বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬, ঢাকা

তেলের পর বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে নতুন চাপে ভোক্তা

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ০৪ জুন ২০২৬, ১১:৪৪ এএম

শেয়ার করুন:

Elec
ছবি এআই দিয়ে বানানো

# দুর্নীতি, সিস্টেম লস ও অব্যবস্থাপনার দায় ভোক্তাদের ওপর
# মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি আরও বাড়াবে
# সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা কাটতে না কাটতেই দেশে পাইকারি ও গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দামও বাড়িয়েছে সরকার। নতুন মূল্যহার চলতি মাস থেকেই কার্যকর হওয়ায় শিল্প, ব্যবসা, কৃষি ও আবাসিক খাতে ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। 


বিজ্ঞাপন


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে। বিশেষ করে স্থির আয়ের মানুষ, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি কখনোই কেবল একটি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব উৎপাদন, পরিবহন, কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, সেবা খাত থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধির পাশাপাশি পণ্য ও সেবার দামও বাড়তে পারে।

কত বাড়ল বিদ্যুতের দাম

বুধবার (৩ জুন) ঘোষিত নতুন মূল্যহার অনুযায়ী, গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় মূল্য ১ টাকা ৫২ পয়সা বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ। বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকের ক্ষেত্রে খুচরা মূল্য ১৫ থেকে ১৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন মাশুলও ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে।


বিজ্ঞাপন


বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সূত্র বলছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তবে ভোক্তা সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মনে করেন, ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং পরিকল্পনাগত দুর্বলতাই দায়ী।

মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব ও গণশুনানি

গত ৩ থেকে ৬ মে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণকারী সংস্থাগুলো বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা মূল্য এবং সঞ্চালন মাশুল বৃদ্ধির আবেদন করে। পরে ২০ ও ২১ মে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সংগঠন, শিল্পোদ্যোক্তা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং ভোক্তা অধিকারকর্মীরা মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন।

তাদের বক্তব্য ছিল, বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি, সিস্টেম লস, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এবং ক্যাপাসিটি চার্জের দায় সাধারণ গ্রাহকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। বরং এসব খাত সংস্কার করে ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

প্রস্তাব অনুযায়ী, পিডিবি ইউনিটপ্রতি ৮৫ পয়সা, আরইবি ১ টাকা ৭৭ পয়সা, ডিপিডিসি ১ টাকা ৫৪ পয়সা, ডেসকো ১ টাকা ৯৮ পয়সা, ওজোপাডিকো ১ টাকা ৩৯ পয়সা এবং নেসকো ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধির আবেদন করেছিল।

তেলের পর নতুন ধাক্কা

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির মাত্র কয়েকদিন আগে সরকার ডিজেল ছাড়া কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা বাড়িয়ে দেয়। বর্তমানে অকটেনের দাম ১৪৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা প্রতি লিটার বিক্রি হচ্ছে। যদিও ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, তবুও অন্যান্য জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে কৃষিপণ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, নির্মাণসামগ্রীসহ প্রায় সব ধরনের পণ্যের বাজারে এর প্রভাব পড়বে। এর মধ্যে আবার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।

ভোক্তাদের উদ্বেগ

রাজধানীর মুগদা এলাকার বাসিন্দা সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘বাজারে নিত্যপণ্যের দাম এমনিতেই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো মাস শেষে হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়বে, তার প্রভাব বাজারে পড়বে। এর মধ্যে বিদ্যুতের বিলও বেড়ে গেল। এখনো তো সংসারের খরচ আরও বেড়ে যাবে।’

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী জোসনা আহমেদ জবা ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো সাধারণ মানুষের জন্য বড় ধরনের চাপ। কয়েকদিন আগে তেলের দাম বেড়েছে, এখন বিদ্যুতের দামও বাড়ল। এটি যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। অনেক এলাকায় এখনো নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে। সেবার মান না বাড়িয়ে শুধু দাম বাড়ানো মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।’

বেসরকারি চাকরিজীবী রাহনুমা আলম বলেন, নির্দিষ্ট আয়ের মানুষদের জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি কষ্টের। আমরা এমনিতেই খরচ সামলাতে পারছি না। তেলের দাম বাড়লে বাসাভাড়া, পরিবহন ব্যয় ও পণ্যের দাম বাড়ে। এখন বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা আরও দাম বাড়ানোর সুযোগ পাবে।’

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেনি। কমিশন ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা করছে।’

তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানি হলেও দাম কমানোর প্রস্তাব নিয়ে কখনো গণশুনানি হয় না কেন? জনগণের পক্ষ থেকে ব্যয় কমিয়ে মূল্য কমানোর বিভিন্ন প্রস্তাব দেওয়া হলেও সেগুলো গুরুত্ব পায় না। বরং ব্যয় বৃদ্ধির যুক্তিগুলোই বেশি গুরুত্ব পায়।’

তার মতে, ‘বিদ্যুৎ খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি ও অপচয় কমানো এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা গেলে গ্রাহকদের ওপর নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির চাপ সৃষ্টি করার প্রয়োজন হতো না।’

মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘জ্বালানি খাত অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। ফলে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব ভোক্তাদের ওপর এসে পড়ে।’

তিনি বলেন, ‘নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অল্প সময়ের মধ্যেই বিদ্যুৎ, এলপিজি, কেরোসিন ও অন্যান্য জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত শিল্প উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষের জন্য উদ্বেগের বিষয়। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।’

তার অভিযোগ, ‘বিদ্যুতের মূল্য পুনর্র্নিধারণের সময় দুর্নীতি, অনিয়ম, সিস্টেম লস ও ক্যাপাসিটি চার্জ কমানোর বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের দাবি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। ফলে ব্যয়ের দায় শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদের কাঁধেই চাপানো হয়েছে।’

নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশ সাধারণ নাগরিক সমাজ বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে জনস্বার্থবিরোধী উল্লেখ করে তা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটির আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘গণশুনানিতে ভোক্তা ও নাগরিকদের আপত্তি উপেক্ষা করেই মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’

তার ভাষায়, ‘গণশুনানির মাত্র কয়েক কার্যদিবসের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রমাণ করে, জনগণের মতামতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটেনি। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে।’

অন্যদিকে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে অবিলম্বে বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। তার মতে, ‘দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের জীবন যখন দুর্বিষহ, তখন বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর নতুন বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে।’

বিইআরসির ব্যাখ্যা

সমালোচনার মুখে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, সবকিছু যাচাই-বাছাই করেই কমিশন নতুন মূল্যহার নির্ধারণ করেছে। তার তথ্য অনুযায়ী, পাইকারি বিদ্যুতের গড় মূল্য ইউনিটপ্রতি ৭ টাকা থেকে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। এতে প্রায় ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আসবে। তারপরও সরকারকে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।

তিনি আরও জানান, সরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর রেট অব রিটার্ন ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদন বাড়লে ভবিষ্যতে বিদ্যুতের দাম কমানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।

সবচেয়ে চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত

সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি তেলের পর বিদ্যুতের দামও বাড়ায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাবে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার। বিদ্যুতের বিল বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে।

তাই অনেকের প্রশ্ন, বিদ্যুৎ খাতের সংস্কার, অপচয় রোধ ও সুশাসন নিশ্চিত না করে বারবার মূল্যবৃদ্ধির পথ বেছে নেওয়া কতটা যৌক্তিক। কারণ শেষ পর্যন্ত বিদ্যুতের দামবৃদ্ধির বোঝা গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের কাঁধেই পড়ে, যারা ইতোমধ্যেই ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের চাপে ন্যুব্জ।

এমআর/এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর