হাম কেবল সাধারণ কোনো জ্বর বা র্যাশ নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত সংক্রামক এবং সঠিক সময়ে ব্যবস্থা না নিলে প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশু এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে হাম মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে। বর্তমানে দেশে হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর শিশুদের টিকাদানের বয়সে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে।
৯ মাসের আগে হাম ও নতুন সরকারি সিদ্ধান্ত
বিজ্ঞাপন
সাধারণত বাংলাদেশে শিশুদের ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে দুই ডোজ হামের (এমআর) টিকা দেওয়া হয়। তবে বর্তমান 'আউটব্রেক' বা সংক্রমণ পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে সরকার টিকা দেওয়ার সর্বনিম্ন বয়স ৯ মাস থেকে কমিয়ে ৬ মাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সোমবার (৩০ মার্চ) ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি কমিটির বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক হালিমুর রশিদ জানান, বিশেষ পরিস্থিতিতে এখন ৬ মাস বয়সী শিশুকেও টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া যাবে। এছাড়া আগামী জুনের প্রথম সপ্তাহ থেকে এক মাসব্যাপী বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

কেন হাম প্রাণঘাতী হতে পারে?
বিজ্ঞাপন
চিকিৎসকদের মতে, টিকা না নেওয়া বা দুর্বল ইমিউনিটির শিশুদের ক্ষেত্রে হাম ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এর প্রধান জটিলতাগুলো হলো-
নিউমোনিয়া: হামের পর ফুসফুসে মারাত্মক সংক্রমণ হতে পারে।
ডায়রিয়া: দীর্ঘমেয়াদী ও মারাত্মক ডায়রিয়ার ফলে শিশু ডিহাইড্রেশনে ভুগতে পারে।
ভিটামিন-এ স্বল্পতা: হামের কারণে শরীরে ভিটামিন-এ এর মাত্রা কমে যায়, যা থেকে অন্ধত্বও হতে পারে।
মস্তিষ্কে সংক্রমণ: বিরল হলেও কিছু ক্ষেত্রে ভাইরাসটি মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।

র্যাশ ওঠার আগেই শনাক্ত করবেন যেভাবে
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মো. সিয়াম মোয়াজ্জেমের মতে, শরীরে লালচে র্যাশ বা ফুসকুড়ি ওঠার ৩ থেকে ৫ দিন আগেই হামের সংক্রমণ শুরু হয়। জ্বর, শুকনো কাশি, সর্দি এবং চোখ লাল হয়ে পানি পড়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে সেটিকে সাধারণ ঠাণ্ডা-জ্বর ভেবে অবহেলা করা যাবে না। বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব লক্ষণ দেখা দিলে শিশুকে দ্রুত অন্যদের থেকে আলাদা (আইসোলেশন) করতে হবে।
আরও পড়ুন: চোখ রাঙাচ্ছে হাম, যা জানা জরুরি!
টিকা নিলেও কি হাম হতে পারে?
হামের টিকা সাধারণত ৯০-৯৫ শতাংশ কার্যকর। তবে শিশু যদি চরম অপুষ্টিতে ভোগে বা অন্য কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত থাকে, তবে টিকা নেওয়ার পরও সে সংক্রমিত হতে পারে। তবে আশার কথা হলো, টিকা নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে রোগের তীব্রতা অনেক কম থাকে এবং তারা দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে।

সংক্রমণ রোধে সচেতনতা
১. দ্রুত ব্যবস্থা: সর্দি-কাশি বা জ্বরের লক্ষণ দেখা দিলে শিশুকে স্কুলে না পাঠিয়ে বাড়িতে বিশ্রামে রাখুন।
২. হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার: শিশুদের রুমাল ব্যবহার এবং বারবার হাত ধোয়ার অভ্যাস শেখাতে হবে।
৩. বুকের দুধ: শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং বা মায়ের দুধের কোনো বিকল্প নেই।
আরও পড়ুন: হাম কি ছোঁয়াচে রোগ?
হাম একটি অত্যন্ত দ্রুত ছোঁয়াচে রোগ; একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক সময়ে টিকা নিশ্চিত করা এবং লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই শিশুকে প্রাণঘাতী ঝুঁকি থেকে বাঁচানোর একমাত্র উপায়।
এজেড

