বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

নগরায়ণের চাপে আড়ালে তিন শতাব্দীর বিবি মরিয়ম শাহী মসজিদ

মাহফুজুর রহমান
প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৩০ এএম

শেয়ার করুন:

নগরায়ণের চাপে আড়ালে তিন শতাব্দীর বিবি মরিয়ম শাহী মসজিদ
বিবি মরিয়ম শাহী মসজিদ

ঢাকার নীলক্ষেত মানেই বইপাড়া, ফুটপাতের দোকান আর ব্যস্ত নগরজীবন। প্রতিদিন হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর এই এলাকায় দাঁড়িয়ে আছে এমন একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে অনেক ঢাকাবাসীও অবগত নন। বাবুপুরা এলাকার সরু গলির ভেতরে অবস্থিত বিবি মরিয়ম শাহী মসজিদ। এটি মুঘল আমলের স্থাপত্য, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং ঢাকার ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী।

নগরায়ণের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য

প্রথমবার কেউ এই মসজিদে যেতে চাইলে সহজেই বিভ্রান্ত হতে পারেন। চারপাশে বহুতল ভবন, মার্কেট ও ঘনবসতির কারণে বাইরে থেকে মসজিদটি চোখেই পড়ে না। নীলক্ষেতের শাহ সাহেব বাড়ি রোড ধরে বাবুপুরা মার্কেটের ভেতরে প্রবেশ করলেই দেখা মেলে ইতিহাসের এই নিদর্শনের।

একসময় মসজিদটির চারপাশ ছিল তুলনামূলক উন্মুক্ত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, বাণিজ্যিক স্থাপনা এবং নীলক্ষেত মার্কেটের বিস্তারে মসজিদটি যেন আড়ালে লুকিয়ে গেছে।

নির্মাণকাল ও ইতিহাস

ইতিহাসবিদদের মতে, বিবি মরিয়ম শাহী মসজিদ নির্মিত হয় ১৭০৬ সালে, অর্থাৎ মুঘল শাসনের শেষভাগে। এটি মুঘল স্থাপত্যরীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন, যা সে সময়ের ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণশৈলীর পরিচয় বহন করে।

অনেক গবেষণায় মসজিদটির নাম ‘মরিয়ম সালেহা মসজিদ’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে অবশ্য এটি দীর্ঘদিন ধরে বিবি মরিয়ম শাহী মসজিদ নামেই পরিচিত।

মুঘল স্থাপত্যের ছাপ

মসজিদটি আকারে খুব বড় নয়, তবে এর স্থাপত্যে স্পষ্টভাবে মুঘল আমলের বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদে রয়েছে মোটা দেয়াল, খিলানযুক্ত প্রবেশপথ এবং অনাড়ম্বর অথচ ভারসাম্যপূর্ণ নকশা।

অতিরিক্ত অলংকরণের পরিবর্তে নির্মাণে কার্যকারিতা ও সৌন্দর্যের সমন্বয় করা হয়েছে, যা মুঘল যুগের ধর্মীয় স্থাপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

কবরস্থান ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য

মসজিদের দক্ষিণ পাশে একটি প্রাচীন কবরস্থান রয়েছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এখানে বিবি মরিয়ম, তাঁর বাবা শাহ আবদুল্লাহ এবং বাঘু দেওয়ানের (রহ.) সমাধি অবস্থিত।

এ কারণে মসজিদটি শুধু নামাজ আদায়ের স্থান নয়; বহু মানুষের কাছে এটি একটি আধ্যাত্মিক গুরুত্বসম্পন্ন স্থানও। বিভিন্ন সময় মানুষ এখানে দোয়া ও জিয়ারতের উদ্দেশ্যে আসেন।

2

ব্যস্ত রাজধানীর বুকে এক নীরব ইতিহাস

নীলক্ষেতে প্রতিদিন হাজার হাজার শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গবেষক ও বইপ্রেমী আসেন। অথচ তাদের অনেকেই জানেন না, অল্প কয়েক মিনিটের হাঁটা দূরত্বেই প্রায় তিন শতাব্দী পুরনো একটি ঐতিহাসিক মসজিদ দাঁড়িয়ে আছে।

চারপাশের কোলাহল যেন মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করেই থেমে যায়। বাইরে যানজট, হর্ন আর মানুষের ভিড়; ভেতরে শান্ত পরিবেশ, যেখানে ইতিহাস ও ধর্মীয় আবহ একসঙ্গে অনুভূত হয়।

সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা

ঐতিহাসিক এই মসজিদটি নগরায়ণের চাপে ধীরে ধীরে আড়ালে চলে গেছে। স্থাপত্যগত বৈশিষ্ট্য, ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যের কারণে এটি গবেষক, স্থাপত্যবিদ ও ইতিহাস-অনুরাগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঐতিহাসিক স্থাপনা শুধু সংরক্ষণ করাই যথেষ্ট নয়; সাধারণ মানুষের কাছেও এর ইতিহাস তুলে ধরা জরুরি। তথ্যফলক, পর্যাপ্ত নির্দেশনা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে বিবি মরিয়ম শাহী মসজিদকে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর একটি হিসেবে আরও পরিচিত করা সম্ভব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আজিজুর রহমান আজিজ বলেন, ‘পুরান ঢাকা ও এর আশপাশের শত শত বছরের পুরোনো মসজিদ, মন্দির, কবরস্থান ও ঐতিহাসিক স্থাপনা শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় বা স্থাপত্য নিদর্শন নয়; এগুলো রাজধানীর নগর-ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক বিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। কিন্তু দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত নির্মাণ, বাণিজ্যিক স্থাপনার বিস্তার এবং পর্যাপ্ত প্রচারের অভাবে এসব স্থাপনার অনেকগুলোই সাধারণ মানুষের দৃষ্টির আড়ালে চলে যাচ্ছে। নীলক্ষেতের বিবি মরিয়ম শাহী মসজিদও সেই বাস্তবতার একটি উদাহরণ। রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকায় অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও প্রতিদিন হাজারো মানুষ এর পাশ দিয়ে যাতায়াত করেন, অথচ এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে জানেন না। এগুলোকে সংরক্ষণে সংশ্লিষ্টদের কাজ করা উচিত।’

ঢাকা কলেজ শিক্ষার্থী আল আমিন বলেন, ‘শুধু স্থাপনাটি টিকিয়ে রাখাই যথেষ্ট নয়; এর ইতিহাস, নির্মাণশৈলী, সাংস্কৃতিক গুরুত্ব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্বদের পরিচয়ও সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও নথিভুক্ত করা জরুরি। এজন্য প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণা, তথ্যফলক স্থাপন, ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং ঐতিহ্যভিত্তিক শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনার ওপর জোর দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে রাজধানীর ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে ঘিরে 'হেরিটেজ ট্রেইল' বা ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন উদ্যোগ নেওয়া হলে দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীরা ঢাকার সমৃদ্ধ ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবেন এবং এসব স্থাপনার প্রতি জনসচেতনতাও বাড়বে।’

নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। পুরান ঢাকার যেসব ঐতিহাসিক স্থাপনা এখনো টিকে আছে, সেগুলোর অনেকই অবহেলা, দখল ও অপরিকল্পিত ব্যবহারের কারণে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ঢাকা মানেই শুধু নতুন নতুন বহুতল ভবন নয়। এই শহরের চারশ বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যই ঢাকার প্রকৃত পরিচয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেই ইতিহাসের খুব সামান্য অংশই আমরা সংরক্ষণ করতে পেরেছি। হাতে গোনা কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা এখনো টিকে আছে। এগুলোকে রক্ষা করতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হারিয়ে যাবে।’

তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে রাজধানীর নানা রাজনৈতিক পরিবর্তন, নগরায়ণ এবং জনজীবনের অসংখ্য অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নীলক্ষেতের বিবি মরিয়ম শাহী মসজিদ। 

কংক্রিটের শহরের ভিড়ে এই মসজিদ মনে করিয়ে দেয়— ঢাকার ইতিহাস শুধু বড় বড় দুর্গ, প্রাসাদ বা স্মৃতিস্তম্ভে সীমাবদ্ধ নয়; সরু গলির ভেতরেও ছড়িয়ে আছে শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের অমূল্য নিদর্শন, যেগুলো সংরক্ষণ করা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এম/এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর