- সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর মৃত্যুর রেকর্ড
- ঢাকার পরই সেপ্টেম্বরে আক্রান্ত ও মৃত্যু বেশি খুলনায়
- আক্রান্তে পুরুষ, মৃত্যুতে নারী বেশি
দেশে দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন শিশু থেকে বৃদ্ধ- সব বয়সী মানুষ। রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু সংক্রমণ। সময় যত গড়াচ্ছে, ততই দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি। স্বজনদের কান্না আর নাগরিকদের উদ্বেগে ভারী হয়ে উঠছে সারাদেশ। শুধু সাধারণ মানুষই নন, ডেঙ্গুর কবল থেকে রেহাই পাচ্ছেন না রোগীদের চিকিৎসা ও সুস্থতায় নিয়োজিত চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীরাও।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে অল্প বয়সে প্রাণ হারিয়েছেন ডা. আঁচল রায়। তিনি কিছুদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অসুস্থ হওয়ার আগের দিনও ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দিয়েছিলেন ডা. আঁচল রায়। ৪২তম বিসিএসের কর্মকর্তা আঁচল রায় মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগে কর্মরত ছিলেন। সম্প্রতি তাকে রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগে সংযুক্ত করা হয়েছিল।
জানা গেছে, চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি মাঝে মাঝে ডেঙ্গু রোগীদেরও চিকিৎসা দিয়েছেন। এমনকি তার ডেঙ্গু ইউনিটে দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল। এর আগেই ডেঙ্গু তাকে কেড়ে নিল।
আঁচলের স্বামী ডা. বিপ্লব চন্দ্র দাস বলেন, চার দিন ধরে বাসায় চিকিৎসা নেওয়ার পর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। পঞ্চম দিনে রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা দ্রুত কমে গেলে তাকে স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। প্রথমে তাকে হাসপাতালের হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়।

জানা গেছে, চিকিৎসক আঁচল রায় সম্প্রতি ইন্টারনাল মেডিসিনে এফসিপিএসের মিড-টার্ম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এর আগে যুক্তরাজ্যের এমআরসিপি পরীক্ষার পার্ট-ওয়ানও পাস করেন তিনি। তার স্বামী বিপ্লব চন্দ্র দাস জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (নিপোর্ট) কর্মরত। আঁচল ও বিপ্লব দুজনই তৎকালীন আবদুল মালেক উকিল মেডিকেল কলেজে (বর্তমানে নোয়াখালী মেডিকেল কলেজ) পড়াশোনা করেছেন।
এদিকে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সকাল ৭টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) শিক্ষার্থী ফজলে রাব্বি। রাব্বি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। পরে ফজলে রাব্বির মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী, বন্ধু ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।
ফজলে রাব্বির বন্ধু মো. তামিম বলেন, ‘গতকালও রাব্বি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিল। এভাবে হঠাৎ করে আজ তাকে হারাতে হবে, আমরা কেউই ভাবতে পারিনি। তার মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। একজন প্রাণবন্ত সহপাঠীকে এভাবে হারানো আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টের।’
শুধু তারাই নয়, প্রতিদিন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ঝরছে অসংখ্য তাজা প্রাণ। চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪৫। এ সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮১ হাজার ৫৯৮ জন।
সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর মৃত্যুর রেকর্ড
এদিকে শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই মারা গেছেন ১৪৮ জন, যা চলতি বছরের কোনো এক মাসে সর্বোচ্চ। সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তও বেশি, এই মাসে সারাদেশে আক্রান্ত ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন। এরপরই রয়েছে আগস্ট মাসে মৃত্যু ও আক্রান্ত, আগস্টে মৃত্যু ৪৩ জনের এবং ডেঙ্গু আক্রান্ত ২০ হাজার ৫৩৬ জন। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে, এই সিটিতে মৃত্যু সংখ্যা ৭০ জন, এরপর রয়েছে খুলনা বিভাগ এবং ঢাকা উত্তর সিটি। খুলনায় মৃত্যু ৪৭ জন আর উত্তর সিটিতে মৃত্যু ৩০ জনের।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও অবনতির শঙ্কা
এদিকে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও অবনতির শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সেপ্টেম্বরের চেয়ে চলতি মাসে সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়বে। এডিশ মশা নিয়ন্ত্রণে এখনই নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। এদিকে চলতি মাসের প্রথম দিনেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯৭২ জন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে বরিশাল বিভাগে ২৬০ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৫৮ জন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৩২৮ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৮০ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৭৬ জন, খুলনা বিভাগে ২৫৬ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৯৪ জন, রাজশাহী বিভাগে ২০৯ জন, রংপুর বিভাগে ১০১ জন এবং সিলেট বিভাগে ১৬ জন রয়েছেন।
ঢাকার পরই সেপ্টেম্বরে আক্রান্ত ও মৃত্যু বেশি খুলনায়
সারাদেশের পাশাপাশি খুলনায় ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঢাকার পরই সেপ্টেম্বর মাসে খুলনা বিভাগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। খুলনার পরই রয়েছে চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগ। এরমধ্যে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে খুলনায় মৃত্যু হয়েছে ৪৭ জনের এবং আক্রান্ত ১৩ হাজার ৮১ জনের।
আক্রান্তে পুরুষ, মৃত্যুতে নারী বেশি
এদিকে চলতি বছরে ডেঙ্গু জ্বরে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন পুরুষরা। এরমধ্যে পুরুষ ৬২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং নারী ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ। আর মৃত্যুতে সবচেয়ে রয়েছে নারী। এরমধ্যে ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ পুরুষ আর ৫২ দশমিক ২ শতাংশ নারী রয়েছে।
জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলো এই কঠিন কাজটি ঠিকভাবে করতে পারছে না বলেই মশা ও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে এডিস মশার প্রজনন ও বিস্তার রোধ করার কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, ঢাকার বাইরেও জেলা পর্যায়ে (যেমন: রাজশাহী ও বরগুনা) ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। রাজশাহী হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় স্যালাইন ও ফ্লুইডের সংকটের খবরও পাওয়া যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি অনেকগুলো জেলায় একসঙ্গে দেখা দিলে বড় ধরনের মানবিক ও আর্থ-সামাজিক বিপর্যয় ঘটবে।

চিকিৎসা ব্যবস্থার বিষয়ে অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, রোগী হাসপাতালে আসতে দেরি করলে বা অন্য শারীরিক জটিলতা থাকলে আইসিইউ সাপোর্ট দিয়েও বাঁচানো সম্ভব হয় না। সাম্প্রতিক এক চিকিৎসকের মৃত্যুর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, আমরা নিজেরা আক্রান্ত হলেও সময়মতো চিকিৎসা না নিয়ে অবহেলা করি, যা প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়ায়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ মশা নিয়ন্ত্রণকে আলাদা করে দেখতে হবে। কিউলেক্স মশা সাধারণত ড্রেন, ডোবা, নর্দমা ও পচা পানিতে জন্মায়। অন্যদিকে এডিস মশা বাসাবাড়ি ও আশপাশে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে জন্মায়। এডিস নিয়ন্ত্রণ করতে হলে তার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে ধ্বংস করতে হবে এবং লার্ভা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু ফগিং করে এডিস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কারণ এডিস মশা যেসব জায়গায় জন্মায় বা বিশ্রাম নেয়, সেখানে অনেক সময় ফগিংয়ের ওষুধ কার্যকরভাবে পৌঁছায় না।
তিনি বলেন, ফগিং বা শুধু প্রাপ্তবয়স্ক মশা নিয়ন্ত্রণকে বিজ্ঞানভিত্তিক ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের মূল পদ্ধতি বলা যায় না। প্রজননস্থল ধ্বংস ও লার্ভা কন্ট্রোলকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তবে এই কাজে জনগণকে সম্পৃক্ত করা জরুরি। কোথায় লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে, কোন এলাকায় ঝুঁকি বেশি- এসব তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু নিয়মিত ওষুধ ছিটিয়ে গেলে হবে না; কোথায়, কখন এবং কী পরিমাণে প্রয়োগ করা হচ্ছে, তারও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।
ড. কবিরুল বাশারের মতে, ডেঙ্গু এখন সারাদেশের সমস্যা। এটি আর শুধু শহরের রোগ নয়; গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামাঞ্চলে অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ক্যান ও প্যাকেটজাত খাবারের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে এসব বর্জ্যও এডিস মশার প্রজননস্থল তৈরি করছে। তাই সারাদেশে সমন্বিত এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য একটি কেন্দ্রীয় গবেষণাপ্রতিষ্ঠান থাকা দরকার এবং সেখানে অভিজ্ঞ কীটতত্ত্ববিদদের দায়িত্ব দেওয়া উচিত। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দেশব্যাপী এ কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
এসএইচ/এসআই




