বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

দেশে গ্যাসের অভাব নেই, মূল ঘাটতি অনুসন্ধান ও উত্তোলনে

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪২ পিএম

শেয়ার করুন:

দেশে গ্যাসের অভাব নেই, মূল ঘাটতি অনুসন্ধান ও উত্তোলনে
ছবি: ঢাকা মেইল গ্রাফিক্স

দেশে একদিকে গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে ভূ-অভ্যন্তরে থাকা সম্ভাবনাময় গ্যাসসম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনে দীর্ঘদিন ধরে কাঙ্ক্ষিত উদ্যোগ নেই। ফলে নিজস্ব গ্যাসের মজুত থাকা সত্ত্বেও ক্রমেই বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা। বিশেষ করে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে দেশের জ্বালানি খাত।

প্রখ্যাত ভূতত্ত্ববিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. বদরূল ইমামের মতে, বাংলাদেশের গ্যাস সংকট মূলত সম্পদের অভাবে নয়, বরং পর্যাপ্ত অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ঘাটতির কারণে তৈরি হয়েছে। তার ভাষায়, বাংলাদেশের ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য গ্যাসের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। পূর্বাঞ্চলে অল্প অনুসন্ধানেই বিপুল গ্যাস পাওয়া গেছে। বঙ্গোপসাগরও এখনো অনেকটাই অনাবিষ্কৃত। ফলে ধারাবাহিক ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান চালানো গেলে দেশে গ্যাসের সংকট অনেকটাই দূর করা সম্ভব।

অধ্যাপক ড. বদরূল ইমাম দেশের অন্যতম পরিচিত ভূতত্ত্ববিদ ও পেট্রোলিয়াম ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ। তিনি দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনারারি অধ্যাপক হিসেবে যুক্ত আছেন। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করা এই ভূতত্ত্ববিদ কানাডা ও সৌদি আরবের বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষকতা করেছেন। বাংলাদেশের গ্যাস ও জ্বালানি সম্পদের সম্ভাবনা, অনুসন্ধান ও উত্তোলন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা ও লেখালেখি করছেন তিনি।

চলমান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের কারণ, দেশে গ্যাসের সম্ভাবনা, অনুসন্ধানের ঘাটতি, এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা এবং সরকার ঘোষিত ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা বলেছেন অধ্যাপক ড. বদরূল ইমাম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ঢাকা মেইলের নিজস্ব প্রতিবেদক মহিউদ্দিন রাব্বানি। ছবি তুলেছেন আলোকচিত্রী শামীম হোসেন।

ঢাকা মেইল: বর্তমানে দেশে যে গ্যাস সংকট চলছে, এর মূল কারণ কী?

BBBঅধ্যাপক ড. বদরূল ইমাম: গ্যাসের সংকটটা হঠাৎ করে আসেনি। এটি দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি ধারাবাহিক কার্যক্রমের ফল। বাংলাদেশে ভূপ্রাকৃতিক কারণে প্রচুর গ্যাস থাকার কথা। কারণ আমাদের ভূপ্রকৃতি পৃথিবীর গ্যাসসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর সঙ্গে অনেকটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন, দুটো ক্ষেত্রেই আমাদের ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে পারলে আমাদের গ্যাসের কোনো অভাব থাকবে না।

ঢাকা মেইল: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কোথায়?

অধ্যাপক বদরূল ইমাম: আমাদের প্রধান দুর্বলতা হচ্ছে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান কার্যক্রম না হওয়া। ফলে আমাদের যে সম্ভাবনা রয়েছে, তার কাছে আমরা পৌঁছাতে পারছি না এবং প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস উত্তোলনও করতে পারছি না।

নাইজেরিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার মতো বিশ্বের বিভিন্ন বড় বদ্বীপ অঞ্চলে প্রচুর গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের বদ্বীপ এলাকাতেও একই ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সম্ভাবনা থাকলেই হবে না, সেটিকে কাজে লাগাতে কার্যকর অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম চালাতে হবে।

ঢাকা মেইল: তাহলে অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ক্ষেত্রে আমরা এত ধীরগতিতে এগোচ্ছি কেন? আমদানিনির্ভরতার দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণ কী?

অধ্যাপক বদরূল ইমাম: আমাদের দেশে নিজস্ব সম্পদ আহরণের উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। এটাকে এক ধরনের জাতীয় মানসিকতার ঘাটতিও বলা যায়। স্বনির্ভর হতে হলে নিজেদের সম্পদ নিজেদের উদ্যোগে কাজে লাগাতে হবে।

পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রমে যে ঘাটতি রয়েছে, সেটির কারণেই আমরা পিছিয়ে আছি। বাইরে থেকে গ্যাস আমদানি করা সহজ মনে হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি কোনো সমাধান নয়।

ঢাকা মেইল: বদ্বীপ এলাকায় গ্যাসের সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি থাকে কেন?

অধ্যাপক বদরূল ইমাম: এটি মূলত প্রাকৃতিক ও ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার কারণে। নদীর মাধ্যমে বয়ে আসা বিপুল পরিমাণ পলি, উদ্ভিদ ও অন্যান্য জীবজৈবিক পদার্থ দীর্ঘ সময় ধরে ভূগর্ভে জমা হয়। পরে তাপ ও চাপের প্রভাবে এসব জৈব পদার্থ থেকে গ্যাস তৈরি হয়।

বাংলাদেশ একটি বিশাল বদ্বীপ অঞ্চল। তাই বৈজ্ঞানিকভাবে এখানে গ্যাসের সম্ভাবনা ব্যাপক। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে ধারাবাহিক অনুসন্ধান করতে হবে।

ঢাকা মেইল: পুরনো গ্যাসকূপগুলোর উৎপাদন কমে যাচ্ছে। একই সময়ে এলএনজি আমদানি বাড়ছে। এই মডেল কি টেকসই?

অধ্যাপক বদরূল ইমাম: এটা কখনোই টেকসই মডেল নয়। আমদানির ওপর নির্ভর করলে দেশের বাজেটের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে। মাটির নিচে নিজস্ব গ্যাস রেখে বাইরে থেকে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে এমন ব্যক্তিবর্গ থাকা প্রয়োজন, যারা দেশের নিজস্ব সম্পদ আহরণ করে জ্বালানি খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন।

ঢাকা মেইল: ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সেটি কতটা বাস্তবসম্মত বলে মনে করেন?

অধ্যাপক বদরূল ইমাম: পাঁচ বছরে ১৫০টি কূপ খনন করতে হলে বছরে গড়ে ৩০টি করে কূপ খনন করতে হবে। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসে বছরে মাত্র চার-পাঁচটি কূপ খনন করা হয়েছে। সেখানে বছরে ৩০টি কূপ খননের কথা বলা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। এটি রাজনৈতিক বক্তব্য বা রেটরিক। বাস্তবতা না বুঝে এমন ঘোষণা দেওয়ার চেয়ে বাস্তবধর্মী বক্তব্য দেওয়াই বেশি যৌক্তিক।

ঢাকা মেইল: যেসব গ্যাসক্ষেত্রে ওয়ার্কওভার করা হয়েছে, সেগুলোতে কি নতুন করে অনুসন্ধান বা যাচাইয়ের সুযোগ রয়েছে?

অধ্যাপক বদরূল ইমাম: এটি নির্ভর করবে ওই কূপে এখনো কী পরিমাণ গ্যাস অবশিষ্ট রয়েছে তার ওপর। যদি কূপটি সম্পূর্ণভাবে নিঃশেষিত বা ডিপ্লিটেড হয়ে যায়, তাহলে সেখানে নতুন কূপ খনন করে খুব বেশি লাভ হবে না। কিন্তু যদি গ্যাসের মজুত অবশিষ্ট থাকে, তাহলে সেটি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

ঢাকা মেইল: দেশের স্থলভাগ এবং বঙ্গোপসাগরে নতুন গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা কেমন দেখছেন?

অধ্যাপক বদরূল ইমাম: দেশের পূর্বাঞ্চলে অল্প অনুসন্ধানেই প্রচুর গ্যাস পাওয়া গেছে। সেখানে আরও বিস্তৃত ও পরিকল্পিত অনুসন্ধান চালালে বড় ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে। বদ্বীপ এলাকা কখনো পুরোপুরি ‘ড্রাই’ হয়ে যায় না। তাই ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধান ও কূপ খনন চালিয়ে যেতে হবে। অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর এখনো অনেকটাই অনাবিষ্কৃত। সেখানে আমাদের অনুসন্ধানের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। অসম্পূর্ণ কাজগুলোকে সঠিক ড্রিলিংয়ের মাধ্যমে ত্বরান্বিত করা গেলে বঙ্গোপসাগরেও গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ঢাকা মেইল: দেশে গ্যাস অনুসন্ধানে অগ্রগতি না হওয়ার মূল বাধা কোথায় বলে মনে করেন?

অধ্যাপক বদরূল ইমাম: সরকারি নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে সঠিক অনুধাবন ও ড্রাইভের ঘাটতি রয়েছে। কোথায় কী পরিমাণ সম্ভাবনা রয়েছে, সে বিষয়ে একটি পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার। সেই অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। শুধু ঘোষণা দিলে হবে না। অনুসন্ধান, ড্রিলিং, তথ্য বিশ্লেষণ এবং উত্তোলনের পুরো প্রক্রিয়াকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।

ঢাকা মেইল: এভাবে গ্যাস সংকট চলতে থাকলে আগামী ১০ বছরে এর পরিণতি কী হতে পারে?

অধ্যাপক বদরূল ইমাম: বিশ্বে জ্বালানির দাম ও চাহিদা দুটোই ঊর্ধ্বমুখী। বাংলাদেশও শিল্পায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে আগামী দিনে গ্যাসের চাহিদা আরও বাড়বে। দেশীয় গ্যাস সহজলভ্য করা না গেলে সংকট আরও তীব্র হবে। শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব পড়বে। তাই এখন থেকেই দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে গুরুত্ব দিতে হবে।

ঢাকা মেইল: এ অবস্থায় নীতি নির্ধারকদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?

অধ্যাপক বদরূল ইমাম: প্রথমেই তাদের বুঝতে হবে, বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় গ্যাসসমৃদ্ধ এলাকা। এখানে পর্যাপ্ত ড্রিলিং ও অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে হবে। দেশের ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতা এবং অনুসন্ধানের তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দেশীয় ভূতাত্ত্বিক ও বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে তথ্য ও পরামর্শ নিয়ে সঠিক নীতি গ্রহণ করা উচিত। নিজেদের সম্পদ সম্পর্কে সঠিক ধারণা নিয়ে এগোতে পারলে জ্বালানি নিরাপত্তা অনেক শক্তিশালী করা সম্ভব।

ঢাকা মেইল: আপনাদের মতো গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে সরকার নিয়মিত পরামর্শ নেয় কি? আর গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থায় কোনো দুর্বলতা রয়েছে কি?

অধ্যাপক বদরূল ইমাম: সরকার চাইলে আমরা অবশ্যই পরামর্শ দিই। বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে তথ্য ও মতামত নিয়ে নীতি নির্ধারণ করা হলে তা আরও কার্যকর হতে পারে। আর বিতরণ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে দিনের বেলায় গৃহস্থালি ও শিল্পকারখানায় গ্যাসের ব্যবহার বেশি থাকায় লাইনে চাপ কম থাকে। গভীর রাতে ব্যবহার কমে গেলে লাইনে গ্যাস জমা হয়ে চাপ বেড়ে যায়। তাই সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থার বিষয়টিও সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এমআর/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর