বিষণ্ণতা বলতেই আমাদের মনে এমন এক মানুষের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে যিনি একা থাকেন, রোজ কাঁদেন বা দৈনন্দিন জীবনের কাজের শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। সত্যিই কি তাই? সবাই কি একইভাবে বিষণ্ণতা প্রকাশ করেন?
না। এমন অনেকেই আছেন যারা দেখতে বেশ হাসিখুশি, কর্মক্ষেত্রে সফল, বন্ধুদের আড্ডায় রসিকতায় মেতে ওঠেন। এমনকি ব্যস্ত সামাজিক জীবনও সমানতালে সামলান। অথচ ভেতরে ভেতরে ভোগেন তীব্র মানসিক কষ্টে। নিজের অজান্তেই কোনো আপনজন কিংবা আপনি নিজেই এই নীরব বিষণ্ণতার শিকার হচ্ছেন না তো? চলুন জেনে নিই কীভাবে চিনবেন হাসিমুখের আড়ালের এই সুপ্ত মানসিক সংকট-
‘স্মাইলিং ডিপ্রেশন’ কী?
একজন মানুষকে বাইরে থেকে যতই হাসিখুশি দেখাক না কেন, ভেতরে ভেতরে তিনি আসলে বিষণ্ণ ও হতাশ বোধ করেন। স্মাইলিং ডিপ্রেশনের এমন সংজ্ঞাই দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্য গবেষক ডক্টর অলিভিয়া রেমিস।
তিনি আরও বলেন, এই সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিরা ভেতরের অবস্থা আড়াল করার জন্য এক ধরণের ‘মাস্কিং’ বা সামাজিক মুখোশ ব্যবহার করেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে বিষণ্ণতার একটি ‘অস্বাভাবিক’ রূপ হিসেবে দেখা হয়।
মানুষ বিষণ্ণতা গোপন করে কেন?
এ বিষয়ে ডক্টর রেমিস বলেন, অনেকে বুঝতেই পারেন না যে তারা বিষণ্ণতায় ভুগছেন। তার মতে, ‘তারা হয়তো মনে করেন, উপসর্গগুলো তাদের ব্যস্ত ও চাপপূর্ণ জীবনযাপনেরই একটি অংশ।’
তবে, তাদের মধ্যে কিছু ব্যক্তি, বিশেষ করে যারা পারফেকশনিস্ট এবং অতি কর্তব্যপরায়ণ, তারা নিজের সমস্যা স্বীকার করতে অস্বস্তিবোধ করেন। সামাজিক কলঙ্ক, সমালোচনা বা সম্পর্কের ক্ষতি হতে পারে এই ভয়ে নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন তারা।
আরও পড়ুন: আপনি হতাশায় ভুগছেন কি না এসব লক্ষণে বুঝে নিন
বিষণ্ণতা গোপনের ঝুঁকি
বাহ্যিকভাবে হাসিখুশি অথচ ভেতরে চেপে যাওয়া এই মানসিক কষ্ট ব্যক্তির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট অধ্যাপক বার্নি ডান বলেন, ‘বিষণ্ণতা আমাদের বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং নিঃসঙ্গ বোধ করায়। আর মন খারাপের সেরা প্রতিষেধক-অন্যদের সঙ্গে প্রায়ই যোগাযোগ বজায় রাখা।’

বিষয়টি এড়িয়ে গেলে তা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে, এমনকি আত্মহত্যার ঝুঁকিও বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে সতক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্মাইলিং ডিপ্রেশনের ৭টি লক্ষণ যা সহজে চোখে পড়ে না
১. প্রিয় শখ বা কাজগুলো হঠাৎ একঘেয়ে লাগতে শুরু করে।
আরও পড়ুন: যেসব লক্ষণে বুঝবেন ডিপ্রেশনে ভুগছেন
২. হাত-পা ভারী লাগা শুরু করে। চলাফেরা করতে কষ্ট হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে ‘লেডেন প্যারালাইসিস’ বলে। ৩. নিজের অনুভূতি আর লুকাতে না পেরে শেষ মুহূর্তে কোনো পরিকল্পনা বাতিল করা বা আড্ডা এড়িয়ে যাওয়া।

৪. সারাদিন চোখে অতিরিক্ত ঘুম ও শরীরে ক্লান্তি ভর করে থাকে। ডক্টর রেমিস বলেন, ‘এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দিনের শেষে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঘুমের প্রয়োজন হতে পারে।’
৫. এসময় ব্যক্তি অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়েন। সামান্য সমালোচনা বা প্রত্যাখ্যানেই তিনি বেশি কষ্ট পান।
আরও পড়ুন: ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির উপায়
৬. নিজেকে সবসময় অতিরিক্ত হাসিখুশি বা মজার মানুষ হিসেবে দেখানো প্রচেষ্টা করেন। আড্ডার প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠে বা অতিরিক্ত কাজে ডুবে থেকে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করেন।

৭. নিজের কাজ ও যোগ্যতা নিয়ে ক্রমাগত সন্দেহ তৈরি হয়। মনে মনে নিজেকে মূল্যহীন ও শূন্য মন করতে থাকেন।
উত্তরণের উপায় কী?
অধ্যাপক বার্নি ডানের পরামর্শ, নিজের অনুভূতি আর না লুকিয়ে বিশ্বস্ত কোনো মানুষের সঙ্গে সেগুলো ভাগ করে নিতে হবে। সমস্যা গুরুতর হলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
তিনি বলেন, “কথা বলা, বিষণ্ণতারোধী ওষুধ এবং সামাজিক চিকিৎসা এ সবই যে কার্যকর সমাধান হতে পারে এমন জোরালো প্রমাণ রয়েছে।”
তথ্যসূত্র: বিবিসি
এএ




