বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

আলজাজিরার বিশ্লেষণ

‘মক্কা চুক্তি’ কি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নিরাপত্তা বলয়ের বিকল্প?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৫৬ পিএম

শেয়ার করুন:

মক্কা চুক্তি কি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার বিকল্প?

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে মক্কায় সই হওয়া পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তিন দেশের এই সামরিক সমঝোতা কি তাদের দীর্ঘদিনের মার্কিন নিরাপত্তা বলয়ের বিকল্প হয়ে উঠতে পারবে, নাকি এটি শুধু আঞ্চলিক প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানোর একটি নতুন স্তর হয়ে থাকবে- এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।

প্রায় ১০ দিন আগে সৌদির পবিত্র নগরী মক্কায় তিন দেশ চুক্তিটি সই করে। এতে কোনো একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। ভাষাটি ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ নিয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তিন দেশের এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন।

গত রোববার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান অবশেষে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে দেখে তিনি ‘খুবই আনন্দিত’।

তার মতে, এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও অর্থবহভাবে গড়ে তোলার দিকে এগোচ্ছে।

এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান। তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় ‘পারমাণবিক বিপর্যয়’ এড়াতে ট্রাম্পের ‘সাহসী ও সিদ্ধান্তমূলক নেতৃত্বের’ প্রশংসা করেন।

আরও পড়ুন: 'মক্কা চুক্তিতে' মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করতে চায় না সৌদি আরব 

বিশ্লেষকদের মতে, মক্কা চুক্তির সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের নিজেদের প্রতিরক্ষায় আরও বেশি ব্যয় ও দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছেন।

২০২৫ সালের জুনে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে ন্যাটোর সম্মেলনে সদস্য দেশগুলো ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার বিষয়ে সম্মত হয়। এর আগে ন্যাটো দেশগুলোর জন্য এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ শতাংশ। মিত্রদের প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বিষয়ে ট্রাম্পের ধারাবাহিক চাপের পরই এই সিদ্ধান্ত আসে।

এ ছাড়া রোববার দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া ‘উল্লেখযোগ্যভাবে’ কমানোর ঘোষণা দেন ট্রাম্প। এর কারণ হিসেবে তিনি ব্যয়ের বিষয়টি এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে তার ‘খুব ভালো সম্পর্কের’ কথা উল্লেখ করেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা না করার জন্যও দক্ষিণ কোরিয়ার সমালোচনা করেন তিনি।

আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বেতুল দোগান-আক্কাসের মতে, এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেই মক্কা চুক্তিতে তুরস্কের ভূমিকা দেখা প্রয়োজন।

তার মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা ছাড়াই নিজেদের প্রতিরোধ সক্ষমতা পুনর্গঠনের প্রয়োজন অনুভব করছে। এরদোয়ান বিশ্বকে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোকে এই বার্তা দিচ্ছেন যে, বর্তমান বিশ্বশক্তি যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করলে তুরস্ক আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে সব বিশ্লেষক মনে করেন না যে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: পাকিস্তান-সৌদি-তুরস্কের চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের খোঁচা

রিয়াদভিত্তিক কিং ফয়সাল সেন্টার ফর ইসলামিক রিসার্চ অ্যান্ড স্টাডিজের সহযোগী ফেলো উমের করিমের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি থাকবে। তবে আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের অবদান বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের প্রায় সম্পূর্ণ নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে নিরাপত্তার ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডিফেন্স স্টাডিজ সেন্টারের সম্মানসূচক লেকচারার মনসুর আহমেদ অবশ্য মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততা কমানোর পথে এগোচ্ছে এবং একই সঙ্গে মিত্র ও অংশীদারদের নিজেদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব আরও বেশি নিতে বলছে।

তবে তার মতে, মক্কা চুক্তি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতির ফল নয়। চুক্তিটি স্বাধীনভাবেই পরিকল্পিত হয়েছে। তার পেছনে উপসাগরীয় দেশগুলোকে কার্যকরভাবে রক্ষা করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সদিচ্ছা ও সক্ষমতার বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যাওয়ার বিষয়টি বড় ভূমিকা রেখেছে।

মক্কা চুক্তিতে তুরস্কের অংশগ্রহণের পেছনে শুধু জাতীয় নিরাপত্তার হিসাব নেই বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

দোগান-আক্কাসের মতে, তুরস্কের জন্য এর বড় কৌশলগত অর্জন হলো নিরাপত্তা গ্রহণকারী দেশ হিসেবে নয়, নিরাপত্তা প্রদানকারী দেশ হিসেবে নিজের অবস্থান তুলে ধরা।

ইস্তাম্বুলের ইবনে হালদুন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক গোকহান এরেলিও মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুরস্কের দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট এই সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। তার মতে, মক্কা চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী কোনো অবস্থান নয়, তবে এটি দীর্ঘদিনের নিরাপত্তানির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার একটি প্রচেষ্টা।

মক্কা চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, কোনো একটি সদস্য দেশ সশস্ত্র হামলার শিকার হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

তবে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানিয়েছেন, কোনো দেশ আক্রান্ত হলে প্রথমে তাকে সহযোগিতা চাইতে হবে এবং কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন- গোয়েন্দা তথ্য, রসদ সহায়তা নাকি সেনা তা নির্দিষ্ট করতে হবে।

এ কারণে চুক্তিটি ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের মতো হলেও এর আওতায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামরিক হস্তক্ষেপের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আরও পড়ুন: তিন শক্তিশালী মুসলিম দেশের সামরিক জোট কেন গুরুত্বপূর্ণ?

মনসুর আহমেদের মতে, প্রতিটি দেশই নিজস্ব সার্বভৌম সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কখন, কী ধরনের এবং কতটা সামরিক সহায়তা দেবে তা নির্ধারণ করতে পারবে। এমনকি আদৌ সহায়তার প্রয়োজন আছে কি না, সেটিও সংশ্লিষ্ট দেশ বিবেচনা করতে পারে।

জর্জ মেসন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক রেজা খানজাদেহও মনে করেন, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে চুক্তির কোনো ধারা স্বাক্ষরকারী দেশগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একে অপরের যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলবে-এমন সম্ভাবনা কম। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে সই হওয়া দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির পরও ইরান ও হুথিদের সৌদি আরবে হামলার ঘটনা বৃহত্তর সংঘাতে রূপ নেয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, মক্কা চুক্তির সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো সামরিক সক্ষমতার ব্যবধান। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৫০ হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে। তিন দেশের নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামো এখনই সেই সামরিক সক্ষমতার সমতুল্য নয়।

উমের করিমের মতে, চুক্তিটি তিন দেশকে অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা বিকল্প ও সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ দেবে। তবে এটি তাদের বিদ্যমান সামরিক সক্ষমতার বিকল্প তৈরি করছে না।

তিনি বলেন, আক্রান্ত দেশের প্রয়োজন, অংশীদার দেশগুলোর সম্পদ, সামরিক সরঞ্জামের প্রাপ্যতা এবং হুমকির ধরন অনুযায়ী কে কতটা সহায়তা করতে পারবে, তা নির্ধারিত হবে।

তবে তিনি মক্কা চুক্তিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, বাগদাদ চুক্তি বা সেন্টোর সময়ের পর এ অঞ্চলে এ ধরনের নতুন উদ্যোগ দেখা যায়নি।

শীতল যুদ্ধের সময় তুরস্ক, ইরান, পাকিস্তান, ইরাক ও যুক্তরাজ্যকে নিয়ে বাগদাদ চুক্তি গঠিত হয়েছিল। ১৯৫৯ সালে এর নাম পরিবর্তন করে সেন্টো করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র এতে পূর্ণ সদস্য না হলেও চুক্তিটিকে সমর্থন করেছিল। ১৯৭৯ সালে ইরানি বিপ্লবের পর জোটটি ভেঙে যায়।

মক্কা চুক্তির বর্তমান কাঠামোর একটি সুবিধা হলো, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান নিজেদের মধ্যে ঐক্যের বার্তা দিতে পারছে, একই সঙ্গে সরাসরি ইরানকে উসকানিও দিচ্ছে না।

তবে আপাতত এই চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার বিকল্প হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। উমের করিমের মতে, এটি একটি কার্যকর বিকল্প প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে। তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কাঠামোগত নির্ভরতা বিবেচনায় নিলে, মক্কা চুক্তি সেই নির্ভরতার পুরোপুরি বিকল্প নয়। এটি আঞ্চলিক প্রতিরোধ ব্যবস্থায় আরেকটি স্তর যোগ করছে।

সূত্র: আল জাজিরা

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর