শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

যেভাবে জিন্নাহ হল হয়ে উঠল মাস্টারদা সূর্য সেন হল

মাহফুজুর রহমান
প্রকাশিত: ২১ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩৭ পিএম

শেয়ার করুন:

যেভাবে জিন্নাহ হল হয়ে উঠল মাস্টারদা সূর্য সেন হল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারদা সূর্য সেন হলের কয়েকটি দৃশ্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা ঐতিহাসিক অধ্যায়। তবে মাস্টারদা সূর্য সেন হলের ইতিহাস কিছুটা আলাদা। প্রতিষ্ঠার সময় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর নামে নামকরণ করা এই হল স্বাধীনতার পূর্বমুহূর্তে ছাত্রদের রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নতুন পরিচয় পায়। স্বাধীনতার পর সেই পরিচয়ই বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে।

আজকের সূর্য সেন হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম বড় আবাসিক হল। একই সঙ্গে এটি বাঙালির রাজনৈতিক আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী ঐতিহ্যের স্মৃতিও বহন করছে।

যাত্রা শুরু জিন্নাহ হল হিসেবে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক সংকট কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে ১৯৬৪ সালের এপ্রিল মাসে বর্তমান সূর্য সেন হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। চার একর জমির ওপর নির্মিত হলটির দুটি ব্লকে ছয়তলা ভবন নির্মাণ করা হয়। নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৬৬ সালে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণকাজ শেষে হলটির নাম দেওয়া হয় মুহম্মদ আলী জিন্নাহ হল। তখন পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় জিন্নাহর নামে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের নামকরণ ছিল স্বাভাবিক। হলটিতে ছিল ৩৮২টি কক্ষ।

তৎকালীন সময়ে জিন্নাহ হল শুধু শিক্ষার্থীদের আবাসিক স্থান ছিল না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। ষাটের দশকের শেষ দিকে পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রদের আন্দোলন তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হলটির রাজনৈতিক গুরুত্বও বাড়তে থাকে।

ষাটের দশকের রাজনৈতিক উত্তাল সময়ে জিন্নাহ হল

১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল পাকিস্তানি সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। তৎকালীন জিন্নাহ হলও এর বাইরে ছিল না।

বিভিন্ন স্মৃতিচারণে জিন্নাহ হলের রাজনৈতিক পরিবেশের কথা উঠে এসেছে। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১ সময়কালের আন্দোলন-সংগ্রামের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অধ্যাপক মইনুল ইসলাম জিন্নাহ হলকে তৎকালীন ছাত্ররাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এমনকি জয় বাংলা স্লোগানের প্রচারের ইতিহাসের সঙ্গেও হলটির নাম জড়িয়ে আছে। প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি ঐতিহাসিক স্মৃতিচারণে বলা হয়েছে, তৎকালীন জিন্নাহ হলের ছাত্রলীগ নেতা আফতাব আহমাদ ১৯৬৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে একটি কর্মিসভায় প্রথমবারের মতো জয় বাংলা স্লোগান দেন বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। পরে স্লোগানটি ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ে।

অর্থাৎ যে ভবনের নাম ছিল পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্নাহর নামে, সেটিই ধীরে ধীরে পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতীয়তাবাদী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিসরে পরিণত হচ্ছিল।

কেন সূর্য সেনের নামে নামকরণের দাবি

এই পরিবর্তনের পেছনে ছিল বাঙালির নিজস্ব রাজনৈতিক ও বিপ্লবী ঐতিহ্যকে সামনে আনার আকাঙ্ক্ষা।

মাস্টারদা নামে পরিচিত সূর্য সেন ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লবী নেতা। পেশায় শিক্ষক হওয়ায় সহযোদ্ধা ও অনুসারীদের কাছে তিনি মাস্টারদা নামে পরিচিত হন।

১৯৩০ সালে তাঁর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণ পরিচালিত হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের ইতিহাসে এই অভিযান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পরে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ফাঁসি দেয়।

স্বাধীনতার আগে ও পরে বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসে সূর্য সেনকে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের সাহসী প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। ফলে পাকিস্তানি রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি হলের নাম পরিবর্তন করে একজন বাঙালি বিপ্লবীর নামে করার বিষয়টি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

১৯৭১-এর মার্চে বদলে গেল হলের পরিচয়

১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।

এই সময়ই জিন্নাহ হলের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

image

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের মার্চে শিক্ষার্থীরা হলটির নাম মাস্টারদা সূর্য সেন হল করার অনুমোদন দেয়। পরে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭২ সালের জুনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট আনুষ্ঠানিকভাবে মাস্টারদা সূর্য সেন হল নামটি অনুমোদন করে।

এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। নাম পরিবর্তনটি কেবল স্বাধীনতার পর হঠাৎ করে হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের মার্চেই শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। ১৯৭২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সেটিকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়।

তবে ১৯৭২ সালের নামকরণের প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন স্মৃতিচারণে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনাও পাওয়া যায়। তাই প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল নথিভিত্তিক সময়রেখাকেই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিও বহন করছে হলটি

মাস্টারদা সূর্য সেন হল শুধু নাম পরিবর্তনের ইতিহাস বহন করছে না, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গেও হলটির সরাসরি স্মৃতি জড়িয়ে আছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হলটিতে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদ ছাত্র-শিক্ষকদের স্মরণে স্মৃতির জানালা নামে একটি ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছে। একই সঙ্গে হল প্রাঙ্গণে রয়েছে মাস্টারদা সূর্য সেনের একটি ম্যুরাল ও একটি শহীদ মিনার।

হলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যেও মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মৃতি রয়েছে। তৎকালীন জিন্নাহ হলের হাউস টিউটর ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ সাদাত আলী। মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ২৬ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাঁর আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭১ সালের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে প্রকাশিত একটি গবেষণাধর্মী নথিতে তাঁর পরিচয় ও জিন্নাহ হলের হাউস টিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালনের তথ্য উল্লেখ আছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য আবাসিক হলের মতো তৎকালীন জিন্নাহ হলও ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর সামরিক অভিযানের সময় ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়।

সেই সময় হলটির নাম ছিল মুহম্মদ আলী জিন্নাহ হল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এমাজউদ্দীন আহমদের স্মৃতিচারণেও ২৫ মার্চের সময় তাঁর জিন্নাহ হলের আবাসিক শিক্ষক থাকার কথা উঠে এসেছে।

image

অর্থাৎ হলটির নাম তখনও জিন্নাহর নামে থাকলেও এর ভেতরের বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী সেই আন্দোলন দমনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আক্রমণের অন্যতম লক্ষ্য বানিয়েছে।

নাম বদল ছিল রাজনৈতিক পরিচয়েরও পরিবর্তন

জিন্নাহ হল থেকে সূর্য সেন হল—এই নাম পরিবর্তনকে শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক তাৎপর্যের বড় অংশই বাদ পড়ে যায়।

প্রথম নামটি ছিল পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নামে। আর পরের নামটি একজন বাঙালি বিপ্লবীর নামে, যিনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

এই পরিবর্তনের সময়টিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালের মার্চে, যখন বাঙালির স্বাধীনতার আন্দোলন দ্রুত চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখনই শিক্ষার্থীরা হলটির নাম সূর্য সেনের নামে করার উদ্যোগ নেয়। পরের বছর স্বাধীন বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সেই নামকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।

এ কারণে সূর্য সেন হলের নামকরণকে বাঙালির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেও দেখা যায়।

বর্তমানে মাস্টারদা সূর্য সেন হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম বড় আবাসিক হল। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এটি প্রায় চার একর জায়গার ওপর নির্মিত এবং দুটি ব্লকে ছয়তলা ভবন রয়েছে। হলের আবাসিক ভবনগুলোর মাঝখানে রয়েছে ফুলের বাগান, দুটি কৃত্রিম জলাধার ও ফোয়ারা।

image

তবে স্থাপত্য বা আবাসিক সুবিধার বাইরে হলটির সবচেয়ে বড় পরিচয় এর ইতিহাস। এর দেয়াল ও প্রাঙ্গণ সাক্ষী হয়েছে পাকিস্তানি আমলের ছাত্ররাজনীতি, ১৯৬৯-এর গণআন্দোলন, ১৯৭১-এর স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের।

হল প্রাঙ্গণে থাকা স্মৃতির জানালা ভাস্কর্য, শহীদ মিনার ও মাস্টারদা সূর্য সেনের ম্যুরাল সেই ইতিহাসকে দৃশ্যমান করে রেখেছে।

একটি হলের নাম বদলের ভেতর যে বাংলাদেশের গল্প

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারদা সূর্য সেন হলের ইতিহাস মূলত একটি নাম পরিবর্তনের ইতিহাস হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বৃহত্তর রাজনৈতিক রূপান্তরের গল্প।

১৯৬৬ সালে মুহম্মদ আলী জিন্নাহ হল হিসেবে যাত্রা শুরু করা ভবনটি কয়েক বছরের মধ্যেই বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ পরিসরে পরিণত হয়। ১৯৭১ সালের মার্চে শিক্ষার্থীরা এর নাম পরিবর্তন করে মাস্টারদা সূর্য সেন হল করার উদ্যোগ নেয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের জুনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সেই নাম অনুমোদন করে।

image

ফলে আজকের সূর্য সেন হলের নামের সঙ্গে একই সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী সূর্য সেনের স্মৃতি, পাকিস্তানবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।

একসময় যে ভবনের নাম ছিল পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্নাহর নামে, স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের মধ্য দিয়ে সেটিই হয়ে ওঠে বাঙালির বিপ্লবী ঐতিহ্যের প্রতীক মাস্টারদা সূর্য সেন হল। সেই নাম পরিবর্তন তাই কেবল একটি নামফলক বদলের ঘটনা নয়, এটি একটি সময়ের রাজনৈতিক ও মানসিক পরিবর্তনেরও দলিল।

এম/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর