল তিন লাখ ৭৮ হাজার টন, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে চার লাখ ৬২ হাজার টনে। একই সময়ে অকটেনের ব্যবহার তিন লাখ টন থেকে বেড়ে চার লাখ ১৫ হাজার টনে পৌঁছেছে।

oil2
তেলের পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন। ছবি: ঢাকা মেইল

রাজধানীর বেশ কয়েকটি পাম্প ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি পাম্পেই মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন। অকটেন নিতে লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন অন্তত ৪০-৫০ জন। মতিঝিলের একটি ফিলিং স্টেশনের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মামুনুল বলেন, অনেক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি। বলা হচ্ছে বিকেলে তেল আসবে। কিন্তু কখন পাবো, জানি না।

রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেল চালক হোসেন বলেন, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে যে পরিমাণ তেল পাচ্ছি, তা দিয়ে কাজ চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে আয় কমে যাবে।

শুধু পেট্রোল কিংবা অকটেন নয়, সংকট দেখা দিয়েছে ডিজেলেরও। ফলে ট্রিপ কমাতে বাধ্য হচ্ছেন গণপরিবহণ মালিকরা। শ্যামলী পরিবহনের একজন সুপারভাইজার নাম প্রকাশ না করে বলেন, আমার এই গাড়িতে একবারে ২৫০ লিটার তেল লোড করি। কিন্তু এখন এমন একটা অবস্থা যে, হাতে পায়ে ধরেও ২০০ লিটার লোড করা যায় না।

আরও পড়ুন

দেশে এক মাসের জ্বালানি তেলের মজুত আছে: মন্ত্রিপরিষদ সচিব

পাম্প মালিকদের অভিযোগ, সমস্যার বড় অংশই সরবরাহ চেইনে। পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম বলেন, ডিপো থেকে চাহিদামতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না। পেট্রোল-অকটেন দেশেই উৎপাদিত–তাই এমন সংকট হওয়ার কথা নয়। তার দাবি, বেসরকারি কনডেনসেট রিফাইনারি ইউনিটগুলো দাম বাড়ার আশায় সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে।

দেশে অকটেনের মজুত সক্ষমতা ৫৩ হাজার ৩৬১ টন। মার্চ মাসে এর গড় চাহিদা ছিল ৩৬ হাজার ৭০০ টন। গত মঙ্গলবারের তথ্য বলছে, অকটেনের মজুত ৯ হাজার ৮২৯ টনে নেমে এসেছে। দৈনিক এক হাজার ১৯৩ টন সরবরাহ বিবেচনায় দেশে এখন মাত্র আট দিনের অকটেন মজুত রয়েছে। অন্যদিকে পেট্রোলের মজুত সক্ষমতা ৩৭ হাজার ১৩ টন। চলতি মার্চ মাসে পণ্যটির গড় চাহিদা দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ১০০ টনে। বর্তমানে পেট্রোলের মজুত রয়েছে ১৬ হাজার ২২৫ টন। দৈনিক গড়ে এক হাজার ৪৯৬ টন সরবরাহ বিবেচনায় এই মজুতে আর মাত্র ১১ দিন চলা যাবে।

বিপিসির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, মজুত মোটামুটি রয়েছে; কিন্তু আগামী দিনগুলোর কথাও ভাবতে হবে। হুট করে কোনো চালান আটকে গেলে পুরো সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। তাই সরবরাহ চেইনে একটু লাগাম টানা হয়েছে।

Oil3
চাহিদা মতো তেল পাচ্ছে না পরিবহনগুলো। ছবি: ঢাকা মেইল

এবিষয়ে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক সমিতির সভাপতি ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘দেশে যে সংকটটা তৈরি হয়েছে এটা মোকাবিলায় সরকার দুটি পদক্ষেপ নিতে পারে। আমরা আগেও বলেছি, আমাদের দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে। আর আমাদের প্রচুর পরিমাণে জ্বালানি অপচয় হয়, এই জ্বালানি অপচয় রোধ করতে হবে। আমাদের আরও সঞ্চয়ী হতে হবে।’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেইন বলেন, ‘উৎপাদনের উৎস ঠিক আছে, কিন্তু সরবরাহে সমস্যা হলে সেটি বাজার কারসাজির ইঙ্গিত হতে পারে। সরকারকে বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে হবে।’

আরও পড়ুন

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সম্ভাব্য করণীয়

সম্প্রতি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল মজুত ও সরবরাহ রয়েছে। তবে হঠাৎ করে তেল কেনার প্রবণতা এবং ব্যক্তিগতভাবে অতিরিক্ত মজুত করার কারণে অনেক পাম্পে সময়ের আগেই তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে। ঈদের সময় সারা দেশে যানবাহন চলাচলে কোথাও তেলের অভাবে বড় ধরনের সমস্যা হয়নি। ফলে প্রকৃত অর্থে জ্বালানি তেলের ঘাটতি নেই, বরং অতিরিক্ত কেনার প্রবণতাই সাময়িক চাপ তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে অকারণে তেল মজুত না করার জন্য তিনি সবাইকে আহ্বান জানান।

টিএই/জেবি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর