- টার্মিনাল থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র—গ্যাসনির্ভরতার বিস্তার
- এলএনজি আমদানিতে বিশ্বব্যাংকের ৭০ কোটি ডলারের নিশ্চয়তা
- টার্মিনাল-পাইপলাইন-বিদ্যুৎকেন্দ্র—গ্যাসনির্ভরতার অবকাঠামো
- ‘মধ্যবর্তী’ সমাধান কি দীর্ঘমেয়াদি হচ্ছে?
- বিনিয়োগ বাড়ছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি কতটা এগোচ্ছে?
একসময় দেশের জ্বালানি সংকটের মূল কারণ ছিল গ্যাসের উৎপাদন ঘাটতি। এখন সেই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমদানি ব্যয়ের চাপ। দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে, বিপরীতে শিল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন খাতে বাড়ছে চাহিদা। ফলে ঘাটতি পূরণে বিদেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে।
এই আমদানিনির্ভরতা টিকিয়ে রাখতে শুধু এলএনজি টার্মিনাল, পাইপলাইন ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণেই বিনিয়োগ হচ্ছে না; গ্যাস কেনার অর্থ জোগাড় এবং সেই অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তা তৈরিতেও যুক্ত হচ্ছে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন। অর্থাৎ, গ্যাস আমদানির অবকাঠামোর পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে তার আর্থিক ভিত্তিও।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক গ্যাস সংকট সামাল দিতে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কি কেবল একটি সাময়িক আর্থিক সেতু তৈরি করছে, নাকি একই সঙ্গে এমন এক অবকাঠামোগত ও আর্থিক কাঠামো গড়ে তুলছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশকে আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর আরও নির্ভরশীল করে তুলতে পারে?
বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর গ্যাসব্যবস্থাকে দীর্ঘস্থায়ী করে তুলতে বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠীর ভূমিকা বিবেচনা করলে প্রশ্নটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশ্বব্যাংকের বেসরকারি খাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি এলএনজি আমদানি টার্মিনাল স্থাপনে অর্থায়ন ও প্রকল্প উন্নয়নে যুক্ত ছিল। একই প্রতিষ্ঠান গ্যাসভিত্তিক একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও অর্থায়ন করেছে।
অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইডিএ) ২০২৫ সালে পেট্রোবাংলার এলএনজি আমদানির অর্থায়নের জন্য ৩৫ কোটি মার্কিন ডলারের নিশ্চয়তা দেয়। ২০২৬ সালে অনুমোদিত হয় আরও ৩৫ কোটি মার্কিন ডলারের অতিরিক্ত নিশ্চয়তা। অর্থাৎ, দুই দফায় এই নিশ্চয়তার পরিমাণ দাঁড়ায় ৭০ কোটি মার্কিন ডলার। প্রথম নিশ্চয়তার আওতায় সাত বছরে সর্বোচ্চ ২১০ কোটি ডলার বেসরকারি মূলধন সংগ্রহের সুযোগ তৈরির কথা জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
বাংলাদেশের গ্যাস আমদানির পুরো শৃঙ্খলেই কম-বেশি এখন বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠীর উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। সেটা কোথাও আমদানিকৃত গ্যাস গ্রহণের অবকাঠামোতে, কোথাও সেই গ্যাস ব্যবহারকারী বিদ্যুৎকেন্দ্রে, আবার কোথাও গ্যাস কেনার অর্থ সংগ্রহ ও পরিশোধের নিশ্চয়তায়।
ফলে প্রশ্নটি শুধু গ্যাসের ঘাটতি কীভাবে মেটানো হবে, তা নয়। বরং আরও বড় প্রশ্ন হলো, সংকটের সমাধান করতে গিয়ে যে অর্থায়ন ও অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে, তা কি একই সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর গ্যাসব্যবস্থাকেও দীর্ঘস্থায়ী করে তুলছে?
টার্মিনাল দিয়ে শুরু, গ্যাস কেনার নিশ্চয়তায় বিস্তার
বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর গ্যাসব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোর একটি মহেশখালী ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল। আইএফসির প্রকল্প নথি অনুযায়ী, মহেশখালী ফ্লোটিং এলএনজি প্রকল্পটি (এফএসআরইউ) ছিল বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি মধ্যম পর্যায়ের এলএনজি অবকাঠামো প্রকল্প। প্রকল্পটির উন্নয়ন পর্যায়েই আইএফসি ইনফ্রাভেঞ্চারস ২০১৩ সালে যুক্ত হয় এবং এক্সিলারেট এনার্জি ও সরকারের মধ্যে প্রকল্প কাঠামো তৈরিতে সহায়তা করে। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে টার্মিনাল ব্যবহার ও বাস্তবায়ন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
আইএফসির নথিতে প্রকল্পটির মোট ব্যয় ছিল প্রায় ১৭ কোটি ৯৫ লাখ মার্কিন ডলার। এই বিপুল বিনিয়োগের জন্য তৈরি করা হয় ঋণ ও ইক্যুইটির সমন্বিত একতি অর্থায়ন কাঠামো। ২০১৭ সালের অর্থায়ন ঘোষণায় আইএফসি জানায়, তারা নিজস্ব হিসাবে ৩ কোটি ২৮ লাখ মার্কিন ডলার ঋণ দেয় এবং এক কোটি ৮ লাখ মার্কিন ডলার ইক্যুইটি বিনিয়োগ করেছে। একই সঙ্গে আইএফসি ১২ কোটি ৫৭ লাখ মার্কিন ডলারের ঋণ প্যাকেজেরও ব্যবস্থা করে, যার একটি অংশ আসে অন্যান্য উন্নয়ন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান থেকে।
আরও পড়ুন
দেশে গ্যাসের অভাব নেই, মূল ঘাটতি অনুসন্ধান ও উত্তোলনে
গ্যাসে সাময়িক স্বস্তি, ১৫০ কূপে কি কাটবে দীর্ঘমেয়াদি সংকট?
অর্থাৎ, প্রকল্পটিতে আইএফসির ভূমিকা শুধু নিজস্ব অর্থ বিনিয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নিজস্ব ঋণ ও ইক্যুইটির পাশাপাশি অন্যান্য উন্নয়ন অর্থায়নকারীদের মূলধনও একত্র করে পুরো অর্থায়ন কাঠামো দাঁড় করাতে আইএফসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
এলএনজি টার্মিনালটির সক্ষমতা ছিল প্রতিদিন ৫০ কোটি ঘনফুট (এমএমসিএফডি) এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন। আইএফসির প্রকল্প নথি অনুযায়ী, ১৫ বছরের কনসেশন শেষে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ও স্থায়ী অবকাঠামো পেট্রোবাংলার কাছে হস্তান্তরের কথা ছিল।
আইএফসির নথি অনুযায়ী, আমদানি করা এলএনজি দেশের বিদ্যুৎ, শিল্প ও অন্যান্য গ্রাহকের গ্যাস চাহিদা পূরণে সহায়তা করবে। নথিতে আরও বলা হয়, পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হলে প্রকল্পটি এমন পরিমাণ এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন করতে পারবে, যা দিয়ে প্রায় ৩,০০০ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর সমপরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। অর্থাৎ, এখানে আইএফসির ভূমিকা শুধু অর্থ দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রকল্পের উন্নয়ন, সরকারের সঙ্গে চুক্তি কাঠামো এবং অর্থায়ন সংগ্রহেও প্রতিষ্ঠানটি যুক্ত ছিল। এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ একটি এলএনজি টার্মিনাল কেবল একটি অবকাঠামো নয়। এটি দেশের গ্যাসব্যবস্থাকে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত করে। ফলে বাংলাদেশ আমদানি নির্ভরতার ফাঁদে আরও ধাবিত হচ্ছে।
গ্যাসের পথ ধরে শুরু, গ্যাস বিদ্যু্ৎকেন্দ্রের রমরমা ব্যবসা
এলএনজি আমদানির অবকাঠামো তৈরি হওয়ার পাশাপাশি আমদানি করা গ্যাস ব্যবহার করার সক্ষমতাও তৈরি হয়েছে। আইএফসির প্রকল্প তালিকায় বাংলাদেশের একাধিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে।
২০১৫ সালে ৩৪১ মেগাওয়াটের সামিট বিবিয়ানা-২ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সর্বোচ্চ ৮ কোটি ডলারের বিনিয়োগের অনুমোদন দেয় আইএফসি। এর মধ্যে ৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার ছিল ঋণ এবং ৫০ লাখ ডলার ইক্যুইটি ছিল। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৩০ কোটি মার্কিন ডলার।
এরপর ইউনাইটেড আশুগঞ্জ এনার্জির ১৯৫ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও ছিল আইএফসির বিনিয়োগ। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ছিল প্রায় ১৭ কোটি ডলার এবং আইএফসির অনুমোদিত বিনিয়োগ ছিল ৪ কোটি ৩৫ লাখ ডলার, যার মধ্যে ৪ কোটি ১০ লাখ ডলার ছিল ঋণ এবং ২৫ লাখ ডলারের ইক্যুইটি।
সিরাজগঞ্জেও ৪১৩.৮ মেগাওয়াটের একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আইএফসির অর্থায়নের পরিকল্পনা ছিল। আইএফসির নথি অনুসারে, সর্বোচ্চ ১১ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দেওয়ার কথা বিবেচনা করা হয়। প্রকল্পটির প্রাথমিক জ্বালানি হিসেবে নির্ধারিত ছিল প্রাকৃতিক গ্যাস এবং গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে হাইস্পিড ডিজেল ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। আইএফসির নথিতে প্রকল্পটির অনুমোদনের সময় ২০১৬ সালের জুন মাসে এবং বিনিয়োগের সময় ২০১৭ সালের আগস্টে দেখানো হয়েছে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়, সিরাজগঞ্জ প্রকল্পে গ্যাস সরবরাহের জন্য আলাদা গ্যাস পাইপলাইন এবং গ্যাস নিয়ন্ত্রণ ও পরিমাপ কেন্দ্রের ব্যবস্থাও ছিল। অর্থাৎ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবকাঠামোর সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের অবকাঠামোও একই পরিকল্পনার অংশ।
মেঘনাঘাটে ৫৯০ মেগাওয়াটের বেশি গ্যাসভিত্তিক সক্ষমতা
আইএফসির আরেকটি বড় বিনিয়োগ সামিট মেঘনাঘাট-২ বিদ্যুৎকেন্দ্র। আইএফসির নথি অনুযায়ী, প্রকল্পটির মোট ব্যয় প্রায় ৫০ কোটি ডলার এবং আইএফসির প্রস্তাবিত ঋণ ছিল ১২ কোটি ডলার। কেন্দ্রটির নেট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫৯০ মেগাওয়াট এবং মূল জ্বালানি নির্ধারিত ছিল রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি। গ্যাস সরবরাহে সমস্যা হলে ব্যাকআপ হিসেবে হাইস্পিড ডিজেল ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল।
প্রকল্পটির জন্য জাতীয় গ্যাস গ্রিড থেকে গ্যাস সরবরাহের পাইপলাইন নির্মাণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল। নতুন গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইনটি মেঘনাঘাটসহ ওই এলাকার অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রেও গ্যাস সরবরাহে ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছিল আইএফসি।
আরও পড়ুন
গ্যাস সংকটে থমকে শিল্পের চাকা, ৬ মাসে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় বড় প্রশ্ন
রেমিট্যান্স-রিজার্ভে স্বস্তি, জ্বালানি-মূল্যস্ফীতিতে বাড়ছে চাপ
এখানে একটি অর্থনৈতিক সম্পর্ক একদম স্পষ্ট। এলএনজি টার্মিনাল গ্যাস আমদানির পথ তৈরি করে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সেই গ্যাসের দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা তৈরি করে। আর এখন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার নিশ্চয়তা পেট্রোবাংলার গ্যাস কেনার অর্থ জোগাড়কেও সহজ করে দিচ্ছে।
তিনটি স্তর একই সময়ে শক্তিশালী হলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, এটি কি কেবল সংকট ব্যবস্থাপনা নাকি একটি পূর্ণাঙ্গ আমদানিনির্ভর গ্যাস অর্থনীতি গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া?
বিশ্বব্যাংকের ৭০ কোটি মার্কিন ডলারের নিশ্চয়তা
২০২৫ সালের ১৮ জুন বিশ্বব্যাংকের বোর্ড জ্বালানি খাতের নিরাপত্তা জোরদার প্রকল্পে ৩৫ কোটি মার্কিন ডলারের নিশ্চয়তা অনুমোদন করে। এটি সরাসরি গ্যাস কেনার জন্য দেওয়া কোনো অনুদান নয়। বরং আইডিএর নিশ্চয়তার মাধ্যমে সাত বছরে সর্বোচ্চ ২১০ কোটি মার্কিন ডলার বেসরকারি অর্থায়ন সংগ্রহের সুযোগ তৈরির কথা বলা হয়। এর লক্ষ্য পেট্রোবাংলার ঋণযোগ্যতা বাড়িয়ে এলএনজি আমদানির অর্থায়ন সহজ করা।
বিশ্বব্যাংক স্পষ্টভাবে বলেছে, এই নিশ্চয়তার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানির অর্থায়ন সহজ হবে এবং তুলনামূলক ব্যয়বহুল স্পট মার্কেট থেকে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আমদানি করা হলে বছরে প্রায় ৪০ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত পরোক্ষ আর্থিক সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
এরপর ২০২৬ সালের ১৫ মে, বিশ্বব্যাংক একই প্রকল্পে আরও ৩৫ কোটি ডলারের অতিরিক্ত নিশ্চয়তা অনুমোদন করে। এই অতিরিক্ত অর্থায়নের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়, পেট্রোবাংলার এলএনজি আমদানির মূল্য পরিশোধে সহায়তা করা এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে পূর্বানুমানযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা।
দুই দফায় ৭০ কোটি ডলারের নিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই অর্থ বাংলাদেশ সরকারের হাতে এলএনজি কেনার নগদ অর্থ হিসেবে যাচ্ছে না। এটি একটি আর্থিক নিশ্চয়তা কাঠামো, যার মাধ্যমে পেট্রোবাংলার জন্য এলএনজি আমদানির অর্থায়ন ও মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থা সহজ করা হচ্ছে। আমদানি করা গ্যাসকে সস্তা ও সহজলভ্য করা আর গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো-দুটি একই বিষয় নয়।
আইএফসির দ্বিমুখিতা নিয়ে প্রশ্ন
একদিকে আইএফসি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অর্থায়ন বাড়াচ্ছে। ২০২৫ সালে আইডকলের মাধ্যমে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে ১৫ কোটি ডলারের অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করেছে, যার লক্ষ্য সর্বোচ্চ ৩০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ। অন্যদিকে, একই আইএফসি এলএনজি টার্মিনাল ও একাধিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও অর্থায়নে যুক্ত।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আইএফসির অর্থায়ন কি জীবাশ্ম গ্যাসে তার বিনিয়োগের বিপরীত প্রভাব পুষিয়ে দিতে পারছে? আইএফসির জলবায়ু অর্থায়ন কি জীবাশ্ম গ্যাসে তার অর্থায়নের সমান্তরাল ক্ষতি পূরণ করার মতো পর্যায়ে আছে? আইএফসির যুক্তি ছিল, বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক জ্বালানি ঘাটতির বাস্তবতায় গ্যাস একটি প্রয়োজনীয় মধ্যবর্তী সমাধান।
তাহলে, ‘মধ্যবর্তী’ সমাধানটি টার্মিনাল, পাইপলাইন, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও দীর্ঘমেয়াদি আমদানি চুক্তির মাধ্যমে বহু বছর টিকে থাকলে সেটি আর কতটা মধ্যবর্তী?
গ্যাসের নিশ্চয়তা নাকি গ্যাসনির্ভর বিনিয়োগের নিশ্চয়তা
উন্নয়ন অর্থনীতি বিশ্লেষক মনোয়ার মোস্তফা মনে করেন, বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা যেখানে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ছি, সেখানে বিশ্বব্যাংক আরও বেশি আমাদের আমদানির দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করছে।’
নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা থাকলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়তে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্যাংকের বর্তমান অর্থায়ন কাঠামোতে এলএনজি আমদানির নিশ্চয়তা যতটা দৃশ্যমান, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় আকারের নিশ্চয়তা ও বিনিয়োগ ততটা দ্রুত এগোয়নি বলে দাবি করেন মনোয়ার।
এই বিশ্লেষক বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের স্ট্র্যাটেজি যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে এই দেশ আরও নির্ভরশীল হবে জীবাশ্ম গ্যাসের ওপর। সমস্যা শুধু অর্থের নয়, সরবরাহের নিরাপত্তারও। আন্তর্জাতিক বাজারে অর্থ থাকলেও সব সময় জ্বালানি পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।’
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং এলএনজি সরবরাহব্যবস্থার ওপর তার প্রভাবের কথা উল্লেখ করে মনোয়ার বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই ঝুঁকি আরও বড়।’ তার বক্তব্য, ‘এটাই হচ্ছে আমাদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’
গ্যাস আমদানির অর্থ সংগ্রহে বিশ্বব্যাংকের নিশ্চয়তা রয়েছে। এলএনজি অবকাঠামোয় আইএফসির অর্থায়ন রয়েছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও আইএফসির ঋণ রয়েছে। বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে আইএফসির নতুন উদ্যোগ থাকলেও সেটি মূলত একটি ৩০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত ছাদভিত্তিক সৌর পোর্টফোলিওর রিস্ক শেয়ারিং কাঠামো। প্রশ্ন হলো, গ্যাসনির্ভর ব্যবস্থার বিস্তার ঠেকাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সেই অর্থায়ন কি যথেষ্ট দ্রুত ও বড় পরিসরে হচ্ছে?
কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভাইরনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বাংলাদেশে ২০১৮-১৯ সালে প্রথম যখন এলএনজি আমদানি শুরু হয়, তখন প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ছিল প্রায় ৭ থেকে ৮ ডলার, পরে তা বেড়ে ১৩ ডলারে ওঠে। চলতি বছরে সেই দাম প্রথমে প্রায় ২০ ডলারে, এরপর ২৫ ডলারে এবং বর্তমানে প্রায় ৩০ ডলারে পৌঁছেছে।’
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘৩০ ডলার দরে যখন আমরা এক কার্গো এলএনজি কিনছি, তাতে বাংলাদেশের খরচ হচ্ছে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার। এই ১০০ মিলিয়ন ডলার সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ করা হলে প্রায় ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব। এর মাধ্যমে আগামী ২০ বছর বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যেতে পারে।’
মেহেদী বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল কত বেশি সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ করা যায়। কিন্তু এর পরিবর্তে ২০১৬ সালে আইএফসি এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে অর্থায়ন করেছে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার করে মোট ৭০০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে, যাতে বিদেশ থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক ঋণ নেওয়া যায়। বিশ্বব্যাংক বা আইএফসির অর্থায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি অগ্রাধিকার পাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন রয়েছে। বরং ঋণনির্ভর অর্থায়নের মাধ্যমে আমদানিনির্ভর গ্যাস, কয়লা ও তেলের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। হাসান মেহেদী এটিকে বৃহত্তর বৈশ্বিক জ্বালানি অর্থনীতির অংশ হিসেবে দেখছেন।
ভূতত্ত্ববিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. বদরূল ইমামের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান গ্যাস সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে ঘাটতি এবং পুরনো ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে আসার ফলে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে ভূপ্রাকৃতিক কারণে প্রচুর গ্যাস থাকার কথা। কারণ আমাদের ভূপ্রকৃতি পৃথিবীর গ্যাসসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর সঙ্গে অনেকটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু গ্যাস অনুসন্ধানে আমরা সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারিনি।’ তার বিশ্লেষণে, পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সময়মতো নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উৎপাদনে না আনা হলে একপর্যায়ে ঘাটতি তৈরি হয়। তিনি প্রশ্ন রাখেন, গ্যাস আমদানির নিশ্চয়তা তৈরিতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে, একই সময়ে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও বিকল্প জ্বালানির উন্নয়নে কতটা অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে? কারণ, গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান শুধু আমদানি বাড়ানোর মধ্যে নয়; বরং দেশীয় গ্যাসের নতুন উৎস অনুসন্ধান এবং বিকল্প জ্বালানির সক্ষমতা বাড়ানোর মধ্যেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিহিত।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এম. হেলাল আহম্মেদ জনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘দিন দিন আমাদের গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। ফলে আমাদের বিদ্যমান শিল্পকারখানা বন্ধ করে দেওয়া চলবে না। আমদানির ওপর নির্ভর হয়েও এগুলো সচল রাখতে হবে। কারণ এখানে শ্রমিক, উৎপাদন, রফতানি, সবকিছুই অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত।’ তবে তার উদ্বেগ হলো, সাময়িক আমদানি যেন স্থায়ী কাঠামোগত নির্ভরতায় পরিণত না হয়। তার মতে, গ্যাস আমদানির সঙ্গে দেশীয় অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির উন্নয়ন সমান্তরালে চলতে হবে।
বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির ঝুঁকি শুধু দামের নয়। বৈদেশিক মুদ্রা, গ্যাসের প্রাপ্যতা, সরবরাহ, জাহাজ চলাচল, টার্মিনাল ও পাইপলাইন সবকিছুই সচল থাকতে হয়। যেকোনো একটিতে বিঘ্ন ঘটলেই পুরো সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে।
তাই একটি এলএনজি টার্মিনাল মানেই শুধু অবকাঠামো নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিয়মিত আমদানি, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও অর্থের নিশ্চয়তা। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন এই পুরো ব্যবস্থাকে যত সহজ করে, আমদানিনির্ভরতার আর্থিক ভিত্তিও তত শক্ত হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের তথ্যপত্র অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এলএনজির দাম ও সরবরাহের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। এতে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ও সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
এই বাস্তবতায় বিশ্বব্যাংক দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি আমদানি করে ব্যয়বহুল খোলাবাজারের ওপর নির্ভরতা কমাতে চায়। তাদের হিসাবে, এতে পেট্রোবাংলা তুলনামূলক পূর্বানুমানযোগ্য দামে গ্যাস কিনতে পারবে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক জ্বালানি বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেসমের মতে, আমদানিনির্ভরতার কারণে আন্তর্জাতিক সংকটে বাংলাদেশের আর্থিক চাপ বাড়ছে; নির্ভরযোগ্য গ্যাস সরবরাহ বিদ্যুৎ, শিল্প ও কর্মসংস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ওলায়িংকা বিসিরিউ এদেবিরিও বলেছেন, তুলনামূলক কম ব্যয় ও কম নির্গমনের কারণে নিরবচ্ছিন্ন এলএনজি সরবরাহ বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত্তি হতে পারে। অর্থাৎ বিশ্বব্যাংকের দৃষ্টিতে এটি মূলত সংকট ব্যবস্থাপনা, আজকের গ্যাসের চাহিদা মেটানো এবং সরবরাহের ঝুঁকি কমানো।
কিন্তু এখানেই দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্নটি আসে। আইএফসি মহেশখালী এলএনজি টার্মিনাল ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়নে যুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেও অর্থায়নের পথ তৈরি করছে। তাহলে, এই অর্থায়ন কি সংকট সামলানোর পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতার কাঠামোকেও শক্ত করছে?
বর্তমান বাস্তবতায় শিল্প ও বিদ্যুৎ চালু রাখতে এলএনজি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ সীমিত। তবে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ না বাড়ালে এই অস্থায়ী নির্ভরতা স্থায়ী হতে পারে। এখানে সময়ের পার্থক্যটিই গুরুত্বপূর্ণ। এক কার্গো এলএনজি একবারে ব্যবহার হয়ে যায়, কিন্তু একটি টার্মিনাল, পাইপলাইন বা গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তো বহু বছর টিকে থাকে। তার সঙ্গে যুক্ত থেকে মিলিয়ন-বিলিয়নের ঋণ, চুক্তি ও বিনিয়োগ। বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠীর অর্থায়ন বাংলাদেশকে আমদানিনির্ভরতা থেকে বের হওয়ার সেতু তৈরি করছে, নাকি সেই নির্ভরতাকেই আরও দীর্ঘস্থায়ী করছে- সেই প্রশ্ন এখন উঠছে জোরালোভাবে।
এমআর/জেবি




