শনিবার, ৯ মে, ২০২৬, ঢাকা

হাজার কোটি টাকার ফসলহানি, খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়ার শঙ্কা

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ০৯ মে ২০২৬, ০৭:০০ এএম

শেয়ার করুন:

PADDY NEWS DHAKAMAIL
হাওরাঞ্চলে এবারের বোরো মৌসুম যেন কৃষকের জন্য এক দীর্ঘ দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছে। ছবি: ঢাকা মেইল

 

  • তলিয়ে গেছে কয়েক লাখ হেক্টর জমির পাকা ধান
  • পানির নিচে স্বপ্নের ফসল, হাওরজুড়ে হাহাকার
  • ধান কাটার হিসাব নিয়ে বিতর্ক, থমকে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র
  • নষ্ট হয়ে গেছে হাওরাঞ্চলের ২০-২৫ শতাংশ ধান
  • এবার আমদানি করা লাগতে পারে ১০ লাখ টন চাল
  • সঠিক ব্যবস্থাপনায় এড়ানো সম্ভব বড় সংকট: অর্থনীতিবিদ

কয়েকটি জেলা নিয়ে বিস্তৃত হাওরাঞ্চলে এবারের বোরো মৌসুম যেন কৃষকের জন্য এক দীর্ঘ দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছে। টানা বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল, জলাবদ্ধতা ও শ্রমিক সংকটে দেশের অন্যতম প্রধান ধান উৎপাদন অঞ্চল এখন ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে। নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিস্তীর্ণ হাওর এলাকায় হাজার হাজার হেক্টর জমির পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কোথাও ধান কাটার আগেই ডুবে গেছে ফসল, আবার কোথাও কাটা ধান শুকাতে না পেরে পচে চারা গজিয়েছে।

কৃষকরা বলছেন, এবারের ক্ষতি শুধু ধান হারানোর নয়; এটি তাদের পুরো বছরের জীবিকা, খাদ্য নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ টিকে থাকার লড়াইকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। অনেক কৃষক এনজিও, ব্যাংক ও মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চাষ করেছিলেন। এখন ফসলহানির পর সেই ঋণ শোধ নিয়েই সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তায় আছেন তারা।

কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, শুধু নেত্রকোণাতেই প্রায় ১৮ হাজার ৪৭৮ হেক্টর জমির ধান নিমজ্জিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার ৮৭৭ হেক্টরের ধান পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। জেলায় মোট ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে প্রায় ৩৭৩ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৭৮ হাজার কৃষক।
সুনামগঞ্জে প্রায় ২০ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। তবে স্থানীয় কৃষক ও হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা বলছেন, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। 

কিশোরগঞ্জে প্রায় ১৩ হাজার ৪৭৯ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় সাড়ে ৫২ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। হবিগঞ্জে প্রাথমিক হিসাবে অন্তত ৪৭৬ কোটি টাকার ফসলহানির কথা বলা হয়েছে। মৌলভীবাজারেও কয়েক হাজার হেক্টরের ধান পচে নষ্ট হয়েছে।

হাওরের কৃষকরা বলছেন, এবার ধান কাটা শুরু হওয়ার পরপরই টানা বৃষ্টি পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তোলে। শ্রমিক সংকটের কারণে অনেক জমির ধান সময়মতো কাটা যায়নি। আবার কোথাও ধান কেটে খলায় তুললেও রোদ না থাকায় তা শুকানো সম্ভব হয়নি।

নেত্রকোনা: টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার নদ-নদী ও হাওরাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ব্যাপক ফসলহানির ঘটনা ঘটেছে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, জেলায় প্রায় ১৮ হাজার ৪৭৮ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার ৮৭৮ হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। এতে প্রায় ৭৫ হাজার ৯৪৯ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৭৩ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৭৮ হাজার কৃষক।

691950389_2063943090850861_1185753837365661298_n_(1)

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. আমিনুল ইসলাম জানান, হাওরাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। সেখানে প্রায় ১১ হাজার ২৩০ হেক্টর জমি প্লাবিত হয় এবং ১০ হাজার ৭২৭ হেক্টরের ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। শুধু হাওর এলাকাতেই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৩৬ কোটি টাকা।

অতিবৃষ্টির কারণে ধান শুকানোর খলাও তলিয়ে গেছে। ফলে কাটা ধান শুকাতে না পেরে পচে চারা গজিয়েছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে সেই পচা ধানই সামান্য রোদে শুকিয়ে ঘরে তোলার চেষ্টা করছেন।

খালিয়াজুরির কৃষক ক্ষিতিশ সরকার বলেন, ২০১৭ সালের বন্যার পর এত বড় ক্ষতির মুখে পড়লাম। কিছু ধান তুললেও শুকানোর জায়গা নেই।
এদিকে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। তালিকা অনুযায়ী কৃষকদের তিনটি ক্যাটাগরিতে ৭ হাজার ৫০০, ৫ হাজার ও ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং ২০ কেজি করে চাল আগামী তিন মাস বিতরণ করা হবে।

কিশোরগঞ্জ: কিশোরগঞ্জে ব্যাপক ফসলহানি হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, জেলার ১৩টি উপজেলায় এখন পর্যন্ত ১৩ হাজার ৪৭৯ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় সাড়ে ৫২ হাজার কৃষক। প্রাথমিক হিসাবে ফসলহানির পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মিঠামইন, করিমগঞ্জ, নিকলী ও ইটনা উপজেলার হাওরাঞ্চল। কোথাও পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে, আবার কোথাও কাটা ধান খলায় পড়ে পচে গেছে। দীর্ঘ সময় বৃষ্টির কারণে ধান শুকাতে না পারায় বহু স্থানে ধানে চারা গজিয়েছে।

মিঠামইনের বজরপুর হাওরের কৃষক রামিজু ইসলাম ২ একর জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। এর মধ্যে ১ একর জমির ধান পানিতে তলিয়ে যায়। তার প্রায় ৩০০ মণ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

করিমগঞ্জের বড় হাওরের কৃষক মামুনুর রশীদের প্রায় ১৪ একর জমিতে চাষাবাদের জন্য ব্যাংক, মহাজন ও আড়তদারের কাছ থেকে প্রায় ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। কিন্তু এবার তিনি কোনো ধান ঘরে তুলতে পারেননি।

কৃষকদের অভিযোগ, শ্রমিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। পানি বাড়ার পর শ্রমিকের মজুরি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। অনেক এলাকায় দৈনিক ১২০০ থেকে ২০০০ টাকা মজুরিতেও শ্রমিক পাওয়া যায়নি। ফলে সময়মতো ধান কাটা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। তাদের অভিযোগ, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, পানি নিষ্কাশনের পথ পলি জমে বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অধিকাংশ স্লুইসগেট অকেজো থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারেনি। ফলে বন্যা ছাড়াই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে।

সুনামগঞ্জ: সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত ধানের প্রকৃত পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কৃষি বিভাগের দেওয়া ধান কাটার পরিসংখ্যান এবং মাঠের বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্যের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় কৃষক ও রাজনৈতিক নেতারা।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ৩ মে হাওরে ধান কাটার হার ছিল ৭৩.৭৩৪ শতাংশ। ৪ মে তা বেড়ে হয় ৭৭.২৪১ শতাংশ এবং ৫ মে দেখানো হয় ৮০.১৬ শতাংশ। তবে সরকারি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের হাওর পরিদর্শনের পর ৬ ও ৭ মে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ধান কাটার অগ্রগতি কমিয়ে যথাক্রমে ৮২.২৯০ ও ৮৩.৮৪৩ শতাংশ দেখানো হয়।

688157928_1994910897767915_1284858250994081154_n_(1)

এদিকে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৪ মে থেকে একই অবস্থায় রয়েছে। কৃষি বিভাগের সর্বশেষ প্রতিবেদনে ২০ হাজার ১৬০ হেক্টর জমির ক্ষতির কথা বলা হলেও স্থানীয় কৃষকদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতি এর চেয়ে অনেক বেশি।

দিরাই ও শাল্লা উপজেলার উদগল ও ছায়ার হাওর ঘুরে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ জমি এখনো পানির নিচে। উদগল হাওরের প্রায় পুরো এলাকা তলিয়ে গেছে। ছায়ার হাওরের কিছু উঁচু অংশে বিচ্ছিন্নভাবে ধান কাটতে দেখা গেছে কৃষকদের।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উদগল হাওরে এ বছর ১ হাজার ৩১৩ হেক্টর জমিতে এবং ছায়ার হাওরে শাল্লা উপজেলায় ৪ হাজার ৬৩৮ হেক্টর, নেত্রকোনায় ৯০০ হেক্টর ও কিশোরগঞ্জের ইটনায় ১৫০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, ধান কাটার আগেই অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় অধিকাংশ ফসল নষ্ট হয়েছে। দিরাইয়ের আছিমপুর গ্রামের কৃষক সমর দাস জানান, প্রতি কেয়ার জমি বর্গা নিতে ৮ হাজার টাকা এবং আবাদ থেকে ধান কাটা পর্যন্ত আরও প্রায় ১৩ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ জমির ধান পানির নিচে চলে যাওয়ায় সেই বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার সুযোগ নেই।

হাওরাঞ্চলে শুধু ধান নয়, খড়ও ব্যাপকভাবে নষ্ট হয়েছে। গবাদিপশুর প্রধান খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত খড় পানিতে পচে যাওয়ায় অনেক এলাকায় গোখাদ্য সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সুনামগঞ্জের কৃষাণি ছায়া রানী দাস বলেন, ধানের পাশাপাশি খড়ও নষ্ট হওয়ায় গরু পালন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারাও আশঙ্কা করছেন, সামনে দুধ ও মাংস উৎপাদনে এর প্রভাব পড়তে পারে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, জলকপাট অকেজো থাকা এবং পানিনিষ্কাশনের পথ ভরাট হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বন্যা ছাড়াই দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে যায়।

তবে সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, মাঠপর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতেই পরিসংখ্যান প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে আরও সময় লাগবে বলেও জানান তিনি।

হবিগঞ্জ: টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরো আবাদে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্রাথমিক হিসাবে, জেলার মোট বোরো জমির প্রায় ২০ শতাংশ প্লাবিত হয়ে অন্তত ৪৭৬ কোটি টাকার ধান নষ্ট হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।

জেলার ৪৪টি বড় হাওরে এ বছর প্রায় ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা ছিল। সেখান থেকে প্রায় ৫ লাখ ২৯ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন চাল পাওয়ার আশা করা হয়েছিল, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য ছিল প্রায় ২ হাজার ৩৮৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। কিন্তু মৌসুমের শেষ সময়ে শিলাবৃষ্টি ও বন্যায় সেই সম্ভাবনায় বড় ধাক্কা লাগে।

এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে ধান পাকতে শুরু করলে শিলাবৃষ্টিতে প্রথম ক্ষতির মুখে পড়েন কৃষকরা। পরে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে একের পর এক হাওর প্লাবিত হয়। খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে বানিয়াচং উপজেলার চারটি ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক ছোট হাওর এক রাতেই পানির নিচে চলে যায়।
কৃষি বিভাগের হিসাবে, জেলার অন্তত ২৫টি হাওরের ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার ৮৮০ মেট্রিক টন ধান এবং প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৯২০ মেট্রিক টন চালের ক্ষতি হয়েছে।

এদিকে বন্যা পরিস্থিতি কিছু এলাকায় স্থিতিশীল হলেও নতুন করে শায়েস্তাগঞ্জ ও লাখাই উপজেলায় জমি প্লাবিত হচ্ছে। উজানের ঢলে সুতাং নদীর পানি বাড়তে থাকায় প্রতিদিন নতুন নতুন বোরো জমি পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে।

685589943_2190509311713576_1921655360867177161_n

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনো প্রস্তুত হয়নি। প্রাথমিকভাবে ২১ হাজারের বেশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। চূড়ান্ত হিসাব প্রকাশ হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া: অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার মেদির হাওরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে গত কয়েক দিনে অন্তত ৩০৫ হেক্টর বোরো ধানের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন অন্তত ২ হাজার কৃষক।

কৃষি বিভাগ জানায়, চলতি মৌসুমে নাসিরনগরের হাওর এলাকায় প্রায় ১১ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়। বৃষ্টিপাত শুরুর আগে প্রায় ৬০ শতাংশ ধান কাটা শেষ হলেও টানা বর্ষণ ও পানি বৃদ্ধির কারণে প্রতিদিনই নতুন নতুন জমি প্লাবিত হচ্ছে। 

পানি বাড়তে থাকায় ধান কাটার শ্রমিক সংকটও দেখা দিয়েছে। দৈনিক দেড় হাজার টাকা মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান স্থানীয়রা। ফলে অনেক জমির পাকা ও আধাপাকা ধান ক্ষেতেই পচে নষ্ট হচ্ছে। যেসব ধান কাটা হচ্ছে, সেগুলোও পর্যাপ্ত রোদ না থাকায় শুকানো সম্ভব হচ্ছে না, এতে লোকসান আরও বাড়ছে।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদন খরচ আগেই বেড়ে গেছে। এখন ধান বাজারে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হলেও তা দিয়েও খরচ ওঠানো কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেকেই ধার-দেনা করে আবাদ করলেও এখন ফসল ঘরে তুলতে না পারায় চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

নাসিরনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসাইন জানান, বর্তমানে ৩০৫ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে রয়েছে। এছাড়া আগেই কাটা কিছু ধানও রোদ না পাওয়ায় শুকানো যাচ্ছে না, ফলে সেগুলো নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে কৃষি বিভাগ বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। বিভিন্ন জেলায় নগদ অর্থ ও চাল সহায়তার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। তবে কৃষকদের অভিযোগ, সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।

হাওরের কৃষকদের আশঙ্কা, প্রতি বছর একই ধরনের দুর্যোগ চলতে থাকলে ভবিষ্যতে অনেকেই কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। এতে শুধু কৃষক নয়, দেশের খাদ্য নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়বে।

একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ ও ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজের (ইউজিভি) সাবেক উপাচার্য ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এবারের সংকট শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে হয়নি; এর পেছনে কৃষি ব্যবস্থাপনারও নানা সীমাবদ্ধতা ছিল।

তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, প্রথমে ছিল সারের সংকট, এরপর তেলের সংকট। ইরিগেশনে তেলের অভাবে অনেক জায়গায় পাম্প চলেনি। এর মধ্যে ইরি মৌসুমে হাওরে বন্যা হয়েছে। বিশেষ করে নিচু এলাকাগুলোতে ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) সাবেক এই মহাপরিচালক জানান, হাওরে প্রায় ৫০ শতাংশ ধান কাটার পর বন্যা হয়েছে। বাকি ধানের মধ্যে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সার্বিকভাবে হাওরাঞ্চলের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ ধান নষ্ট হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এর প্রভাব সারা দেশেই পড়বে। দেশে গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ ধান উৎপাদন কম হতে পারে। বোরো হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় ধান মৌসুম, যেখান থেকে প্রায় ৫৪ শতাংশ চালের জোগান আসে। ফলে বোরো ধানে ক্ষতি হওয়া মানে খাদ্য সংকটের শঙ্কা তৈরি হওয়া।

তিনি আরও বলেন, উৎপাদন কমে গেলে বাজারে চালের সরবরাহ কমবে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়বে। সম্ভবত ১০ লাখ টনের মতো চাল আমদানি করতে হতে পারে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পড়বে। একই সঙ্গে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও বাড়বে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়লে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিও উসকে যাবে, যার চাপ পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর।

683612009_2029977641236250_2737044037972608599_n

তবে পরিস্থিতি মোকাবিলার সুযোগ এখনো আছে বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, বর্তমানে দেশে প্রায় ২০ লাখ টনের মতো খাদ্য মজুদ রয়েছে, যা তুলনামূলক ভালো অবস্থানে আছে। সঠিক ব্যবস্থাপনা করা গেলে বড় ধরনের সংকট এড়ানো সম্ভব। তিনি বলেন, এখন দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে খাদ্য সহায়তা দিতে হবে। পাশাপাশি সামনে আউস ও আমন মৌসুমে উৎপাদন বাড়ানোর দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষকদের বীজ, সার, সেচসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নগদ সহায়তা দিয়ে তাদের আবার চাষে উৎসাহিত করতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাওর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, দ্রুত পানি নিষ্কাশন, আধুনিক কৃষিযন্ত্রের সহজলভ্যতা এবং কৃষকদের জন্য কার্যকর বীমা ব্যবস্থা চালু না করলে এই সংকট বারবার ফিরে আসবে। আর সেই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হাওরের কৃষকেরা এখন একটাই প্রশ্ন করছেন— প্রতি বছর এমন হলে আমরা বাঁচবো কীভাবে?

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন ঢাকা মেইলের নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রতিনিধিরা।]

এমআর/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর