চার বছর বয়সে ছবি আঁকা দিয়ে শুরু, এরপর অস্ট্রেলিয়ান ফাদারের কাছে ফটোগ্রাফির হাতেখড়ি। আলোকচিত্রের সেই অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে নির্মাতা হিসেবে বড় পর্দায় নাম লেখান হাসিবুর রেজা কল্লোল। এ পর্যন্ত তিনটি সিনেমা নির্মাণ করেছেন তিনি। যার মধ্যে একটি আলোর মুখ না দেখলেও বাকি দুটি বেশ প্রশংসিত হয়েছে। পেয়েছে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। তবুও পেলেও আক্ষেপ রয়ে গেছে এই নির্মাতার। রাজনৈতিক কারণে তাঁকে সেরা পরিচালকের পুরস্কার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। সম্প্রতি ঢাকা মেইলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শুনিয়েছেন নির্মাতা হয়ে ওঠার নেপথ্যের গল্প।
সাংবাদিকতা থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হলেন?
আমার শুরুটা হয়েছিল খুব ছোটবেলায় ছবি আঁকার মাধ্যমে। চার বছর বয়স থেকে ছবি আঁকা শিখতাম। এরপর ১৯৮৭ সালে ঢাকায় এসে ফাদার ডেভিড নামের একজন অস্ট্রেলিয়ান ফাদারের কাছে ফটোগ্রাফি শিখি। ফটোগ্রাফির পাশাপাশি ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হই। ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে সিনেমা দেখার খুব প্রচলন ছিল। ভিসিআর এবং ভিসিপি এনে সিনেমা দেখানো হতো। সেই সিনেমাগুলো আমি নির্মাতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতাম। এরপর যখন একুশে টেলিভিশন শুরু হলো, তখন সেখানে কাজের সুযোগ পেলাম। যেহেতু আগে থেকে ফটোগ্রাফি ও ফিচার লিখতাম, তাই ভিজ্যুয়াল মিডিয়া আমার পরিচিত জায়গা ছিল। সেখানে কাজ করতে করতে বড় পরিসরের পরিকল্পনা শুরু করি। বাউল শিরোমণি লালন শাহর দর্শনের জায়গাটা নিয়ে এর আগে কোনো সিনেমা হয়নি। আমি সব সময় অভ্যস্ত চোখের বাইরে ভিন্নভাবে কিছু দেখাতে চেয়েছি। এই ছবির জন্য ৪০ জন বাউলকে এক জায়গায় করা হয়েছিল, যা দেখে রোকেয়া প্রাচী ও জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ের মতো শিল্পীরা সারপ্রাইজ হয়েছিলেন। কাজের ক্ষেত্রেও দারুণ সহযোগিতা করেছিলেন। এভাবেই আমার প্রথম সিনেমা ‘অন্ধ নিরাঙ্গম’ নির্মাণ করি। ছবিটি ব্যবসায়িক সাফল্য না পেলেও আমাকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি থেকে নিবন্ধন নেওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
বিজ্ঞাপন
আমি ২০০৮ সালে পরিচালক সমিতির সদস্যপদ পাওয়ার জন্য আবেদন করি। সেই অভিজ্ঞতা যে খুব একটা ভালো ছিল তা বলব না। তবে আমি সবার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাঁরা আমাকে প্রথম সাক্ষাৎকারেই সহযোগী সদস্যপদ দিয়েছিলেন। এরপর যখন পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র নির্মাণ করলাম, তখন নিয়ম অনুযায়ী পূর্ণ সদস্যপদ দেওয়া হয়।
‘সত্তা’ সিনেমা নির্মাণের পেছনের গল্পটি যদি বলতেন—
আমি তো প্রথাগত বাণিজ্যিক নির্মাতা নই, তাই আমার কাছে সব সময় প্রযোজকরা আসবেন এমনটা আশা করা কঠিন। ছবিটির প্রযোজক খুঁজতে অনেক জায়গায় ঘুরেছি। শেষে ইউনিভার্সাল গ্রুপের সোহানী হোসেন 'সত্তা' ছবিটি প্রযোজনা করতে রাজি হলেন। আমি যেহেতু নিজে লেখালেখি করি এবং ব্যক্তিগতভাবে গান খুব পছন্দ করি তাই ‘সত্তা’ ছবিতে সংগীতকে আমি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিলাম। এর ফল হাতে হাতে পেয়েছিলাম। ছবিটির জন্য পাওয়া পাঁচটি জাতীয় পুরস্কারের মধ্যে চারটিই ছিল সংগীত বিভাগে। ২০১৭ সালে এই ছবির জন্য আমি বাচসাস পুরস্কারে সেরা পরিচালক হয়েছিলাম। কিন্তু দুঃখজনক হলো, রাজনৈতিক কারণে জাতীয় পুরস্কারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। যাকে দেওয়া হয়েছিল তিনি রাজনৈতিক কোটায় পেয়েছিলেন, যা আমাকে স্তম্ভিত করেছিল। এটা নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই, কিন্তু ধিক্কার জানাই। তবে আমি থেমে থাকিনি।
শাকিব খানের সঙ্গে ‘সত্তা’ নির্মাণের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
‘সত্তা’ সিনেমাটি তৈরি হয়েছিল ইন্ডাস্ট্রির সব এক নম্বর তারকাদের নিয়ে। শাকিব খান তখন মেগাস্টার। ওনার মতো মানুষকে হ্যান্ডেল করা বেশ চাপের ছিল। সাধারণত বড় মাপের তারকাদের আশেপাশে এমন কিছু মানুষ থাকেন যাঁরা সব সময় সঠিক পরামর্শ দেন না, বরং কানে বিষ ঢালতে থাকেন। ‘সত্তা’র ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই হয়েছিল। সেই কুপরামর্শের কারণেই হয়তো শাকিব খান আড়াই বছরে আমাকে মাত্র ১২ দিন সময় দিয়েছিলেন। তবে ছবিটির কাজ শেষে যখন বড় পর্দায় মুক্তি পেল এবং জাতীয় পুরস্কার পেল তখন শাকিব নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছিলেন। আমার ‘কবি’ সিনেমাতেও শাকিবের অভিনয়ের কথা ছিল। কিন্তু কোভিড এসে সব পরিকল্পনা এলোমেলো করে দিল। এরপর যখন নতুন প্রযোজক পেলাম, তখন বাজেট বিবেচনা করে শাকিব খানের পরিবর্তে শরিফুল রাজকে যুক্ত করা হয়।

দীর্ঘদিন আগে শরিফুল রাজ এবং ইধিকা পালকে নিয়ে ‘কবি’ সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন। গল্পের প্রেক্ষাপট নিয়ে কিছু বলুন।
‘কবি’ মূলত কলকাতা এবং বাংলাদেশের গল্প। একই ভাষা ও সংস্কৃতির টানে মানুষ কলকাতা যায়, কিন্তু সেখানেও কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়। আমি একবার রিপোর্ট করেছিলাম যে, টিকটকের নামে মেয়েদের ভারতে পাচার করা হয়। সেই পাচারের শিকার মানুষদের কষ্ট এবং ফেলানী হত্যাকাণ্ডের যে আঘাত আমাকে দিয়েছিল—সব মিলিয়ে ‘কবি’র জন্ম। কাঁটাতারের দুই পাশের আনন্দ-বেদনা এবং পাসপোর্ট-ভিসার সংকটসহ নানা বিষয় ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। ছবিতে শরিফুল রাজ এবং ইধিকা পাল দারুণ অভিনয় করেছেন। ছবিটি মুক্তি পেলে রাজের ক্যারিয়ারে মাইলফলক হিসেবে থাকবে। ‘কবি’ নিয়ে এক লাইনে বললে—এটি একটি প্রতিবাদী, গান আর ভালো কাস্টিংয়ের ছবি।

নতুনদের জন্য সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি কেমন সম্ভাবনার জায়গা বলে মনে করেন?
আমি অত্যন্ত আশাবাদী একজন মানুষ। বর্তমানে প্রচুর ভালো ছবি নির্মাণ হচ্ছে এবং অনেক প্রতিভাবান নির্মাতা আসছেন। ‘দেলুপি’ এবং ‘উৎসব’ দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। জীবনঘনিষ্ঠ গল্প কিংবা পলিটিক্যাল স্যাটায়ার—এমন বিভিন্ন ঘরানার ছবি হওয়া খুব প্রয়োজন। কোনোটি হয়তো ‘বরবাদ’ হবে, কোনোটি ‘তুফান’ কিংবা কোনোটি ‘দেলুপি’-এর মতো হবে। সব ছবি যে সবার পছন্দ হবে তা নয়, কিন্তু বিভিন্ন ঘরানার ছবি হলে তবেই বিচিত্র রুচির দর্শক তৈরি হবে। এখন আর নিম্নমানের কাজ করার দিন নেই, এখন কোয়ালিটির সময়। কোয়ালিটির প্রশ্নে এখন আপস করার দিন শেষ। দর্শক তৈরি করে নিতে হবে। তবে একটা বড় সমস্যা হলো হল-সংকট এবং পেশাদার প্রযোজকের অভাব। এছাড়া চলচ্চিত্রের আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত এফডিসি যাঁরা পরিচালনা করেন তাঁদের সিনেমার উন্নয়ন নিয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখিনি। তাঁরা শুধু মিটিংই করেন, কিন্তু সেখান থেকে কখনও গঠনমূলক কিছু বেরিয়ে আসেনি। মূলত রাজনৈতিক তদবিরের মাধ্যমে এসব পদে আসা হয় বলে চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁদের সেই দায়বদ্ধতা থাকে না।
ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কারণে কি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি হুমকির মুখে পড়ছে?
না, ওটিটি মূলত কোভিডের সময় জনপ্রিয় হয়েছিল যখন সিনেমা হল বন্ধ ছিল। ওটিটি মানুষের রুচি পরিবর্তন করে দিয়েছে। তবে ছোট স্ক্রিন আর বড় স্ক্রিনের মেকিং এক নয়। আমি কখনো ওটিটির জন্য সিনেমা বানাব না, আমি সিলভার স্ক্রিনের জন্যই সিনেমা বানাব। আসল কথা হলো ভালো কনটেন্ট। কনটেন্ট ভালো হলে মাধ্যম কোনো সমস্যা নয়—তা ইউটিউব হোক বা সিনেমা হল। গল্প ঠিকঠাক বলতে পারলে তা মানুষের কাছে পৌঁছাবেই।
ইএইচ/




