খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) তীব্র সমালোচনা করেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম। তিনি বলেছেন, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিইআরসি তার আইনি দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেনি। বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার নির্ধারণের মধ্য দিয়ে কমিশনের সেই ব্যর্থতা আবারও প্রকাশ পেয়েছে।
বুধবার (৩ জুন) বিইআরসি কর্তৃক গ্রাহক ও পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে মুঠোফোনে শামসুল আলম ঢাকা মেইলকে তার প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্ত করেন।
বিজ্ঞাপন
ড. আলম বলেন, বিইআরসিতে দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক ধরে তিনি জনস্বার্থে গণশুনানিতে অংশ নিয়েছেন, সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির করেছেন, লেখালেখি করেছেন এবং আদালতে মামলাও করেছেন। তার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল প্রতিষ্ঠানটিকে একটি আদর্শ নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলা এবং দেশে রেগুলেটরি সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো। তিনি জানান, সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু উদ্যোগ তাকে আশাবাদী করেছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই প্রত্যাশা ভেঙে গেছে।
তার ভাষ্য, যেখানে রেগুলেটরি সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, সেখানে বিইআরসি আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিয়েছে। জনগণের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের যে নীতি একটি নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের মূল ভিত্তি হওয়ার কথা, বাস্তবে তা উপেক্ষিত হচ্ছে। সংবিধান ও আইন জনগণের অভিপ্রায়কে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বললেও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তে জনগণের মতামত ও স্বার্থকে উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন ড. আলম।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা আলমের মতে, সরকার কোনো বিষয়ে ভুল অবস্থান নিলে জনগণের দায়িত্ব সেই অবস্থান পরিবর্তনের দাবি তোলা। তিনি বলেন, ইতিহাসে জনগণের আন্দোলন ও সচেতনতার কারণেই অনেক স্বৈরশাসক বা জনবিচ্ছিন্ন সরকারের পতন ঘটেছে। তাই সরকার কোনো বিষয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিলে নাগরিকদেরও নীরব থাকা উচিত নয়।
শামসুল আলম প্রশ্ন তোলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানি হলেও দাম কমানোর প্রস্তাব নিয়ে কখনো গণশুনানি হয় না কেন। তার দাবি, জনগণের পক্ষ থেকে বারবার ব্যয় কমিয়ে মূল্য কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হলেও সেগুলো গুরুত্ব পায় না। বরং ব্যয় বৃদ্ধির নানা যুক্তি সামনে এনে মূল্যবৃদ্ধির পথ সুগম করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এই ব্যয়বৃদ্ধিকে তিনি ‘লুণ্ঠনমূলক ব্যয়’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বিজ্ঞাপন
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ডিন শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে এমন কিছু নীতি ও কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য অস্বাভাবিক মুনাফার সুযোগ সৃষ্টি করছে। এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জনগণ আদালতে যাচ্ছে, আইন চ্যালেঞ্জ করছে, কিন্তু তারপরও বিইআরসি সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে না। জ্বালানি নিরাপত্তা, জ্বালানি অধিকার এবং জ্বালানি সুবিচার নিশ্চিত করার যে দায়িত্ব কমিশনের ওপর অর্পিত, সেটিও তারা পালন করছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
কঠোর ভাষায় শামসুল আলম বলেন, জনগণের অধিকার রক্ষার পরিবর্তে যদি কোনো প্রতিষ্ঠান বারবার সেই অধিকার খর্ব করে, তাহলে সেটি জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিইআরসি একটি ‘অপরাধী প্রতিষ্ঠানে’ পরিণত হয়েছে। গণশুনানিতেও তিনি সতর্ক করে দিয়েছিলেন, কমিশন যদি নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা না করে এবং জনগণের স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত নিতে থাকে, তাহলে জনগণের কাছে তারা ‘গণশত্রু’ হিসেবে বিবেচিত হবে। বিদ্যুতের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কমিশন সেই অবস্থানকেই আরও শক্তিশালী করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারের ঘোষিত ভর্তুকির বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ করেন ড. আলম। তিনি বলেন, সরকার ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার কথা বলছে, কিন্তু সেই অর্থও শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছ থেকেই আসে। এর পরও কেন বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হলো, সে প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। তার দাবি, বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় সঞ্চালন ও বিতরণ পর্যায়ে মুনাফা এবং করের বোঝা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। সরকার যদি মুনাফাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে আসে, তাহলে বিদ্যুতের দাম কমানো সম্ভব।
শামসুল আলম বলেন, বিইআরসির উচিত ছিল সরকারকে আইন সংশোধনের পরামর্শ দেওয়া, যাতে জনগণও ব্যয় কমিয়ে মূল্যহার কমানোর প্রস্তাব আনতে পারে এবং সেসব প্রস্তাবও গণশুনানির আওতায় আসে। যুক্তিসংগত ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো প্রস্তাব থাকলে সেটি কার্যকর করার সুযোগ থাকা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
বিইআরসির জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রসঙ্গে শামসুল আলম বলেন, কমিশন যদি আইনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয় বা সেগুলোকে বাধাগ্রস্ত করে, তাহলে বিইআরসি আইনের ১১ ধারার আওতায় রাষ্ট্রপতি প্রক্রিয়াগতভাবে কমিশনকে অপসারণ করতে পারেন। তিনি জানান, এ বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ইতোমধ্যে আবেদন করেছে।
তবে তার মতে, সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হলো নিয়মতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা। জনগণের চাপ বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পদত্যাগের ঘটনাও ঘটতে পারে, কিন্তু আইনি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও শক্তিশালী হয়। অন্যদিকে অস্বাভাবিক বা অনিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সংকটের সমাধান হলে রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই তিনি জ্বালানি খাতে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং প্রকৃত রেগুলেটরি সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এমআর/ক.ম




