রোববার, ২৬ মে, ২০২৪, ঢাকা

অনিয়মের অন্তহীন অভিযোগ, ফাঁসছেন শিক্ষক নেতা!

বোরহান উদ্দিন
প্রকাশিত: ২১ নভেম্বর ২০২৩, ০৭:৪২ এএম

শেয়ার করুন:

অনিয়মের অন্তহীন অভিযোগ, ফাঁসছেন শিক্ষক নেতা!
ছবি: সংগৃহীত
  • হিসাব মিলছে না প্রায় ৩ কোটি টাকার
  • সাময়িক বরখাস্ত কাওছার শেখ বহিষ্কার হচ্ছেন
  • জাল সনদে চাকরি ও টাকায় এমপিওভুক্তির অভিযোগ
  • সব অভিযোগ মিথ্যা: কাওছার শেখ
  • অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করুক: স্কুল সভাপতি   
     

    রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার সবুজ বিদ্যাপীঠ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক কাওছার আলী শেখ। ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে আজও প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। এই সময়ে প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়সহ নানা খাতে আর্থিক অনিয়ম, এমপিওভুক্তির নামে শিক্ষকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায়, কল্যাণ ফান্ডের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা কমিটির দাবি— অডিট ফার্মের হিসাবে ২০১৫ সাল থেকে গত ছয় বছরে স্কুলের আয় ও ব্যয়ের খাত থেকে দুই কোটি ৮৫ লাখের বেশি টাকা অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে শিক্ষকদের কল্যাণ ফান্ডের এক লাখ ৯৮ হাজার টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এসব অভিযোগের কারণে গত ১১ নভেম্বর স্কুলটির ম্যানেজিং কমিটির বৈঠকে কাওছার আলী শেখকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একইসঙ্গে যে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে তা প্রতিষ্ঠানের তহবিলে ফেরত দিতে বলা হয়েছে। অন্যথায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।


বিজ্ঞাপন


অবশ্য নিজের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ মিথ্যা বলে ঢাকা মেইলের কাছে দাবি করেছেন কাওছার আলী শেখ। সোমবার (২০ নভেম্বর) ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, ‘অর্থ আত্মসাতসহ যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে এগুলো সব মিথ্যা। আমাকে হেয় করার জন্য পরিকল্পিতভাবে এসব করা হচ্ছে। ভুয়া অডিট রিপোর্ট দিয়েছে। মন্ত্রণালয়, আমাদের নিজস্ব অডিটে কোনো অনিয়ম পায়নি।’

 

আরও পড়ুন

 


বিজ্ঞাপন


কেন এমন ‘মিথ্যা অভিযোগ‘ আপনার বিরুদ্ধে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সভাপতির অনৈতিক অনেক কাজে বাধা দেওয়ায় এই মিথ্যা অভিযোগ তোলা হয়েছে। অবশ্যই সত্য প্রকাশ পাবে।’

 

অন্যদিকে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবুল কালাম অনু ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘অর্থ কেলেঙ্কারি ছাড়াও যেসব অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আছে সেসব বলতে চাই না। প্রধান শিক্ষকের সৎ সাহস থাকলে কমিটির অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করুক। আমরা মেনে নেব। তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। আবারও তদন্তের জন্য ডাকা হয়েছে। সাড়া না দিলে আর এক মিটিং অপেক্ষা করবো। না এলে বহিষ্কার করা হবে।’

কাওছার শেখের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দেওয়া অভিযোগের কপি, জাল সনদে আত্মীয়কে চাকরি দেওয়ার বিষয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যাচাইয়ের কপি, প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের অডিট রিপোর্ট ঢাকা মেইলের সংরক্ষণে আছে।

 

আরও পড়ুন

 

যে অভিযোগে বরখাস্ত কাওছার শেখ 
গত ১১ নভেম্বর সবুজ বিদ্যাপীঠ উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আবুল কালাম অনুর স্বাক্ষরিত নোটিশে প্রধান শিক্ষক কাওছার আলী শেখকে সাময়িক বরখাস্তের কথা জানানো হয়। এতে বলা হয়, কাওছার আলী শেখ ২০১২ সালের ৩১ মে থেকে সবুজ বিদ্যাপীঠ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তার দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম উত্থাপিত হয়, যা গত ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্তের ১০ নম্বর আলোচ্যসূচিতে ছিল। কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের অডিট করা হয়। অডিট টিম ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সময়ের আর্থিক তথ্য-উপাত্ত চাইলে কাওছার আলী তা দেননি। অডিটে সহযোগিতাও করেননি।

 

এতে আরও বলা হয়, অডিট টিমের জমা দেওয়া প্রতিবেদনে ২০১৫-২০২০ সাল পর্যন্ত সময়ে আয়ের খাতে এক কোটি ৪২ লাখ সাত হাজার ৪৮৯ টাকা এবং ব্যয়ের খাতের এক কোটি ৪৩ লাখ ৪৭ হাজার ২৫০ টাকা দুর্নীতির বিষয়টি প্রমাণিত হয়। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এমপিওভুক্তির নামে অর্থ আত্মসাৎ এবং ২০২০ সালে শিক্ষকদের প্রভিডেন্ড ফান্ডের এক লাখ ৯৮ হাজার টাকা আত্মসাতের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। এ নিয়ে তাকে দুই দফা কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

নোটিশে উল্লেখ হয়, আর্থিক দুর্নীতি, জাল সনদের মাধ্যমে নিজ আত্মীয়কে নিয়োগ দেওয়া, এমপিওভুক্তির আশ্বাস দিয়ে টাকা আদায় নারী শিক্ষকদের নিপীড়ন, প্রতিষ্ঠানের কাজে সময় না দিয়ে জমি ব্যবসায়ে নিজে ব্যস্ত রাখার মাধ্যমে দায়িত্বে অবহেলার কারণে ‘স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুল শিক্ষকদের চাকরির শর্ত বিধিমালা ১৯৭৯’ অনুযায়ী মো. শেখ কাওছার আলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো। একই সঙ্গে দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা সব টাকা অবিলম্বে প্রতিষ্ঠানের ফান্ডে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো। অন্যথায় তার বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক আইননানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

আরও পড়ুন

 

এই সিদ্ধান্তের অনুলিপি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান, ঢাকা জেলা প্রশাসককে দেওয়া হয়েছে। 

 

অন্যদিকে গত ১৩ নভেম্বর শিক্ষামন্ত্রীর কাছে তার আর্থিক অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার লিখিত আবেদন করে ব্যবস্থাপনা কমিটি। 

কী আছে মন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে?
গত ১৩ নভেম্বর শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনিকে দেওয়া চিঠিতে অডিট রিপোর্টে খাতওয়ারি আর্থিক অনিয়মের তথ্য তুলে ধরার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির সহকারী শিক্ষক সাহিদা বেগমকে এমপিওভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নগদ সাড়ে চার লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হয় কাওছার শেখের বিরুদ্ধে। অবশ্য এই শিক্ষক এখনো এমপিওভুক্ত হতে পারেননি।

এছাড়াও নিজের আত্মীয় পরিচয়ে হোসেন শেখ নামে একজন কম্পিউটার অপারেটরকে জাল সনদ দিয়ে সহকারী শিক্ষক (আইসিটি) পদে নিয়োগের অভিযোগ করা হয়। এরবাইরে প্রতিনিয়ত স্কুলে না আসা, শিক্ষক রাজনীতিতে বেশি ব্যস্ত থাকারও অভিযোগ করা হয়েছে মন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে।

 

আরও পড়ুন

 

অভিযোগ নিয়ে যা বললেন কাওছার শেখ
নিজ প্রতিষ্ঠানের কমিটির পক্ষ থেকে আনা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কাওছার আলী শেখ প্রথমে বলেন, ‘মঙ্গলবার আমার ইস্যু নিয়ে শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে মানববন্ধন আছে সেখানে আছেন বিস্তারিত কথা বলা যাবে। পরে তিনি বলেন, যা বলা হচ্ছে সব মিথ্যা, ষড়যন্ত্রমূলক। মন্ত্রণালয়ের অডিট হয়েছে দুইবার, প্রতি বছর স্কুলের ইন্টারনাল অডিট হয়।’

 

স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সঙ্গে বিরোধের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সভাপতির অনৈতিক অনেক কাজে আমি বাধা দেওয়ায় এই অভিযোগ তোলা হয়েছে। আমার কাছে সব তথ্য আছে কী কী কাজে বাধা দিয়েছি।’

ম্যানেজিং কমিটি কী বলছে
প্রধান শিক্ষকের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে সভাপতি আবুল কালাম অনু ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘২০২১ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষক, অভিভাবকদের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়ে ২০১০ সাল থেকে স্কুলের আয়-ব্যয়ের হিসাব করাতে অডিট ফার্ম নিয়োগ করা হয়। কিন্তু প্রধান শিক্ষক কোনো সহযোগিতা করেননি। পরে ২০১৫ সাল পর্যন্ত কোনো কাগজপত্র দেয়নি। ২০১৫ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে দুই কোটি ৮৫ লাখ টাকার অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব বিষয়ে তাকে শোকজ করা হলেও বোর্ড মিটিংয়েও আসেননি। পরে তাকে বরখাস্ত করা হয়।’

 

আরও পড়ুন

 

আপনার অনৈতিক কাজে সহযোগিতা না করায় বরখাস্ত করা হয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সভাপতি হিসেবে আমি যদি কোনো অনৈতিক কাজ করি, তাহলে তিনিও তো অনৈতিক কাজ করেছে। আর্থিক বিষয়ে তো তারও স্বাক্ষর লাগে। তার সৎ সাহস থাকলে প্রমাণ হওয়া অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করুক।’

 

প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজিং কমিটির আরেকজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘একজন শিক্ষক নেতা হয়েও তিনি কীভাবে এত টাকার মালিক হলেন, সেটাই প্রশ্ন। একাধিক বাড়ি আছে তার বিবির বাগিচার মতো জায়গায়। স্কুলের কাজ রেখে পরিচিত অন্য লোকজন নিয়ে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এভাবে একটা প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না।’

এদিকে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদককে বরখাস্ত করার প্রতিবাদে মানববন্ধনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি (বিটিএ)। মঙ্গলবার সারাদেশে মানববন্ধন করবেন শিক্ষকরা।

বিইউ/জেবি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর