মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬, ঢাকা

সংকটের অর্থনীতিতে স্বপ্নের বাজেট, হিসাব মিলবে তো?

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ০২ জুন ২০২৬, ০৮:৩০ পিএম

শেয়ার করুন:

budget
আগামী সপ্তাহেই দেওয়া হবে নতুন বাজেট। ছবি: এআই
  • বাজেট বেড়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা
  • বাজেটে সম্ভাব্য ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি
  • ঘাটতি মেটাতে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা
  • ৩ লাখ কোটি টাকার রেকর্ড এডিপি অনুমোদন
  • সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বাড়ছে বরাদ্দের পরিমাণ
  • ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা
  • মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ

দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট দিতে যাচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট শুধু নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক পরিকল্পনাই নয়, নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেরও প্রথম বড় পরীক্ষা। তবে উচ্চাভিলাষী এই বাজেটের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- অর্থ কোথায়?


বিজ্ঞাপন


সরকার যখন আগামী অর্থবছরের জন্য বড় বাজেটের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, ব্যাংক খাতের চাপ, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বাড়তি বোঝা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির মতো চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ফলে অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন, বড় বাজেট কি বাস্তবায়নযোগ্য হবে, নাকি এটি শেষ পর্যন্ত কাগুজে পরিকল্পনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সম্ভাব্য বাজেটের আকার ধরা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেট ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাজেটের আকার বাড়ছে প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা।

কিন্তু আয়-ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই বাজেটের বড় অংশই নির্ভর করছে ঋণের ওপর। সরকারের মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে ঘাটতি থাকছে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ জোগাড় করতে সরকারকে দেশীয় ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি বলেন, আওয়ামী লীগের ১৫ বছর ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শেষে আমরা একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছি। সেই অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের প্রতিফলন থাকবে আগামী বাজেটে।

সরকারের দাবি, এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য হবে অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ উৎসাহিত করা। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, লক্ষ্য যত বড়ই হোক, বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী রাজস্ব ভিত্তি, যা এখনো দুর্বল।

রাজস্ব আদায়ের চ্যালেঞ্জ

আগামী অর্থবছরে এনবিআরের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। কিন্তু চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই রাজস্ব ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

আরও পড়ুন

বাজেটে ‘বৈদেশিক ঋণে’ রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে সরকার

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি ও ব্যবসায়ী আবুল কাসেম খান মনে করেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে।

Budget3

এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, মানুষের আয় কমেছে, নতুন করদাতা তৈরি হয়নি। যারা কর দেন, তারাই কর দিচ্ছেন। ফলে শুধু লক্ষ্য বাড়ালেই হবে না, অর্থনীতিকে আরও উন্মুক্ত ও বিনিয়োগবান্ধব করতে হবে।

রাজস্ব খাত বিশ্লেষক ও এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে এই বিশাল রাজস্ব লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। করভিত্তি সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ এবং ডিজিটাল নজরদারি জোরদার না করলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না।

সরকারও করজাল সম্প্রসারণে জোর দিচ্ছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, করের আওতায় থাকা এবং আওতার বাইরে থাকা সবার কাছ থেকেই কর আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ভ্যাট অব্যাহতি কমানো, উৎসে কর বাড়ানো এবং নতুন কিছু খাতে কর আরোপের বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।

ঋণের বোঝা বাড়ছেই

অর্থনীতির আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা ঋণের চাপ। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী অর্থবছরে শুধু সুদ পরিশোধেই ব্যয় হতে পারে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা।

এর পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে ব্যয় হবে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। ফলে উন্নয়ন বা সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় করার আগেই সরকারের বড় অঙ্কের অর্থ চলে যাবে পুরোনো দায় মেটাতে।

আরও পড়ুন

আগামী অর্থবছরের জন‍্য একটি ‘ডামি বাজেট’ প্রস্তাবনা

বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে নেওয়া হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা বেসরকারি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

উন্নয়ন ব্যয়ের রেকর্ড পরিকল্পনা

ঋণের চাপ সত্ত্বেও উন্নয়ন ব্যয় কমাচ্ছে না সরকার। আগামী অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

পরিবহন, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জ্বালানি, কৃষি, জলবায়ু সহনশীলতা এবং গ্রামীণ উন্নয়ন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মতে, উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো ছাড়া প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব নয়।

তবে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, শুধু বড় বরাদ্দ দিলেই হবে না। তিনি বলেন, বাজেটের আকার নয়, বাস্তবায়ন সক্ষমতাই গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো প্রকল্প শেষ হচ্ছে কি না, প্রকল্প ব্যয় যৌক্তিক থাকছে কি না এবং বরাদ্দকৃত অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, সেটিই দেখতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই বড় উন্নয়ন বাজেট ঘোষণা করা হয়। কিন্তু অর্থবছর শেষে দেখা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং বরাদ্দের অর্থ খরচে অক্ষমতা রয়ে গেছে।

সামাজিক নিরাপত্তা বনাম মূল্যস্ফীতি

নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। নতুন বাজেটে এ খাতে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে।

বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড এবং বিভিন্ন নগদ সহায়তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো হতে পারে।

সরকারের ধারণা, এসব কর্মসূচি নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়াবে।

কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য কমাতে হলে শুধু ভাতা নয়, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।

এদিকে মূল্যস্ফীতি এখনো সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের বেশি। চাল, ডাল, তেল, চিনি, মাছ ও মাংসের উচ্চমূল্যের কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি চাপে রয়েছে।

সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং ডলারের উচ্চমূল্য সেই লক্ষ্য অর্জনকে কঠিন করে তুলছে।

আইএমএফের চাপ ও সংস্কারের প্রশ্ন

আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশকে রাজস্ব বাড়ানো, ভর্তুকি যৌক্তিক করা, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার মতো সংস্কার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে।

Budget2

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, সরকার এক ধরনের চতুর্মুখী চাপের মধ্যে রয়েছে। তিনি বলেন, একদিকে অমীমাংসিত কাঠামোগত সংস্কার, অন্যদিকে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, আইএমএফের শর্ত এবং জনগণের প্রত্যাশা। এই বাস্তবতায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। তার মতে, সরকারের রাজস্ব ও উন্নয়ন ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন নিয়েও যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।

প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মাঝখানে বাজেট

বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট তাই শুধু আয়-ব্যয়ের একটি দলিল নয়, বরং নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার একটি বড় পরীক্ষা। একদিকে রয়েছে কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি। অন্যদিকে রয়েছে রাজস্ব ঘাটতি, ঋণের চাপ, মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সংস্কার দাবি।

আরও পড়ুন

‘করের চাপে বিনিয়োগ থমকে গেছে, ব্যবসায়ীরা টিকে থাকার লড়াই করছেন’

ফলে আগামী বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে এর আকারের ওপর নয়, বরং সরকার কতটা দক্ষতার সঙ্গে রাজস্ব আদায় করতে পারে, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে, তার ওপর। দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট শেষ পর্যন্ত অর্থনীতিকে গতি দেবে, নাকি রাজস্ব ও ঋণের চাপে নতুন প্রশ্নের জন্ম দেবে, তার উত্তর মিলবে আগামী অর্থবছরের বাস্তবায়ন পর্বেই।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট জনবান্ধব, ব্যবসাবান্ধব ও বিনিয়োগমুখী হবে। দেশে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য দূর করে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে। আগামী বাজেটে ব্যবসার ক্ষেত্রে নীতি ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং অবহেলিত অঞ্চলের শিল্প উৎপাদনে বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হবে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বন্দর জ্বালানি ও পরিবহন খাতে অব্যবস্থাপনার কারণেই উৎপাদন খরচ বেড়েছে, যা শিল্পপাতকে আরও চাপে ফেলবে। তাই এ ধরনের উচ্চবিলাসী এই বাজেট বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে তা উল্টো অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়তে পারে, সামগ্রিকভাবে মুদ্রা বাজারে অস্তিত্ব তৈরি করতে পারবে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স এন্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা চাই ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব বাজেট। সরকার কর বাড়াতে চাইলে করদাতার সংখ্যা বাড়াতে হবে। নতুবা যারা দিচ্ছে তাদের ওপর চাপটা বেড়ে যায়।

এমআর/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর