ধানমন্ডির একটি সুসজ্জিত সেন্টারে পিনপতন নীরবতা। এটি কোনো লাইব্রেরি নয়, এটি ‘জিম’। তবে এখানে লোহার ডাম্বেল বা ট্রেডমিলের ঝনঝনানি নেই; আছে স্নিগ্ধ সুর, ধূপের ঘ্রাণ আর গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের এক অদ্ভুত প্রশান্তি। সদস্যরা এখানে ঘাম ঝরিয়ে ক্যালরি পুড়াতে আসেননি; এসেছেন মনের ওপর জমে থাকা যান্ত্রিক জীবনের ‘মেদ’ ঝরিয়ে নিজেকে নতুন করে চিনতে।
২০২৬ সালে এসে ঢাকার নাগরিক জীবনে ‘ফিটনেস’ শব্দের সংজ্ঞা বদলে গেছে। শরীরের পেশি বাড়ানোর পাশাপাশি এখনকার প্রধান ট্রেন্ড ‘টোটাল ফিটনেস’- যেখানে শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক, সামাজিক ও আত্মিক সুস্থতাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
শরীর ফিট, কিন্তু মন কি তৈরি?
এক সময় জিম মানেই ছিল সুঠাম দেহ আর সিক্স-প্যাক তৈরির লড়াই। কিন্তু বর্তমানের প্রতিযোগিতামূলক জীবনে শুধু পেশি বাড়ালেই সুস্থ থাকা সম্ভব নয়। বিএসএমএমইউর মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. হেলাল উদ্দীন বলেন, ‘শরীরের সামান্য অসুখ হলেই আমরা দৌড়াদৌড়ি করি, কিন্তু মন অসুস্থ হচ্ছে কি না তা টেরই পাই না। অথচ আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, সম্পর্ক ও কর্মক্ষমতা নির্ভর করে মন কতটা শান্ত ও সক্রিয় আছে তার ওপর। মন ভালো না থাকলে শরীরের যতই পেশি থাকুক না কেন, প্রকৃত সুখী হওয়া যায় না।’
আরও পড়ুন: মানসিক চাপ ডেকে আনে মৃত্যুও! যেসব লক্ষণে সাবধান হবেন
মেন্টাল জিমের চারটি স্তম্ভ
ঢাকার আধুনিক মানসিক ব্যায়ামাগারগুলো মূলত চারটি স্তরে সদস্যদের ‘টোটাল ফিটনেস’ অর্জনে কাজ করছে-
১. মানসিক ফিটনেস (মেডিটেশন ও মাইন্ডফুলনেস)
স্ট্রেস ও অ্যাংজাইটি কমাতে মেডিটেশন এখন প্রধান হাতিয়ার। ভিআর (ভার্চুয়াল রিয়েলিটি) প্রযুক্তির মাধ্যমে সদস্যরা যান্ত্রিক ঢাকা ছেড়ে কাল্পনিক কোনো পাহাড় বা সমুদ্রের স্নিগ্ধ পরিবেশে হারিয়ে যান, যা ডিজিটাল ডিটক্স হিসেবে কাজ করে।
২. সামাজিক ফিটনেস ও ‘এমপ্যাথি সার্কেল’
একাকীত্ব কাটাতে বাস্তব সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে ‘এমপ্যাথি সার্কেল’। এটি এমন একটি সেশন যেখানে ৫-৬ জন সদস্য একটি বৃত্তে বসে ১০-১৫ মিনিট করে নিজেদের জীবনের সংকটের গল্প বলেন। বাকিরা কোনো বিচার বা উপদেশ ছাড়াই শুধু মন দিয়ে তা শোনেন। এটি সদস্যদের মধ্যে সহমর্মিতা বাড়ায়।
৩. শারীরিক ও খাদ্য সচেতনতা
এখানে ডাম্বেলের চেয়ে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রক্রিয়াজাত খাবারের বদলে প্রাকৃতিক খাবারে অভ্যস্ত করা এবং নিয়মিত যোগব্যায়াম ও দমের চর্চা শেখানো হয়।
আরও পড়ুন: দিনের পর দিন মনে রাগ জমিয়ে রাখছেন? জানুন কী ক্ষতি হচ্ছে নিজের!
৪. আত্মিক ফিটনেস ও পরার্থপরতা
অন্যের জন্য কিছু করার সক্ষমতা বা পরোপকার এখানে ফিটনেস রুটিনেরই অংশ। নিঃস্বার্থ সেবা কীভাবে মস্তিষ্কে ‘হ্যাপি হরমোন’ নিঃসৃত করে, সেটিই এখানে হাতে-কলমে শেখানো হয়।
‘আমি এখন অনেক শান্ত’: আরিশার বদলে যাওয়ার গল্প
একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত আরিশা আহমেদ (২৯) গত ছয় মাস ধরে একটি মেন্টাল জিমে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, “আগে আমি কর্মক্ষেত্রে সামান্য কারণেই রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম না, যার প্রভাব আমার সম্পর্কেও পড়ত। কিন্তু মেন্টাল জিমের ‘এমপ্যাথি সার্কেলে’ অন্যের জীবনের লড়াইয়ের গল্প শুনে আমি বুঝেছি আমি একা নই। অন্যের কথা শোনার এই অভ্যাস আমার ভেতরের অস্থিরতা কমিয়ে দিয়েছে। এখন আমি আগের চেয়ে অনেক বেশি শান্ত এবং কর্মক্ষেত্রে সৃজনশীল।”
উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও বৈশ্বিক প্রবণতা
গ্লোবাল ওয়েলনেস ইনস্টিটিউটের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫-৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে মেন্টাল ফিটনেস মার্কেট প্রায় ১৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে। ঢাকাও এই গ্লোবাল ট্রেন্ডের বাইরে নয়। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় সাধারণ জিমের পাশাপাশি অন্তত একটি করে মেন্টাল ফিটনেস সেন্টার গড়ে উঠবে। এটি কেবল ফ্যাশন নয়, বরং যান্ত্রিক যুগে টিকে থাকার এবং বিষণ্নতা বা আত্মহত্যার মতো সামাজিক সমস্যা প্রতিরোধের অন্যতম হাতিয়ার হবে।
টোটাল ফিটনেস অর্জনের ৫টি বিশেষজ্ঞ পরামর্শ
১. মন খুলে কথা বলুন: সমস্যা চেপে না রেখে বিশ্বস্ত বন্ধু বা বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন।
২. খাদ্যাভ্যাস: প্যাকেটজাত খাবারের বদলে প্রাকৃতিক খাবার বেছে নিন, যা মেজাজ ফুরফুরে রাখে।
৩. মেডিটেশন: প্রতিদিন অন্তত ১৫-২০ মিনিট নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের ওপর মনোযোগ দিন।
৪. সোশ্যাল মিডিয়া ডিটক্স: সপ্তাহে অন্তত একদিন স্মার্টফোন থেকে দূরে থেকে প্রিয় মানুষের সাথে সরাসরি আড্ডা দিন।
৫. পর্যাপ্ত ঘুম: শরীর ও মনকে রিচার্জ করতে রাতে অন্তত ৭-৮ ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন ঘুম নিশ্চিত করুন।




