বর্ষা পেরিয়ে গেলেও কমছে না ডেঙ্গুর দাপট। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন করে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষ, বাড়ছে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও। কখনো মৃত্যুর সংখ্যা শূন্যে নামলেও পরদিনই নতুন মৃত্যু সেই স্বস্তি কেড়ে নিচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ডেঙ্গুর ভয়াল থাবা থেকে রেহাই পাচ্ছে না শিশু, তরুণ কিংবা বয়স্ক কেউই। রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে এডিস মশাবাহিত এই রোগ। অথচ ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সচেতনতা এখনো অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে না।
প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে শত শত নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হওয়ায় চিকিৎসাব্যবস্থার ওপরও বাড়ছে চাপ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুকে শুধু বর্ষাকালীন রোগ হিসেবে দেখলে চলবে না; বছরজুড়েই এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। বাড়ির ভেতর-বাইরে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিই হতে পারে এডিস মশার প্রজননের নিরাপদ স্থান। তাই ফুলের টব, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের পাত্র, নির্মাণসামগ্রী কিংবা যেকোনো স্থানে পানি জমতে না দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না; প্রত্যেককে নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। পাশাপাশি দিনে ও রাতে ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার, প্রয়োজন অনুযায়ী মশা প্রতিরোধক ক্রিম বা কয়েল ব্যবহার এবং এডিস মশার কামড় থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না। সামান্য জ্বর, শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা কিংবা দুর্বলতাকেও গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজনে দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষা করিয়ে চিকিৎসা শুরু করতে হবে। কারণ শুরুতেই রোগ শনাক্ত করে যথাযথ চিকিৎসা নেওয়া গেলে গুরুতর জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
তারা আরও বলছেন, জ্বর কমার পরেও শারীরিক দুর্বলতা বা জটিলতা হতে পারে। তীব্র পেট ব্যথা, বারবার বমি, গায়ে লালচে দাগ বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। সঠিক সময়ে হাসপাতালে ভর্তি ও সময়মতো চিকিৎসা করালে ডেঙ্গুতে মৃত্যুঝুঁকি কমানো সম্ভব।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি আগস্ট মাসে। আগস্টের ১ তারিখ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ১৬ হাজার ৮৩৮ জন। এই মাসে মৃত্যু হয়েছে ৩৪ জনের। জুলাই মাসে মৃত্যু সংখ্যা ছিল ৩৬ জন।
চলতি বছরে সবচেয়ে বেশি মারা গেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে, মৃত্যু সংখ্যা ৩১ জন। ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া নারীদের সংখ্যাই বেশি; এরমধ্যে ৪১ দশমিক ৪ শতাংশ পুরুষ এবং ৫৮ দশমিক ৬ শতাংশ নারী। আর আক্রান্তদের মধ্যে ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ নারী।
চলতি বছরের ২৭ আগস্ট পর্যন্ত দেশে মোট ৩২ হাজার ২৪৮ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট ৮৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
দেশে প্রতিনিয়ত ডেঙ্গু পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটছে এবং দৈনিক আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যার ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধি এক ভীতিকর জনস্বাস্থ্য সংকটের সৃষ্টি করেছে। জলবায়ুর পরিবর্তন, হঠাৎ অসময়ে বৃষ্টিপাত এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র ব্যাপক আকারে বিস্তৃত হচ্ছে। সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন পদক্ষেপ সত্ত্বেও এডিসের বংশবৃদ্ধি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ দিন দিন অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে এবং দ্রুত ও সমন্বিত কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এই প্রাণঘাতী সংকট থেকে সহসা নিস্তার পাওয়ার পথ বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে।
‘শুধু মশক নিধন কর্মসূচির ওপর নির্ভর করলে চলবে না’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজীর আহমেদ বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারি বা সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কর্মসূচির ওপর নির্ভর করলে এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি নাগরিকের স্বতঃস্ফূর্ত ও সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।
ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, ছাদবাগান, প্লাস্টিকের বোতল, নির্মাণাধীন ভবনসহ বাড়ির বিভিন্ন আনাচ-কানাচে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করছে। তাই প্রতিটি পরিবারকে নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব নিতে হবে। তিন দিনের বেশি জমে থাকা পানি অপসারণ করতে হবে এবং দিনে ও রাতে মশারি ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যত্রতত্র ওষুধ সেবন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ডেঙ্গুর প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলেই দ্রুত পরীক্ষা করানো এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে অধ্যাপক বেনজীর আহমেদ বলেন, আমাদের দেশের চিকিৎসাসেবা পুরোপুরি কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে। শুধু বড় বড় হাসপাতালের আইসিইউ সুবিধা নিয়ে চিন্তা করা হচ্ছে। কিন্তু তৃণমূল বা কমিউনিটি পর্যায়ে দ্রুত রোগী শনাক্ত করে তাকে প্রাথমিক সেবার আওতায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, অনেক রোগী গুরুতর অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছানোর পর হাসপাতালে আসছেন। ওই পর্যায়ে হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে কিছুটা মৃত্যুহার কমানো সম্ভব হলেও, আক্রান্ত ব্যক্তিদের গুরুতর অসুস্থতার দিকে যেতে না দেওয়ার দায়িত্বও কর্তৃপক্ষের রয়েছে।
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের ভাষ্য, প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি কেয়ারে তেমন কোনো পদক্ষেপ না থাকায় সংক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু বাড়াটাই স্বাভাবিক। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসার ওপর জোর না দিয়ে প্রাথমিক পর্যায়েই রোগী শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও নজরদারি জোরদার করতে হবে।
‘গতানুগতিক ফগিংয়ে ডেঙ্গু মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যকর নয়’
বৈজ্ঞানিক ও সুপরিকল্পিত মশক নিধন ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, গতানুগতিক ফগিং কিংবা যত্রতত্র ধোঁয়া ছিটিয়ে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা বৈজ্ঞানিকভাবে কার্যকর নয়। এডিস মশার প্রজনন আচরণ ও কীটনাশকের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা বুঝতে নিয়মিত এলাকাভিত্তিক কীটতাত্ত্বিক জরিপ পরিচালনা করা প্রয়োজন।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, মশার লার্ভা ধ্বংসে কার্যকর ও মানসম্মত কীটনাশক ব্যবহারের পাশাপাশি শহরের ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। বৈজ্ঞানিক গবেষণানির্ভর সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা ছাড়া ডেঙ্গুর ধারাবাহিক বিস্তার ঠেকানো বাস্তবসম্মত নয়।
ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব মহামারি পর্যায়ে পৌঁছানো ঠেকাতে প্রশাসনিক তৎপরতা ও ব্যক্তিগত সচেতনতার মধ্যে সমন্বয় তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন অধ্যাপক মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, সরকার ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে আধুনিক ও কার্যকর মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে জনগণের প্রতিটি স্তরেও দায়িত্বশীল আচরণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।
আরও পড়ুন
সুফল মিলছে না দেড় হাজার কোটি টাকার বিশ্বমানের হাসপাতালটির
ডায়াবেটিসে ভুগছে তরুণরাও, অজান্তেই শরীরে বাসা বাঁধছে রোগটি
তিনি আরও বলেন, সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা এবং সময়মতো সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব ও অকাল মৃত্যুর মিছিল অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এজন্য সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিকদেরও নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
এদিকে ডেঙ্গু এখন কেবল চিকিৎসা খাতের সংকট নয়, এটি ক্রমেই জাতীয় জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা বা ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট (আইভিএম) পদ্ধতি অনুসরণের ওপর জোর দিচ্ছেন। এর আওতায় ওয়ার্ডভিত্তিক এডিসের লার্ভা শনাক্তকরণ, তথ্য সংরক্ষণে ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে স্থানীয় ফ্ল্যাট মালিক সমিতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। কার্যকরভাবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা না গেলে আগামী মাসগুলোতে ডেঙ্গুর সম্ভাব্য নতুন ঢেউ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
শুধু প্রেস ব্রিফিং, সতর্কবার্তা কিংবা সাময়িক অভিযান দিয়ে ডেঙ্গুর বিস্তার থামানো সম্ভব নয়। এজন্য প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগের পাশাপাশি কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের সচেতনতা শুধু কথায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব আচরণে প্রতিফলিত করতে হবে। নইলে প্রতি বছরই ডেঙ্গুর মৌসুম ফিরে আসবে, আর আমরা প্রত্যক্ষ করব আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার সেই পুরোনো চিত্র।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে এবং রোগটি নিয়ন্ত্রণে মশা নিধনই একমাত্র সমাধান। যেহেতু ডেঙ্গুর জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে গণহারে দেওয়ার মতো কোনো কার্যকর টিকা এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি, সেহেতু প্রতিরোধই একমাত্র পথ। তবে এই সংকট দূর করা একা সরকার বা সিটি করপোরেশনের পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রশাসন ও দেশের সাধারণ জনগণকে যৌথভাবে মাঠে নামতে হবে। উভয়ের সম্মিলিত ও সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে মুক্তি পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এসএইচ/জেবি




