হাম বা মিজেলসের প্রাদুর্ভাব প্রতিবছরই দেখা যায়। বসন্তে রোগটি বেশি হয়। শিশুরা আক্রান্ত হয় বেশি। তবে চলতি বছর যেন তা লাগামহীন হয়ে পড়েছে। হামের কারণে ইতোমধ্যে বেশ কিছু শিশু প্রাণ হারিয়েছে। তাই অভিভাবকদের মনে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। হাম সম্পর্কে জানা এবং সচেতন হওয়া উচিত সবারই-
হাম বা মিজেলস (Measles) কী?
এটি একটি ভাইরাসজনিত অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা measles virus‑এর মাধ্যমে ছড়ায়। প্রধানত শিশুদের মধ্যে বেশি হয়, বয়স্করাও আক্রান্ত হতে পারে।

হাম কীভাবে ছড়ায়?
আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে, ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে; সুস্থ মানুষ এটি শ্বাসের মাধ্যমে নিলেই সংক্রমিত হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
ভাইরাস সংক্রমিত ব্যক্তির শ্বাস‑প্রশ্বাস বা থুতুর ফোঁটা দুই ঘন্টা পর্যন্ত বাতাস/পৃষ্ঠে জীবিত থাকতে পারে।
একই ঘরে থাকলে প্রায় ৯০% অকার্যকরী টিকা‑নেওয়া বা ইমিউনিটি নেই/কম এমন মানুষ সংক্রমিত হবে।
রোগটির সংক্রমণ ক্ষমতা খুব বেশি। আক্রান্ত ব্যক্তি একাই প্রায় ১০–১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে যদি ভ্যাকসিন না নেয়।

হামের উপসর্গ কী?
সাধারণত সংক্রমণের ৭–১৪ দিনের মধ্যে শুরু হয়। এর কিছু সাধারণ উপসর্গ হলো-
- জ্বর
- কাশি ও শ্বাসকষ্ট
- নাক দিয়ে পানি বের হওয়া
- চোখ লাল হওয়া
- চোখ দিয়ে পানি পড়া (conjunctivitis)
- মুখের ভেতরে ছোট ছোট সাদা দাগ (Koplik spots)
এগুলো র্যাশ হওয়ার আগেই দেখা যায়। র্যাশ — প্রথমে মুখ/ঘাড় থেকে শুরু হয়ে শরীরের ওপর থেকে নিচে ছড়িয়ে পড়ে।
র্যাশ হওয়ার ৪ দিন আগে থেকেই এবং র্যাশের ৪ দিন পরে পর্যন্ত সংক্রমিত করতে পারে।

ঝুঁকিতে কারা?
- টিকা না নেওয়া শিশু
- ০–৫ বছর বয়সী শিশু
- অপুষ্ট শিশু
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন দুর্বল ব্যক্তি
- গর্ভবতী নারী
হামের জটিলতা
- ফুসফুসের সংক্রমণ (Pneumonia)
- কানের সংক্রমণ
- মস্তিষ্কে প্রদাহ (Encephalitis)
- দীর্ঘমেয়াদে পুষ্টির অভাব/ইমিউন সিস্টেমে ক্ষতি
- খুব বিরল ক্ষেত্রে Subacute Sclerosing Panencephalitis (SSPE)– কয়েক বছর পরে মস্তিষ্কের জটিল রোগ ঘটায়।

করণীয় কী?
হাম হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগীকে বাসায় রেখে সঠিক যত্ন নিলে ভালো হয়ে যায়। তবে সতর্কতা খুব জরুরি, কারণ এটি অত্যন্ত সংক্রামক এবং জটিলতা হতে পারে।
রোগীকে আলাদা /Isolate রাখুন
জ্বর নিয়ন্ত্রণ করুন- ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল দিন
পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টিকর খাবার দিন (পানি, স্যালাইন, সহজপাচ্য খাবার- খিচুড়ি, স্যুপ, ফল হিসেবে কলা, ভাতের সাথে ১ পিস লেবু, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত হলে ডাবের পানি)
ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী Vitamin A ক্যাপসুল খাওয়াবেন
৫ বছর পর্যন্ত Measles উপসর্গ না থাকলেও যে সকল শিশু ৬ মাসের মধ্যে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খায় নি তাদের ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর ব্যবস্থা করুন।

বিপজ্জনক লক্ষণ দেখলে হাসপাতালে নিয়ে যান। যেমন-
- শ্বাসকষ্ট
- খিঁচুনি
- খুব বেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া
- খাওয়া বা পানি পান বন্ধ
- কান ব্যথা বা কানে পুঁজ
- জ্বর ৪–৫ দিনের বেশি থাকলে

হাম প্রতিরোধের উপায়
টিকা হলো প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
১. Measles, Mumps & Rubella (MMR) ভ্যাকসিন দেওয়া যায়।
২. বাংলাদেশে জাতীয় সম্প্রসারিত ভ্যাকসিনেশন কর্মসূচি অনুযায়ী- MR (Measles, Rubella) vaccine দেওয়া হয়
সাধারণত এই টিকার প্রথম ডোজ: ৯ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ডোজ: ১৫ মাস বয়সে দেওয়া হয়। দুই ডোজ ভ্যাকসিন আনুমানিক ৯৭% কার্যকর। কমপক্ষে ৯৫% মানুষ টিকা নিলে রোগের সম্প্রসারণ রোধ করা যায়। একে বলা হয় Herd Immunity।
WHO এবং বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, দুই ডোজই নেওয়া বাধ্যতামূলক।
সাধারণ সতর্কতা
১) রোগীর কাছ থেকে দূরে থাকুন
২) হাত ধোয়া, নাক ও মুখ ঢেকে রাখা- মাস্ক ব্যবহার করুন
৩) ভ্যাকসিন না নেওয়া শিশুদেরকে জনগণের সংস্পর্শ থেকে বিরত রাখুন
তথ্য কৃতজ্ঞতা: ডা. আসসাদে তারান্নুম, এমবিবিএস(ডিএমসি), বিসিএস (স্বাস্থ্য), এমসিপিএস (শিশুস্বাস্থ্য), এফসিপিএস (শিশুস্বাস্থ্য)
এনএম

