পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। তেহরানের দাবি, শক্তিশালী তিন মুসলিম দেশের এই চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি এই অঞ্চলের দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের একটি বড় প্রমাণ।
সোমবার (১০ আগস্ট) তেহরানে আয়োজিত সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই যুক্তরাষ্ট্রকে ইঙ্গিত করা বার্তা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘গত দুই-তিন বছরের ঘটনাবলি বিবেচনা করে আঞ্চলিক দেশগুলো এখন বুঝতে পেরেছে যে, নিরাপত্তা এমন কোনো পণ্য নয় যা কোনো ভুয়া দালালের (যুক্তরাষ্ট্র) কাছ থেকে কেনা যায়। গত সপ্তাহে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি এই অঞ্চলের দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তনের একটি লক্ষণ।’
বাঘাই বলেন, ‘অতীতের মতো এই অঞ্চলের দেশগুলো এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করতে পারছে না। তারা বাইরের শক্তির চেয়ে নিজেদের সক্ষমতা ও দৃষ্টিভঙ্গির ওপর বেশি ভরসা রাখছে।’
এই চুক্তি নিয়ে তেহরান একেবারেই উদ্বিগ্ন নয়— উল্লেখ করে বাঘাই আরও বলেন, ‘সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের গভীর ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও সভ্যতাগত সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এই চুক্তি ইরানের বিরুদ্ধে যাওয়ার কোনো কারণ নেই।’
যৌথ চুক্তিতে ইরানের সম্ভাব্য যোগদানের আগ্রহ সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে চুক্তিতে সরাসরি যোগদানের কথা না বললেও মুখপাত্র বলেন, ‘ইরান সবসময় যেকোনো আঞ্চলিক পরিকল্পনা যদি বাস্তবসম্মত হয় এবং ‘ইহুদিবাদী শত্রু’ (ইসরায়েল) ও তার মিত্রদের অস্থিতিশীলতা তৈরির প্রচেষ্টাকে সঠিকভাবে রুখতে পারে, তবে তা স্বাগত জানানোর যোগ্য।’
প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার (৭ আগস্ট) সৌদির আরবের পবিত্র নগরী মক্কার আল-সাফা প্রাসাদে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে এই চুক্তিটি স্বাক্ষর করেন।
চুক্তি অনুযায়ী, স্বাক্ষরকারী তিনটি দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে, তা সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে এবং যৌথভাবে তা প্রতিরোধ করা হবে, যা পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর ‘আর্টিকেল-৫’ এর মতো একটি যৌথ প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অধিকাংশই এটিকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ বলে অভিহিত করতে শুরু করেছেন, যা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং সমগ্র বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা রাখে।
তাদের মতে, চলমান ইরান যুদ্ধ এবং লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালির তীব্র সংকটের পটভূমিতে এই জোট শুধু একটি সামরিক চুক্তি নয়, রিয়াদের অফুরন্ত পেট্রো-ডলার ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব, আঙ্কারার ন্যাটোভুক্ত অত্যাধুনিক ড্রোন ও সামরিক প্রযুক্তি এবং ইসলামাবাদের পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা ও যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত বিশাল সামরিক জনবলের এই ত্রিমুখী রসায়ন বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন পরাশক্তির জন্ম দিয়েছে।
সূত্র: ডন, আনাদোলু
এমএইচআর




