শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

ঈদকে ঘিরে জমজমাট মতিঝিলের ‘হলিডে মার্কেট’

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ০৬ মার্চ ২০২৬, ০৬:০১ পিএম

শেয়ার করুন:

ঈদকে ঘিরে জমজমাট মতিঝিলের ‘হলিডে মার্কেট’
মতিঝিলে বাহারি পণ্য নিয়ে মিলে ‘হলিডে মার্কেট’। ছবি: ঢাকা মেইল

* নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ঈদ কেনাকাটার ভরসা 
* কম দামে পোশাক থেকে গৃহস্থালি—সবই মেলে
* ছুটির দিনে জমজমাট বাজার  

রাজধানীর মতিঝিলে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বসে অস্থায়ী বাজার ‘হলিডে মার্কেট’। ঈদকে সামনে রেখে এই বাজার এখন বেশ জমজমাট। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই পাশের সড়কজুড়ে ভ্যান, ত্রিপল ও চাটাই পেতে বসেছে শত শত দোকান। পোশাক, গৃহস্থালি সামগ্রী, অলংকার, গাছ, খেলনা, হস্তশিল্প—সব মিলিয়ে যেন এক খোলা আকাশের নিচে ছোট্ট মেলা।


বিজ্ঞাপন


রোজার অর্ধেক শেষ। ঈদের আর মাত্র কিছু দিন বাকি থাকায় এখানে ক্রেতাদের ভিড় এখন চোখে পড়ার মতো। উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত—সামর্থ্য অনুযায়ী সবাই ঈদের প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে ব্যস্ত। তবে তুলনামূলক কম দামের কারণে এই বাজারটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় নিম্ন ও মধ্যবিত্তের কাছে।

রামপুরা থেকে কেনাকাটা করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মাইনুদ্দিন ঢাকা মেইলকে বলেন, আমাদের মতো নিম্ন-মধ্যবিত্তদের জন্য এই মার্কেটই সই। বড় মার্কেটে যাওয়ার সাধ্য আমাদের নেই। অবশ্য বড় মার্কেটে যা পাওয়া যায়, এখানে তার প্রায় সবই পাওয়া যায়। মানের দিক থেকে একটু এদিক-সেদিক হয়। কিন্তু কম দামে পরিবারের সবাইকে কিছু না কিছু কিনে দিতে পারছি—এটাই বড় কথা।

Holiday_bazar_dhaka_copy

ছুটির দিনের বাজার 
মূলত প্রতি শুক্রবার বসে এই হলিডে মার্কেট। তাই অনেকেই একে ‘ছুটির দিনের মার্কেট’ বলেও ডাকেন। সকাল ৭টার পর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বিক্রেতারা ভ্যান বা ছোট গাড়িতে করে পণ্য নিয়ে এসে রাস্তার দুই পাশে দোকান সাজিয়ে বসেন। কেউ পলিথিন বিছিয়ে, কেউ বা ভ্যানের ওপরই সাজিয়ে বিক্রি করেন বিভিন্ন পণ্য। 


বিজ্ঞাপন


বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতাদের ভিড়ও বাড়তে থাকে। দুপুরের পর যেন মানুষের ঢল নামে পুরো এলাকায়। দীর্ঘদিন ধরে এখানে ব্যবসা করা বিক্রেতা সালমান আহমেদ জানান, প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে তিনি এই মার্কেটে কাপড় বিক্রি করছেন। তার ভাষায়, ক্রেতারা এখানে দরদাম করে জিনিস কিনতে পারে। আমরা আবার অল্প লাভে বেশি বিক্রি করতে পারি। তাই ক্রেতা-বিক্রেতা দুই পক্ষই খুশি। 

 

কম দামে নানা পণ্য
মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, অন্য অনেক জায়গার তুলনায় এখানে পণ্যের দাম বেশ কম। যেমন অন্য জায়গায় ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হওয়া পর্দা বা বিছানার চাদর এখানে দামাদামি করে ৩০০-৪০০ টাকায় পাওয়া যায়। একইভাবে ভ্যানে বিক্রি হওয়া ছেলেদের জুতো বা স্যান্ডেল অন্য জায়গায় যেখানে ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা, এখানে তা ৫০০ টাকার মধ্যেই মিলছে।

ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান বলেন, অন্যান্য মার্কেটের দোকানদার যদি ৫০ টাকা লাভ করে, আমরা করি তার অর্ধেক। তাই আমাদের জিনিসের দামও কম। 

এখানে শাড়ি বিক্রির দোকানগুলোতেও ক্রেতাদের ভিড় বেশি দেখা যায়। সুতি, জর্জেট, কাতান কিংবা হ্যান্ড পেইন্ট—বিভিন্ন ধরনের শাড়ি পাওয়া যায় তুলনামূলক কম দামে। কোনো কোনো শাড়ি ১০০ থেকে ৩০০ টাকাতেও পাওয়া যায়। তবে এগুলো বেশির ভাগ নিচ্ছেন যারা বুটিকের কাজ করেন কিংবা পেইন্টের। তারা কম দামে শাড়ি, পাঞ্জাবি কিনে নিয়ে হাতের নকশা বা পেইন্ট করে ব্যবহার করেন। অনেকে আবার বিক্রিও করে থাকেন। 

ডেমরা থেকে কেনাকাটা করতে আসা দিলরুবা জামান জানান, তিনি ১৫০ টাকা করে দুটি সুতি শাড়ি এবং ২০০ টাকায় একটি জর্জেট শাড়ি কিনেছেন। তিনি বলেন, এত কম দামে শাড়ি পেলে কিনতে ইচ্ছে হয়ই। একবার পরে না হয় কাঁথা বানিয়ে ফেলব। 

Holiday_bazar_dhaka_copy_i

ট্রেন্ডি পোশাকেও তরুণদের ভিড়
বর্তমান ফ্যাশনের পোশাকও মিলছে এখানে। ড্রপ শোল্ডার টি-শার্ট, ব্যাগি জিন্স, সানগ্লাস, বিভিন্ন ধরনের ব্যাগ ও জুয়েলারি—সবই পাওয়া যায় ২০০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে।

সাজিদ নামে একজন বলেন, রোজার শেষ দিকে বড় মার্কেটে এভাবে দামাদামি করা যায় না। তাই এখানে এসে খুঁজে খুঁজে অনেক কিছু কিনে নিতে পারি।

এখানে অনেক তরুণ-তরুণী কম দামে পোশাক কিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি দেওয়ার জন্যও ব্যবহার করেন। ক্রেতারা জানান, শাড়িগুলো হয়তো দুই-তিনবারের বেশি পরা যায় না, কিন্তু ছবি তুলে পোস্ট করা যায়। পরে আবার অন্য কাজে ব্যবহার করা যায়।

শুধু পোশাক নয়, ঘরের জিনিসও
পোশাকের পাশাপাশি এই মার্কেটে গৃহস্থালির নানা সামগ্রীও পাওয়া যায়। রান্নার তৈজসপত্র, সিরামিকস কাপ-প্লেট, কুশন, পর্দা, বিছানার চাদর, এমনকি কাচের বোতল ও জারও বিক্রি হচ্ছে। 

এক দোকানে দেখা যায় মধু, কফি বা মেয়োনিজের ব্যবহৃত কাচের জার পরিষ্কার করে বিক্রি করা হচ্ছে। এসব জিনিস শিক্ষার্থী ও গৃহিণীরা কিনে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করেন।

সবার জন্য এক বাজার
এই বাজারে নারী ক্রেতার সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষই এখানে কেনাকাটা করতে আসেন। অনেকেই আবার এখান থেকে পণ্য কিনে অনলাইনে বিক্রি করেন।

কিছু অসুবিধাও আছে
তবে সড়কের ওপর বাজার বসায় কিছুটা ভোগান্তিতেও পড়তে হয় পথচারীদের। পথচারীরা জানান, জিনিসপত্র কিনতে ভালো লাগে ঠিকই। কিন্তু বেলা বাড়লে ভিড় এত বেশি হয় যে চলাচল কঠিন হয়ে যায়। যদি একটু নিয়ম করে বাজারটা পরিচালনা করা যায়, তাহলে সবার জন্যই সুবিধা হবে।

হকার পুনর্বাসনের উদ্যোগ
ঢাকা সিটি করপোরেশন ২০০৭ সালে হকার পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে এই হলিডে মার্কেট চালু করে। মাঝখানে কিছু সময় বন্ধ থাকলেও এখন আবার আগের মতো প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠেছে বাজারটি।

বিক্রেতাদের আশা, এমন বড় একটি বাজারের স্থায়ী ব্যবস্থা করা হলে তাদের ব্যবসা আরও স্থিতিশীল হবে। কারণ ভ্রাম্যমাণ দোকান নিয়ে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বা অস্থির পরিস্থিতিতে প্রায়ই সমস্যায় পড়তে হয় তাদের। তবু সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ক্রেতা-বিক্রেতা সবার কাছেই হলিডে মার্কেট যেন স্বস্তির একটি নাম—যেখানে কম দামে প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা যায়। 
 
এমআর/ক.ম 

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর