- ২০ দেশে ডেঙ্গুর টিকা, বাংলাদেশে অপেক্ষা
- দেশেই টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগের তাগিদ
- নিরাপত্তা যাচাই ছাড়া টিকা নয়
- টিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে আলোচনা
দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। ডেঙ্গু আক্রান্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও রোগটি প্রতিরোধে এখনো টিকা ব্যবহারের অনুমোদন দেয়নি বাংলাদেশ। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডেঙ্গুর টিকা অনুমোদন পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ বৈজ্ঞানিক যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে দেশে ডেঙ্গুর টিকা ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হলে রোগটির ঝুঁকি কমানো এবং প্রাণহানি রোধে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্য জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ডেঙ্গুর টিকা নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।
এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাচাই-বাছাই করে বাংলাদেশে ভ্যাকসিন অনুমোদন দেওয়া হলে ডেঙ্গুতে মৃত্যু রোগীর সংখ্যা কমে আসবে। সেইসঙ্গে সাধারণ মানুষ সুরক্ষা পাবে। তাই বাংলাদেশে ডেঙ্গু ভ্যাকসিনের অনুমোদন দেওয়া প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ২০টিরও বেশি দেশে ডেঙ্গুর টিকা বা ভ্যাকসিনের অনুমোদন রয়েছে এবং এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমানে মূলত জাপানের তাকেডা ফার্মাসিউটিক্যালসের তৈরি কিউডেঙ্গা এবং ফরাসি কোম্পানি সানোফি পাস্টুরের তৈরি ডেংভ্যাক্সিয়া নামক দুটি প্রধান ভ্যাকসিন বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি সম্প্রতি ব্রাজিলেও বুটানটান-ডিভি (Butantan-DV) নামের একক ডোজের একটি টিকার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এশিয়ার ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন ও ভারত- এরমধ্যে ২০২৬ সালের জুলাই মাসে ভারতের ড্রাগস কন্ট্রোলার জেনারেল প্রথম ডেঙ্গু ভ্যাকসিন হিসেবে 'কিউডেঙ্গা' (Qdenga) অনুমোদন দিয়েছে। এছাড়া ইউরোপীয় মেডিসিন এজেন্সি কর্তৃক অনুমোদিত হওয়ার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত সকল সদস্য রাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যে ভ্রমণকারী ও সাধারণ মানুষের জন্য ডেঙ্গু ভ্যাকসিন (বিশেষ করে কিউডেঙ্গা) সহজলভ্য করা হয়েছে। এরমধ্যে ২০২৬ সালে অস্ট্রেলিয়াতে প্রথমবার ডেঙ্গু ভ্যাকসিন সাধারণ জনগণের জন্য সহজলভ্য করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিউডেঙ্গা ভ্যাকসিন পূর্বে ডেঙ্গু হয়নি এমন ব্যক্তিরাও নিতে পারেন (যাদের বয়স ৪ বা ৬ বছর থেকে ঊর্ধ্বের)। ডেংভ্যাক্সিয়া ভ্যাকসিন কেবল তাদেরই দেওয়া হয় যারা অতীতে অন্তত একবার ল্যাব-পরীক্ষিত ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।

তারা বলছেন, ডেঙ্গুর চারটি পৃথক ধরন রয়েছে। কোনো ব্যক্তি একবার কোনো এক ধরনে আক্রান্ত হয়ে থাকলে, আর দ্বিতীয়বার ভিন্ন ধরনে সংক্রমিত হলে তা মারাত্মক, এমনকি প্রাণঘাতী রূপ নিতে পারে। তাই ডেঙ্গুপ্রবণ অঞ্চলে দীর্ঘ মেয়াদে বসবাস বা একাধিকবার ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলে এই টিকা নেওয়া জরুরি।
তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ১০ কোটি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়। বাংলাদেশে বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন লাখ কিংবা লাখেরও বেশি, এই বছর এখন পর্যন্ত দেশে ৯৫ হাজার ৪৫১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন ২৯৫ জন।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, ভারত যেহেতু আমাদের ভৌগোলিক ও পরিবেশগত দিক থেকে কাছাকাছি এবং তারা ইতোমধ্যে ভ্যাকসিনের ট্রায়াল শুরু করেছে, সেখান থেকে আমরা হয়তো একটি দিকনির্দেশনা পাব। কিন্তু কেবল ভারতের তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে নীতি নির্ধারণ না করে বাংলাদেশেও অনুরূপ ট্রায়াল চালু করা উচিত। এতে আমাদের নিজস্ব উপাত্ত ও কার্যকরতার সঠিক চিত্র পাওয়া যাবে।
সরকারের করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ দিয়ে এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, সরকার দেশের কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে ডেঙ্গু ভ্যাকসিনের দেশীয় ট্রায়ালের উদ্যোগ নিতে পারে। এতে প্রয়োজন অনুযায়ী আর্থিক বরাদ্দ ও বিনিয়োগ করা উচিত। কারণ সামনের দিনগুলোতে ডেঙ্গু সারা দেশে আরও বিস্তৃত রূপ নিতে পারে, তাই এখন থেকেই নিজস্ব গবেষণায় জোর দিলে দীর্ঘমেয়াদে ডেঙ্গু প্রতিরোধে তা কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, বাংলাদেশে ডেঙ্গু ভ্যাকসিন চালুর আগে এটি দেশের মানুষের জন্য নিরাপদ ও কার্যকরী কি না এবং ব্যয়সশ্রয়ী কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) অনুমোদন এবং সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে।
তিনি জানান, প্রায় এক দশক আগে ফিলিপাইন ও যুক্তরাষ্ট্রে ডেঙ্গু ভ্যাকসিনের কারণে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় বাংলাদেশেও এর প্রয়োগ স্থগিত রাখা হয়েছিল। তাই সুরক্ষার দিকটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন; কারণ একটি ভ্যাকসিনের কারণে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হলে দেশের সার্বিক টিকাদান কর্মসূচিই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশে চালু হওয়া ভ্যাকসিনের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং আরও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা উচিত। এছাড়া সরকার বেসরকারিভাবে আমদানির অনুমতি দিলেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। দাম বেশি হলে ব্যক্তিগত পর্যায় বা বেসরকারি খাতে এটি আসতে পারে, তবে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী মূল্যে টিকাদান নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস ঢাকা মেইলকে বলেন, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর টিকাদান কার্যক্রম শুরু করার বিষয়টি বর্তমানে সরকারের সক্রিয় চিন্তাভাবনা ও পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। তবে ভ্যাকসিনের নিরাপত্তার দিকটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
মহাপরিচালক বলেন, আমরা ভ্যাকসিনের চিন্তাভাবনা করছি, কিন্তু বর্তমানে বাজারে থাকা ডেঙ্গু ভ্যাকসিনগুলো এখনো শতভাগ ডব্লিউএইচও কোয়ালিফাইড বা আন্তর্জাতিকভাবে সর্বজনগৃহীত নয়। যেকোনো ভ্যাকসিন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকা জরুরি। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ছাড়া টিকা নিয়ে আসলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার ঝুঁকি থেকে যায়।
দেশে ডেঙ্গু টিকা কবে নাগাদ আসবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বিষয়টি বর্তমানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ট্রায়াল ও পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। অন্যান্য ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে যেভাবে ডব্লিউএইচও অনুমোদন দিয়ে থাকে, ডেঙ্গু ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেও সেই মানদণ্ড বজায় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সরকার দেশে ডেঙ্গুর টিকা চালুর কথা ভাবছে। ভ্যাকসিনটির ব্যয় বেশি হওয়ায় সেটির কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। ডেঙ্গু ভ্যাকসিন নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফ ও গ্যাভির সঙ্গে আলোচনা চলছে। আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা অনুসরণ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এসএইচ/জেবি




