- হামে আক্রান্ত শিশুতে ঠাসা হাসপাতাল
- কয়েক দিনের খরচ লাখ লাখ টাকা
- বেশির ভাগ ওষুধ কিনতে হচ্ছে
- অপুষ্টিতে ভোগা শিশুরাই বেশি ঝুঁকিতে
- পর্যাপ্ত বাজেট ও স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানোর দাবি
হামে আক্রান্ত আট মাসের শিশু রায়হান ইসলাম। তাকে নিয়ে বরিশাল থেকে রাজধানীর শিশু হাসপাতালে এসেছেন বাবা রাইসুল ইসলাম ও মা ফাতেমা বেগম। চার দিন ধরে এই হাসপাতালেই সময় কাটছে তাদের। দীর্ঘ ৯ বছর অপেক্ষার পর মাতৃত্ব ও পিতৃত্বের স্বাদ পেয়েছেন তারা। তাই তাদের পরিবারে রায়হানকে ঘিরে সুখের কোনো কমতি ছিল না। এই দম্পতির সব স্বপ্ন আবর্তিত হচ্ছিল এই শিশুটিকে ঘিরেই। কিন্তু সেই সুখের সংসারে হাম যেন হঠাৎ অমাবশ্যার আঁধার নিয়ে এসেছে। ৯ দিন ধরে হামে আক্রান্ত শিশুটি। বিভিন্ন হাসপাতালে ছোটাছুটির পর এসেছেন শিশু হাসপাতালে। এই কয়েক দিনে দুই লাখ টাকার মতো খরচ হয়ে গেছে।
বিজ্ঞাপন
ফাতেমা বেগম ঢাকা মেইলকে বলেন, এত জোরে শ্বাসকষ্ট সহ্য করার মতো নয়। আমার অনেক কষ্ট লাগে। মনে হচ্ছে ওর জীবনটা শেষ হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর এই সন্তানটা পেয়েছি। সবার আদর আর ভালোবাসায় থাকে। আল্লাহ যেন আমার সন্তানটাকে সুস্থ করে তোলে। এতটুকু আশা নিয়ে এই হাসপাতালে এসেছি। সবার কাছে দোয়া চাই।
রাইসুল ইসলাম বলেন, হাম হওয়ার আগে আমার বাচ্চাটা কী সুন্দর করে হাসি-খুশি ছিল, ক্ষুধা লাগলে কিংবা কোলে ওঠার জন্য কাঁদতো। একটু ভালো অনুভব করলে হাত-পা নাড়িয়ে খেলার ভঙ্গিমা দেখাতো। এখন সেসব কিছুই নেই। না হাসে, না কাঁদে, না খেতে পারে। ঠিক মতো শ্বাসও নিতে পারে না, এমনকি তাকাতেও তার কষ্ট হয়। অপেক্ষায় আছি কবে আমাদের সন্তান সুস্থ হবে এবং বাড়িতে নিয়ে যাবো।
দেড় বছর বয়সী নাফিসা আক্তারকে নিয়ে রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে এসেছেন বাবা নাজমুল হাসান ও মা জায়েদা খাতুন। নাফিসা আট দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। এর আগে দুই দিন আইসিইউতে ছিল হাম জটিলতায়। জানতে চাইলে নাজমুল হাসান বলেন, চিকিৎসকরা সময় মতো সবকিছু বলেনও না। মেয়েটার অগ্রগতি কতটুকু বা কোন পর্যায়ে আছে, সঠিক বুঝতে পারছি না। আমার এত সামর্থ্যও নেই, কোথাও নিয়ে যাবো?
এই ভুক্তভোগী বলেন, অনেক টাকা-পয়সা খরচ হচ্ছে। ওষুধেরও অনেক দাম। যেদিকে তাকাই, টাকাই খরচ হচ্ছে। কোনো কিছু কম দামে পাওয়া যায় না। চিকিৎসা খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশু জামিল। বেডের পাশের তার মায়ের সঙ্গে কথা হয় ঢাকা মেইল প্রতিবেদকের। মা কামরুন নাহার বলেন, সারা রাত ওর কোনো ঘুম নাই। বেডের পাশে জেগে থাকতে হয়। কিছু খায় না। প্রতিটি সময় যাচ্ছে কষ্টে। আল্লাহ কাছে বলি- আমার সন্তানকে সুস্থ করে দেন। কিন্তু সুস্থ হচ্ছে না।
শিশুর অভিভাবকদের অভিযোগ, বেশির ভাগ ওষুধ কিনতে হয় বাইরের ফার্মেসি থেকে। হাসপাতালের আশেপাশে সবকিছুর দাম বেশি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে খাবার থেকে শুরু করে সবকিছু দাম দ্বিগুণ। ডাক্তাররা যেসব মেডিসিন দেয়, সেগুলো পাওয়া যায় না হাসপাতালে। আবার সঙ্গে সঙ্গে ফার্মেসিতেও অনেক সময় পাওয়া যায় না। ওষুধ পেতে দোকানে দোকানো ঘোরা লাগে। একটা পাওয়া গেলে আরেকটা পাওয়া যায় না। সরকারের পক্ষ থেকে কী কী নির্ধারিত ওষুধ রাখা হয়েছে তাও জানেন না রোগীর অভিভাবকরা।
তারা বলছেন, রোগীর ক্যানুলা, অক্সিজেনের পানি থেকে শুরু করে সবকিছু বাহির থেকে কিনতে হয়। শুধু কয়েক পদের ওষুধ এবং কিছু ইনজেকশন পাওয়া যায় হাসপাতাল থেকে। এতে রোগীর স্বজনদের চিকিৎসার খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
এদিকে রাজধানীর প্রতিটি হাসপাতালেই হামের রোগীতে ঠাসা। দুশ্চিন্তায় সময় কাটছে অভিভাবকদের। কখন শেষ হবে এই অপেক্ষার প্রহর কেউ জানেন না। তবে যেকোনো মূল্যে প্রিয় সন্তানকে সুস্থ করে বাড়িতে ফিরতে চান তারা।
হামের চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, হাসপাতালগুলো সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। যাতে রোগীদের সব ধরনের সুবিধা দেওয়া যায় এবং কোনো সংকট না থাকে। স্বাস্থ্যখাতকে ঢেলে সাজাতে হবে। এখনই সময় স্বাস্থ্যখাত সুন্দর করে সাজানোর। মহামারি এলেই স্বাস্থ্যখাতের সংকট সামনে আসে। এছাড়া তেমন একটা সামনে আসে না এবং আলোচনাও হয় না।
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, প্রান্তিক পর্যায়ের অনেক মানুষ আছেন যারা চিকিৎসা করতে ভয় পান। কেননা তাদের কাছে চিকিৎসা করানোর মতো টাকা নেই। এখন মধ্যবিত্তদেরও চিকিৎসা করতে বেগ পোহাতে হচ্ছে। হাসপাতালের বেড সংখ্যা বাড়ানো এবং রোগীর পর্যন্ত সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে সরকারের পক্ষ থেকে। যাতে কোনো ধরনের সমস্যায় না পড়ে মানুষ। আর চিকিৎসার অভাবে যেন একটি মানুষও মারা না যায়।
জানতে চাইলে শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন ঢাকা মেইলকে বলেন, বর্তমানে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। হামে আক্রান্ত বেশির ভাগ শিশুই অপুষ্টিতে ভুগছে। হাম খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করা গেলে ৯৯ শতাংশ রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে এবং হাম হলেই উদ্বেগের কিছু নেই। তবে হাম শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এজন্য হামের যথাযথ চিকিৎসা নিতে হবে। হাম ভালো হয়ে যাবে এবং সতর্ক থাকতে হবে। বাচ্চাদের নিয়ে সিরিয়াস হতে হবে।
এই চিকিৎসক বলেন, হামপরবর্তী জটিলতা নিয়ে অভিভাবকদের সকর্ত থাকতে হবে। অনেক শিশুর মধ্যে হামপরবর্তী জটিলতা দেখা দেয় এবং আশঙ্কাও বেশি থাকে। আমাদের শিশুরা জাতির কর্ণধার হবে। তাদের সুস্থ ও সুন্দর বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে হবে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউটের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, যতটুকু সম্ভব রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ এবং সেবা দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালে যে বাজেট দেওয়া হচ্ছে, তার মধ্যে সবকিছু করতে হয়। রোগীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হলে পর্যাপ্ত বাজেট দিতে হবে। হাসপাতাল চালাতে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। একদিকে রোগীদের চাপ, অন্যদিকে ভালো সেবা দেওয়া, সবকিছু আমলে নিতে হয়।
অনেক ওষুধ বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, একটি ওষুধের দাম আছে ১৬ হাজার টাকা, এটা বাহির থেকে কিনতে হচ্ছে। আর যারা একদমই গরিব তাদের অনেক সময় আমাদের নিজেদের পকেট থেকে কিনে দিই এবং সবসময় আমরা পারি না। সমাজের বিত্তবানদেরও এগিয়ে আসতে হবে। সবাই সহযোগিতা করলে গরিব রোগীদের চিকিৎসা সহজ হবে। কিছু কিছু সংগঠন এগিয়ে আসছে। আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রীও সহযোগিতা করছেন, তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগ নানা যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করছেন।
এসএইচ/জেবি




