সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

বাকৃবির গবেষণা: ব্রুসেলোসিস রোগ

লক্ষণ ছাড়াই কমছে গাভির দুধ, ডেইরি খামারে বছরে ক্ষতি আড়াই কোটি টাকা

আসিফ ইকবাল, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
প্রকাশিত: ২৪ জুলাই ২০২৬, ১২:৪৫ পিএম

শেয়ার করুন:

লক্ষণ ছাড়াই কমছে গাভীর দুধ, ডেইরি খামারে বছরে ক্ষতি ২ কোটি ৪১ লাখ টাকা
বাকৃবির মেডিসিন বিভাগের ল্যাবরেটরি অব এপিডেমিওলজি অ্যান্ড প্রিভেন্টিভ মেডিসিনের অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. আনিসুর রহমান।

বাংলাদেশে গবাদিপশুর ব্রুসেলোসিস রোগ শুধু দুগ্ধ খামারের উৎপাদনশীলতাই কমাচ্ছে না, খামারিদের অজান্তেই প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির কারণ হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষকের দুই বছরের গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, সক্রিয় ব্রুসেলোসিসে আক্রান্ত একটি গাভি সুস্থ গাভির তুলনায় দৈনিক গড়ে ১ দশমিক ০১ লিটার কম দুধ দেয়। আবার বাহ্যিক কোনো লক্ষণ ছাড়াই, সুপ্ত বা লুকিয়ে থাকা সংক্রমণে আক্রান্ত গাভির দুধও দৈনিক গড়ে ০ দশমিক ৫৩ লিটার কমে যায়। এর ফলে দেশের বড় বাণিজ্যিক ডেইরি খামারগুলোতে বছরে গড়ে প্রায় ২ কোটি ৪১ লাখ টাকার ক্ষতি হচ্ছে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী Animal Diseases-এ প্রকাশিত গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বাচ্চা প্রসবের পর গাভির গর্ভফুল না পড়া (রিটেইনড প্লাসেন্টা) ব্রুসেলোসিসের অন্যতম প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ কারণ।

গবেষণাটির নেতৃত্ব দেন বাকৃবির মেডিসিন বিভাগের ল্যাবরেটরি অব এপিডেমিওলজি অ্যান্ড প্রিভেন্টিভ মেডিসিনের অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. আনিসুর রহমান। গবেষণায় আরও অংশ নেন একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সিদ্দিকুর রহমান, অধ্যাপক ড. এম. আরিফুল ইসলাম, প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের কর্মকর্তা ও পিএইচডি গবেষক মো. শফিউল আলমসহ অন্য গবেষকেরা।

আরও পড়ুন

বিষাক্ত পার্থেনিয়ামের অভয়ারণ্য ইবি ক্যাম্পাস, ঝুঁকিতে শিক্ষার্থীরা

রোগ শনাক্তে আধুনিক গাণিতিক পদ্ধতি উন্নয়নে গ্রিসের থেসালি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই বিশেষজ্ঞ লেফটেরিস মেলেটিস ও পলিক্রোনিস কস্তুলাস যৌথভাবে কাজ করেন। সরকারের লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (এলডিডিপি) অর্থায়নে এবং প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় গবেষণাটি পরিচালিত হয়।

২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত, দেশের প্রধান দুধ উৎপাদনকারী অঞ্চলের ১৭টি বড় বাণিজ্যিক ডেইরি, খামার থেকে ২ হাজার ৬৯৬টি দুগ্ধবতী, গাভির তথ্য ও দুধের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। আধুনিক পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ এবং বায়েসিয়ান মিক্সড-ইফেক্টস মাল্টিনোমিয়াল রিগ্রেশন পদ্ধতি ব্যবহার করে গাভিগুলোকে সুস্থ, সুপ্ত সংক্রমণ ও সক্রিয় ব্রুসেলোসিস—এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়।

সাধারণত ব্রুসেলোসিস আক্রান্ত গরুকে শুধু ‘আক্রান্ত’ বা ‘সুস্থ’ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, এ গবেষণায় প্রথমবারের মতো সুপ্ত সংক্রমণকে আলাদা করে শনাক্ত করা হয়েছে।

ebbb1b5c-18c5-42a7-8865-cda28311fbc1

এ বিষয়ে অধ্যাপক আনিসুর রহমান বলেন, ‘ব্রুসেলোসিস সব সময় বাইরে থেকে বোঝা যায় না। অনেক গরুর শরীরে রোগটি সুপ্ত অবস্থায় থাকে। বাইরে থেকে সুস্থ মনে হলেও তাদের দুধ উৎপাদন কমে যায় এবং পরবর্তী সময়ে রোগটি সক্রিয় হতে পারে।’

তিনি বলেন, সক্রিয় ব্রুসেলোসিসে আক্রান্ত গাভির ক্ষেত্রে গর্ভপাত, গর্ভফুল আটকে যাওয়া এবং প্রজনন ব্যর্থতার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। জীবাণুটি জরায়ু ও গর্ভফুলের ক্ষতি করায় গাভি সময়মতো ঋতুচক্রে আসে না এবং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনক্ষমতা হারায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে দুধ উৎপাদনে।

গবেষণার অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বড় ডেইরি খামারগুলোতে ব্রুসেলোসিসের কারণে বছরে গড়ে প্রায় ২ কোটি ৪১ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। এর বড় অংশই দুধ উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে।

ড. আনিসুর রহমান বলেন, ‘খামারিরা সাধারণত গাভির গর্ভপাত হলে ব্রুসেলোসিসের কথা ভাবেন। কিন্তু লক্ষণহীন সুপ্ত সংক্রমণেও প্রতিদিন গাভীপ্রতি প্রায় আধা লিটার দুধ কমে যায়। আর সক্রিয় রোগে এ ক্ষতি এক লিটার বা তারও বেশি। ফলে খামারিরা বুঝতে না পেরেই প্রতিদিন বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।’

তিনি পরামর্শ দেন, খামারে গর্ভপাত, গর্ভফুল আটকে যাওয়া, গাভির সময়মতো ঋতুচক্রে না আসা বা বারবার প্রজনন ব্যর্থতার মতো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ব্রুসেলোসিস পরীক্ষা করানো উচিত।

তিনি আরও বলেন, ব্রুসেলোসিস একটি জুনোটিক রোগ। আক্রান্ত গরুর কাঁচা দুধ পান করলে বা সংক্রমিত প্রাণীর সংস্পর্শে এলে মানুষও এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

গবেষণায় রোগ নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন কৌশলের ব্যয়-সুবিধাও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, পরিকল্পিত গণটিকাদান সবচেয়ে লাভজনক পদ্ধতি। এ ক্ষেত্রে প্রতি ১ টাকা বিনিয়োগে গড়ে ৮ টাকা ১৪ পয়সা পর্যন্ত ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। তবে আক্রান্ত গরু শনাক্ত করে খামার থেকে বাদ দেওয়ার পদ্ধতি সরকারি ক্ষতিপূরণ ছাড়া সাধারণ খামারিদের জন্য ব্যয়বহুল।

গবেষকেরা মনে করেন, দেশে ব্রুসেলোসিস নিয়ন্ত্রণে উচ্চ ঝুঁকির গাভি দ্রুত শনাক্ত করা, নিয়মিত রোগ নজরদারি জোরদার করা এবং প্রজননস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা জরুরি। পাশাপাশি বড় খামারের পাশাপাশি ছোট খামারগুলোতেও এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর