মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

স্বাস্থ্যখাত ঢেলে সাজানোর বড় পরিকল্পনা, তৃণমূলে জোর 

সাখাওয়াত হোসাইন
প্রকাশিত: ২৬ জুন ২০২৬, ১০:১৬ পিএম

শেয়ার করুন:

স্বাস্থ্যখাত ঢেলে সাজানোর বড় পরিকল্পনা, তৃণমূলে জোর 
দেশের স্বাস্থ্যখাতকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ছবি: এআই
  • শিগগিরই ৫ হাজার চিকিৎসক ও ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ
  • প্রতিটি ঘরে পৌঁছে যাবে স্বাস্থ্যসেবা
  • ইউনিয়নেই পাওয়া যাবে স্বাভাবিক প্রসবসেবা

দেশের স্বাস্থ্যখাতকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়কে। চিকিৎসাসেবার সুযোগ-সুবিধা সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে এবং ভোগান্তি কমাতে ঢাকা ও বড় শহরকেন্দ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থা থেকে সরে আসার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ফলে চিকিৎসার জন্য গ্রামের মানুষকে আর ঢাকা বা বড় শহরে যেতে হবে না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়েই থাকবে আধুনিক চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা। এতে একদিকে মানুষের ভোগান্তি কমবে, অন্যদিকে শক্তিশালী হবে তৃণমূলের স্বাস্থ্যব্যবস্থা।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, তৃণমূলের স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করতে উপজেলা পর্যায়ের ৩১ ও ৫০ শয্যার হাসপাতালগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে। প্রতিটি ইউনিয়ন ও শহরের ওয়ার্ডে থাকবে স্বাস্থ্য ইউনিট। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা মিলবে। উপজেলা পর্যায়ের ১০১ শয্যার হাসপাতালগুলোতে জরুরি বিভাগ, ইনডোর ও আউটডোর সেবা এবং আধুনিক প্যাথলজি সুবিধা সার্বক্ষণিক চালু থাকবে। উপজেলা হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ সুবিধাও রাখা হবে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা জোরদারে প্রতিটি হাসপাতালে একজন নারী ও একজন পুরুষ ফিজিওথেরাপিস্টের পদ থাকবে।

এ ছাড়া জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলো আধুনিক করা হবে। সেখানে ক্যানসার, কিডনি রোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগের আধুনিক চিকিৎসাসুবিধা থাকবে। জেলা ও তৃণমূল পর্যায়ে পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা হবে। কয়েক বছরের মধ্যে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করছে সরকার। স্বাস্থ্যখাতের বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে প্রতিটি জেলায় উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হবে। এতে মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমবে, স্বাস্থ্যসেবাও পৌঁছে যাবে দোরগোড়ায়।

শিগগিরই ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ

ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে শিগগিরই ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেবে সরকার। মানুষের ভোগান্তি কমানো এবং স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে নিয়োগপ্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে এমবিবিএস ডিগ্রিধারী ৪ হাজার ৭০০ এবং বিডিএস ডিগ্রিধারী ৩০০ চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, শুধু ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দিয়েই থেমে থাকা হবে না। ভবিষ্যতে আরও চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে। চিকিৎসকদের পাশাপাশি ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মীও নিয়োগ দেওয়া হবে।

২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ

তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রতিটি ইউনিয়ন ও শহরের ওয়ার্ডে হেলথ কেয়ার ইউনিট থাকবে। সেখানে স্বাভাবিক প্রসবসহ বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসাসেবা পাওয়া যাবে। চিকিৎসক ও নার্সের পাশাপাশি দুজন করে মিডওয়াইফ থাকবেন।

pic-2

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা) ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে দুজন করে মিডওয়াইফ থাকবেন। উপজেলা ও জেলা পর্যায়েও পর্যাপ্তসংখ্যক মিডওয়াইফ নিয়োগ দেওয়া হবে। এক বছরের মধ্যে মোট লক্ষ্যমাত্রার এক-তৃতীয়াংশ নিয়োগ সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে।

প্রতিটি ঘরে পৌঁছে যাবে স্বাস্থ্যসেবা

দেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, গ্রামের প্রতিটি বাড়ি এবং শহরের প্রতিটি বাসায় প্রতি দুই মাসে একবার করে স্বাস্থ্যকর্মী যাবেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্যকর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা দেবেন। তাঁদের দায়িত্বের মধ্যে থাকবে রক্তচাপ পরিমাপ, বিভিন্ন রোগের স্ক্রিনিং এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা।

ইউনিয়নেই পাওয়া যাবে স্বাভাবিক প্রসবসেবা

মাতৃমৃত্যু কমাতে সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিচ্ছে। গর্ভবতী নারীরা ইউনিয়ন পর্যায়েই স্বাভাবিক প্রসবের প্রয়োজনীয় সেবা পাবেন। জটিল প্রসবের ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ সেবা নিশ্চিত করা হবে, যাতে কোনো মাকে উপজেলা ছাড়িয়ে অন্যত্র যেতে না হয়। শিশুদের জটিল রোগের চিকিৎসাও উপজেলা পর্যায়ে নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নবজাতক ও শিশুসেবাও আরও শক্তিশালী করা হবে।

পাঁচ বিভাগীয় শহরে বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল

আগামী ছয় মাসের মধ্যে খুলনা, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও কুমিল্লা বিভাগে ২০০ শয্যার পাঁচটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল চালু করতে যাচ্ছে সরকার। এর মধ্যে বরিশাল ও খুলনার হাসপাতাল দুটি আগামী আগস্টের শুরুতেই চালুর প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।

জানা গেছে, প্রতিটি হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা, কেন্দ্রীয় শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে সম্প্রসারণের সুযোগ রাখা হবে। হাসপাতালগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় আসবাব ও চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার দরপত্র প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

পুরোদমে কার্যক্রম চালাতে প্রতিটি হাসপাতালে ১ হাজার ৪৭৫ জন জনবল প্রয়োজন হবে। এ জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ইতিমধ্যে খুলনা, বরিশাল ও কুমিল্লার হাসপাতাল ভবন পরিদর্শন করেছেন। বরিশাল শিশু হাসপাতাল পরিদর্শনকালে তিনি আগামী ১ আগস্ট হাসপাতালটি উদ্বোধনের ঘোষণা দেন।

তিনি জানান, নবজাতক ভেন্টিলেটর, সিটি স্ক্যান, এক্স-রে মেশিন, পোর্টেবল এক্স-রে, মাল্টিপ্যারামিটার বা কার্ডিয়াক মনিটর, ফটোথেরাপি মেশিনসহ প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি জুলাইয়ের মধ্যে সরবরাহ করা হবে।

pic-3

মন্ত্রী বলেন, পাঁচটি হাসপাতালের জন্য প্রয়োজনীয় আসবাব ও যন্ত্রপাতির টেন্ডার ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিটি হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা থাকবে। কেন্দ্রীয় শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পাশাপাশি ভবিষ্যতে শয্যা বাড়ানোর সুযোগও রাখা হবে।

তিনি বলেন, দুর্নীতির আবর্ত থেকে বেরিয়ে স্বাস্থ্যখাতকে ঢেলে সাজানো হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞদের মত

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক এবং আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের স্বাস্থ্য অবকাঠামো শক্তিশালী করতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। উপজেলা স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সেকেন্ডারি হেলথ কেয়ারে উন্নীত করতে হবে।

তিনি বলেন, উপজেলায় বসবাসকারী মানুষের অন্তত ৮০ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা স্থানীয় পর্যায়েই নিশ্চিত করতে হবে। জেলা হাসপাতালগুলোতে কিডনি, ক্যানসার ও হৃদরোগসহ জটিল রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসা থাকতে হবে। এতে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে।

অধ্যাপক বেনজির আহমেদ আরও বলেন, সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে। সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবস্থা থাকতে হবে। বর্তমানে যে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি বরাদ্দ প্রয়োজন। তবে এতে মানুষের ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয় কমে আসবে।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যখাতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি দুর্নীতি বন্ধ করাও জরুরি। স্বাস্থ্যকর্মীদের আচরণ ও সেবার মান উন্নত না হলে মানুষ সরকারি হাসপাতালের প্রতি আস্থা ফিরে পাবে না।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর ৬০ থেকে ৬৫ লাখ মানুষ চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা-কেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জনবল, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য উপকরণ নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। চিকিৎসার জন্য কাউকে যেন ঢাকায় আসতে না হয়। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ স্বাস্থ্যসেবা ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশ নিজস্ব অর্থ থেকে বহন করতে হয়। এটি ৪০ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। সে জন্য সরকারি হাসপাতালে মানসম্মত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি।

অধ্যাপক লেলিন চৌধুরী বলেন, স্বাস্থ্যখাতকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে হলে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।

এসএইচ/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর