রোববার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

দিল্লির বিক্ষোভ দমনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধরপাকড়, আটক ৭ হাজারের বেশি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩১ এএম

শেয়ার করুন:

দিল্লির বিক্ষোভ দমনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধরপাকড়, আটক ৭ হাজারের বেশি
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ডাকা বিক্ষোভ দমনে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে অনেককে আটক করা হয়েছে / ছবি: রয়টার্স

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ডাকা বিক্ষোভ দমনে রাজধানী নয়াদিল্লিতে ব্যাপক ধরপাকড় চালিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত সাত হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে।

শনিবার (১০ অক্টোবর) পুলিশের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে যন্তর-মন্তরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন বিক্ষোভকারীরা। তাদের ঠেকাতে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা জোরদার, সড়কে ব্যারিকেড এবং গণপরিবহনে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।

আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে, দলের মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা। এ ছাড়া কয়েকজন সাংবাদিক, আইনজীবী, রাজনৈতিক নেতা ও অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতাকেও আটক করা হয়েছে। জার্মানিতে বসবাসকারী ভারতীয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠির আটক হওয়ার খবরও এসেছে। তবে শনিবার গভীর রাত পর্যন্ত সিজেপির তিন শীর্ষ নেতার অবস্থান ও মুক্তির বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

রোববারও যন্তর-মন্তরমুখী বিক্ষোভ মিছিল করার ঘোষণা দিয়েছে দলটি। শনিবারের সাড়াশিঁ অভিযানের পর রাজধানীতে নতুন করে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের ঠেকাতে শনিবার দিনভর দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়।

বিমান থেকে নামার আগেই আটক ৩ নেতা

শনিবার সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটের দিকে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে এবং দলের দুই মুখপাত্রকে বহনকারী একটি উড়োজাহাজ দিল্লিতে অবতরণ করে। এরপর নারী পুলিশ সদস্যদের নেতৃত্বে একটি দল উড়োজাহাজের ভেতরে প্রবেশ করে তাদের আটক করে।

বিমানের ভেতর থেকে ধারণ করা একটি ভিডিও বার্তায় দিপকে পুলিশের এ পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন, বিমান থেকে নামার পরও আমাদের আটক করা যেত। উড়োজাহাজের ভেতরে পুলিশ প্রবেশ করে আটক করা কর্তৃত্ববাদী ফ্যাসিস্ট শাসনের নিদর্শন।

ভিডিওতে দিপকেকে বলতে শোনা যায়, দেশ কোন দিকে যাচ্ছে? আমাদের গ্রেফতার করতে তারা বিমানের ভেতরেই চলে এসেছে। ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারির সময়ও ইন্দিরা গান্ধী এমনটি করেননি। এটি স্বৈরাচার।

এ সময় দিপকে ও তার সঙ্গীরা ইনকিলাব জিন্দাবাদ এবং ভারত মাতা’কি জয় স্লোগান দেন। পরে পুলিশ তাদের মুঠোফোন নিয়ে নেয় বলে অভিযোগ ওঠে।

পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়াই বিক্ষোভ সমাবেশ আয়োজনের কারণে তাদের আটক করা হয়েছে। অন্যদিকে দিপকের দাদির মৃত্যুর খবর সামনে এলে পুলিশ তাকে বিষয়টি সংবেদনশীলতার সঙ্গে জানিয়েছে। তার নিজ শহরে যাওয়ার ব্যবস্থায় মানবিক বিবেচনায় সহযোগিতার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল।

তবে শনিবার রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত তিন নেতাকে কোথায় রাখা হয়েছে, কখন তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে কিংবা আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে কিনা— এসব বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। সিজেপির নেতা অজিঙ্ক্য শিন্দে দিল্লি পুলিশের কমিশনারকে চিঠি দিয়ে তিন নেতার অবস্থান জানানো, তাদের অবিলম্বে মুক্তি এবং আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান।

ভারতীয় বিরোধী দলগুলোর নেতাদের মতে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াটি মোদির ক্ষমতাসীন বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দিতে লাখ লাখ মানুষকে ভোটাধিকার বঞ্চিত করতে পারে / ছবি: এপি
ভারতীয় বিরোধী দলগুলোর নেতাদের মতে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়াটি মোদির ক্ষমতাসীন বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দিতে লাখ লাখ মানুষকে ভোটাধিকার বঞ্চিত করতে পারে / ছবি: এপি

যন্তর-মন্তরমুখী সড়কে ব্যারিকেড, মেট্রো স্টেশন বন্ধ

বিক্ষোভ ঠেকাতে শনিবার দিল্লিজুড়ে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। যন্তর-মন্তরমুখী প্রধান সড়কগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন স্থানে কংক্রিটের ব্লক ও ব্যারিকেড বসানো হয়। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে মোতায়েন করা হয় দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত বিশেষ যানবাহন।

কেন্দ্রীয় দিল্লিতে প্রবেশের পথে যানবাহন থামিয়ে তল্লাশি চালানো হয়। বাসে উঠে যাত্রীদের পরিচয় ও চলাচলের উদ্দেশ্য যাচাই করেন পুলিশ সদস্যরা। বিক্ষোভে অংশ নিতে আসা অনেককে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই আটক করে বাস ও পুলিশ ভ্যানে তুলে বিভিন্ন অস্থায়ী আটককেন্দ্রে নেওয়া হয়। এসব কেন্দ্রের মধ্যে কয়েকটি বড় স্টেডিয়ামও ছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টলস্টয় রোড ধরে যন্তর-মন্তরের প্রায় ৭০০ গজের মধ্যে পৌঁছাতে পেরেছিলেন কয়েকজন বিক্ষোভকারী। তবে মূল বিক্ষোভস্থলে কাউকে প্রবেশ করতেই দেওয়া হয়নি।

শনিবার দিল্লি মেট্রোর ৪৫টি স্টেশন বন্ধ রাখা হয়। সন্ধ্যায় বন্ধের সময় আরও চার ঘণ্টা বাড়িয়ে রাত ১০টা পর্যন্ত করা হয়। পরে মেট্রো চলাচল স্বাভাবিক হয়। যন্তর-মন্তরের চারপাশের প্রায় চার কিলোমিটার এলাকায় ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ রাখা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগে শুক্রবার দিল্লিতে দূরপাল্লার বেশ কয়েকটি ট্রেন বাতিল এবং ৫৭টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তবে মেট্রো ও রেল চলাচল পুরোপুরি বন্ধ না রাখার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশনা দিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

সাংবাদিক, আইনজীবী ও রাজনৈতিক নেতারাও আটক

বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহের সময় বিভিন্ন স্থানে কয়েকজন সাংবাদিককে আটক করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে হিন্দি দৈনিক নবভারত টাইমস এবং ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম স্ক্রল ও নিউজলন্ড্রির সাংবাদিকেরা ছিলেন। পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের বাইরে বিক্ষোভ করার সময় একদল আইনজীবীকেও আটক করা হয়েছিল। পরে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়। সন্ধ্যার দিকে আটক অনেক রাজনীতিককেও ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশের বরাতে সংবাদ সংস্থা এএনআই জানায়, আটক ব্যক্তিদের অধিকাংশকে ছেড়ে দেওয়া হলেও সিজেপির তিন নেতাকে তখনো মুক্তি দেওয়া হয়নি। তাদের ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।

প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত সিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে কোনো এফআইআর দায়েরের তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে পুলিশের এক কর্মকর্তা দাবি করেন, পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগে কয়েকজন বিক্ষোভকারীর বিরুদ্ধে মামলা করা হতে পারে। আটক ব্যক্তিদের প্রতিরোধমূলক হেফাজতে রাখা হয়েছিল, যার মেয়াদ ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারে বলে জানান তিনি।

ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ক্ষোভ

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে এই বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক। বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ তুলেছে বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীরা।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে এবং এর ফলে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নির্বাচনি সুবিধা পেতে পারে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নাম বাদ পড়ার বিষয়টি, এর কারণ এবং নির্বাচনি প্রভাব নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

সিজেপির দাবি, তাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু হওয়ার আগেই নেতাদের আটক করে নেতৃত্বকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে দিল্লি পুলিশ। এক বিবৃতিতে দলটি নেতাদের আটকের ঘটনাকে কর্তৃত্ববাদী পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং অভিজিৎ দিপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছে।

দলের নেতা অজিঙ্ক্য শিন্দে জানান, শীর্ষ নেতাদের আটকের পরও আন্দোলন বন্ধ হবে না। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে রোববার যন্তর-মন্তরমুখী কর্মসূচি আবারও চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

আটক নিয়ে উদ্বেগ, বাড়তি নিরাপত্তা দিল্লিতে

শনিবারের ধরপাকড় নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বিভিন্ন মহল। বিক্ষোভকারীদের দাবি, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, অনুমতি ছাড়া কর্মসূচি আয়োজন এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে শনিবার দিল্লিতে দুই হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীকে আটকের কথা বলা হয়েছিল। অন্যদিকে দিনের শেষভাগে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে আটক ব্যক্তির সংখ্যা সাত হাজার ছাড়ানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ের হিসাব ও প্রতিবেদনের মধ্যে পার্থক্য থাকায় মোট আটকের সংখ্যা নিয়ে নিশ্চিত একক হিসাব পাওয়া যায়নি।

রোববার আন্দোলনকারীদের নতুন কর্মসূচি ঘিরে দিল্লির কেন্দ্রীয় এলাকায় নিরাপত্তা ও যান চলাচলে বিধিনিষেধ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সিজেপির তিন শীর্ষ নেতাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে কিনা এবং রোববারের কর্মসূচি কতটা বড় আকার নেয়, তা এখন পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ গতিপথ ঠিক করে দেবে।

সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, রয়টার্স, দ্য টেলিগ্রাফ

এফএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর