বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

ইকবাল হল থেকে জহুরুল হক: নাম বদলের নেপথ্যের ইতিহাস

মাহফুজুর রহমান
প্রকাশিত: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৮:২০ পিএম

শেয়ার করুন:

ইকবাল হলের নাম কেন হলো জহুরুল হক হল
আল্লামা ইকবাল হল থেকে জহুরুল হক, নাম বদলের ইতিহাস। ছবি: ঢাকা মেইল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে তখন উত্তাল সময়। চারদিকে মিছিল, স্লোগান, দেয়ালে দেয়ালে প্রতিবাদের ভাষা। পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজের ক্ষোভ ক্রমেই বিস্ফোরণের দিকে এগোচ্ছিল। এর মধ্যেই ১৯৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সেনানিবাস থেকে ছড়িয়ে পড়ে এক ভয়াবহ খবর—আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ১৭ নম্বর আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হক গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কিছুক্ষণ পর তাঁর মৃত্যুর খবর পৌঁছায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন শিক্ষার্থীরা। আর সেই উত্তাল সময়েই পাকিস্তানের কবি আল্লামা ইকবালের নামে পরিচিত ইকবাল হল যেন রাতারাতি নতুন পরিচয় পায়—সার্জেন্ট জহুরুল হক হল।

এই নামবদল কোনো সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না। এটি ছিল একটি সময়ের রাজনৈতিক প্রতিবাদ, একজন শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজের গভীর সম্পৃক্ততার প্রতীক।

ইকবাল হলের শুরু

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম আবাসিক হল হিসেবে ১৯৫৭ সালে ইকবাল হল প্রতিষ্ঠিত হয়। পাকিস্তানের কবি ও দার্শনিক আল্লামা মুহাম্মদ ইকবালের নামে হলটির নামকরণ করা হয়েছিল।

5

প্রতিষ্ঠার সময় এটি ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আবহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি নাম। কিন্তু পরবর্তী এক দশকে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত বদলে যেতে থাকে। ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের দাবি, ছয় দফা এবং ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো তখন ছাত্ররাজনীতি, সভা, মিছিল, সংগঠন ও আন্দোলনের পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রাখত। ইকবাল হলও এই রাজনৈতিক বাস্তবতার বাইরে ছিল না।

কে ছিলেন সার্জেন্ট জহুরুল হক?

সার্জেন্ট জহুরুল হক ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর একজন বাঙালি সদস্য। তিনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ৩৫ আসামির মধ্যে ১৭ নম্বর আসামি ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল-সংক্রান্ত তথ্যেও তাঁকে এ মামলার ১৭ নম্বর অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ছিল পাকিস্তান সরকারের করা একটি রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা। এতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জনকে আসামি করা হয়। মামলার অভিযোগ ছিল, ভারতের আগরতলায় গোপন বৈঠকের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে।

4

কিন্তু মামলাটি যত এগোতে থাকে, ততই তা বাঙালির রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত হয়। বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য অভিযুক্তের মুক্তির দাবিতে আন্দোলনও তীব্র হতে থাকে।

১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯: যে মৃত্যু আন্দোলনকে আরও তীব্র করল

১৯৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হক ঢাকা সেনানিবাসে বন্দি অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হন। পরে তিনি মারা যান। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর আইএসপিআরের তথ্য অনুযায়ী, সেদিন ঢাকা সেনানিবাসে আটক অবস্থায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যদের গুলিতে তিনি নিহত হন।

তাঁর হত্যাকাণ্ড তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। বঙ্গবন্ধুসহ আগরতলা মামলার অভিযুক্তদের মুক্তির দাবিতে চলমান গণআন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। জহুরুল হকের হত্যাকাণ্ড চলমান গণআন্দোলনকে আরও বেগবান করে। জহুরুল হকের মৃত্যুর প্রতিক্রিয়া দ্রুত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও ছড়িয়ে পড়ে।

ইকবাল হলের নাম বদলের মুহূর্ত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ইতিহাসে ঘটনাটিকে বেশ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ইকবাল হলের নাম পরিবর্তন করে আগরতলা মামলার ১৭ নম্বর অভিযুক্ত শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হকের স্মরণে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল নাম দেন। অর্থাৎ নামটি প্রথমে আসে ছাত্রদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ১৯৬৯ সালে শিক্ষার্থীরা যে নামটি ব্যবহার শুরু করেন, সেটি তখনই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নথিতে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়নি। তবে ছাত্রসমাজের কাছে ইকবাল হল নামটি কার্যত প্রত্যাখ্যাত হয়ে যায় এবং জহুরুল হক হল পরিচয়টি প্রতিষ্ঠা পায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদের স্মৃতিচারণভিত্তিক একটি সংরক্ষিত বর্ণনাতেও বলা হয়েছে, জহুরুল হকের মৃত্যুর পর ইকবাল হলের শিক্ষার্থীরা জমায়েত হন এবং সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে হলটির নতুন নাম ঘোষণা করা হয়।

১৯৭২: নাম পেল সরকারি স্বীকৃতি

১৯৬৯ সালে ছাত্রদের দেওয়া সার্জেন্ট জহুরুল হক হল নামটি স্বাধীনতার পর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইকবাল হলের নাম দাপ্তরিকভাবে পরিবর্তন করে জহুরুল হক হল রাখে।

অর্থাৎ নামটির ইতিহাস এভাবে সাজানো যায়—১৯৫৭ সালে ইকবাল হল প্রতিষ্ঠা, ১৯৬৯ সালে ছাত্রদের উদ্যোগে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল নামকরণ, ১৯৭২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক নাম জহুরুল হক হল এবং ২০১৩ সালে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল।

2

২০১৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নামের সঙ্গে শহীদ সার্জেন্ট যুক্ত করে বর্তমান নামটি নির্ধারণ করে।

শুধু একটি নাম নয়, ১৯৭১-এর প্রস্তুতিরও কেন্দ্র

জহুরুল হক হলের ইতিহাস ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে শেষ হয়নি। বরং দুই বছর পর, ১৯৭১ সালে হলটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর একটি হয়ে ওঠে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে জহুরুল হক হল বাঙালির দিকনির্দেশনার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। বাঙালির মুক্তির লক্ষ্যে এই হল থেকে জয় বাংলা বাহিনী গঠিত হয়।

এখানেই শেষ নয়। বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত যে ঐতিহাসিক পতাকা ২ মার্চ ১৯৭১ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে প্রথম উত্তোলন করা হয়েছিল, সেই পতাকাও জহুরুল হক হলে তৈরি হয়েছিল বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।

ফলে হলটির নামের সঙ্গে একজন শহীদের স্মৃতি যেমন যুক্ত, তেমনি যুক্ত হয়ে যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রস্তুতির প্রত্যক্ষ ইতিহাস।

২৫ মার্চ: যে হল হয়ে গেল হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

সেই কালরাতে জহুরুল হক হলও পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল ইতিহাসে বলা হয়েছে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হলটিতে অতর্কিত হামলা চালিয়ে বহু ছাত্র, কর্মচারী ও নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। এখানে ইতিহাসের একটি নির্মম পরিহাস রয়েছে।

যে হলের নাম একজন বাঙালি শহীদের স্মরণে রাখা হয়েছিল, স্বাধীনতার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে সেই হলের ছাত্ররাই স্বাধীনতার আন্দোলনের অন্যতম সক্রিয় শক্তি হয়ে উঠেছিলেন। আর সেই হলই ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়।

‘জহু হল’: নামের সঙ্গে প্রজন্মের সম্পর্ক

সময়ের সঙ্গে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল নামটি শিক্ষার্থীদের মুখে আরও সংক্ষিপ্ত হয়ে জহু হল নামে পরিচিত হয়েছে। কিন্তু সংক্ষিপ্ত নামটির পেছনে যে ইতিহাস, তা মোটেও সংক্ষিপ্ত নয়।

এখানে একসঙ্গে মিশে আছে ১৯৫৭ সালের ইকবাল হল প্রতিষ্ঠা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, সার্জেন্ট জহুরুল হকের শাহাদাত, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ছাত্রদের হাতে হলের নাম পরিবর্তন, ১৯৭১-এর অসহযোগ আন্দোলন, জয় বাংলা বাহিনী গঠন, বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত প্রথম পতাকা তৈরির ইতিহাস, ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞ এবং স্বাধীনতার পর নামটির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

3

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রভোস্টের বার্তাতেও হলটিকে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ২ মার্চ ১৯৭১ জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সঙ্গে হলটির ভূমিকার কথা বলা হয়েছে।

নাম পরিবর্তনের রাজনৈতিক তাৎপর্য

১৯৬৯ সালে যখন নামটি পরিবর্তন করা হয়েছিল, তখন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলনে ছিল। সার্জেন্ট জহুরুল হকের মৃত্যু সেই আন্দোলনের আবেগ ও ক্ষোভকে আরও তীব্র করে।

ফলে ইকবাল হল থেকে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল হয়ে ওঠা ছিল সেই সময়ের ছাত্রসমাজের রাজনৈতিক প্রতিবাদের একটি প্রতীকী প্রকাশ।

আর স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যখন নামটিকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়, তখন ১৯৬৯-এর ছাত্র-আন্দোলনের সেই প্রতীকী সিদ্ধান্তই রাষ্ট্রের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।

একটি হলের নাম কখনো কখনো শুধু একটি ঠিকানা নয়, একটি সময়ের দলিলও হতে পারে।

ইকবাল হল ছিল পাকিস্তান আমলের একটি নাম। সার্জেন্ট জহুরুল হক হল হয়ে ওঠা ছিল গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ের প্রতিক্রিয়া। আর শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল হলো স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে সেই শহীদের স্মৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ধারণ করার নাম।

১৯৬৯ সালের একটি গুলির ঘটনা তাই শুধু একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেয়নি; তার প্রতিধ্বনি পৌঁছেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের নামেও। সেই নাম পরে জড়িয়ে গেছে ১৯৭১-এর পতাকা, স্বাধীনতার প্রস্তুতি এবং ২৫ মার্চের রক্তাক্ত রাতের সঙ্গে।

শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ইতিহাস মূলত একটি নামের ইতিহাস নয়—এটি ইকবাল হল থেকে জহুরুল হক হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে একটি জাতির রাজনৈতিক পরিচয় বদলে যাওয়ারও ইতিহাস।

এম/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর