বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

হাজার কোটি টাকার পাঞ্জাবি বাজার, ঈদেই বিক্রি অর্ধেকের বেশি

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৪:৩৪ পিএম

শেয়ার করুন:

Panjabi
ছবি- ঢাকা মেইল

# কয়েক বছরের রাজনীতির অস্থিরতার ক্ষতি পোষানোর আশা ব্যবসায়ীদের
# চাহিদা বেশি ৩-৫ হাজার টাকার পাঞ্জাবির
#  রাজধানীর আশপাশে ব্যস্ত শত শত কারখানা 
# অনলাইন বিক্রি বাজারের অন্তত ১৫ থেকে ২০ শতাংশ 
# প্রবাসীদের জন্য কয়েক কোটি টাকার পাঞ্জাবি যাচ্ছে বিদেশে

দেশীয় ঐতিহ্য, ধর্মীয় আবহ আর ঈদের উৎসব সংস্কৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকা পাঞ্জাবি এখন কেবল পোশাক নয়, এটি অর্থনৈতিক একটি বড় খাত। উৎপাদন, পাইকারি ও খুচরা বাজার, ব্র্যান্ড ব্যবসা এবং অনলাইন বিপণন মিলিয়ে দেশে পাঞ্জাবির বার্ষিক বাজারের আকার ৭০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকা। এর অর্ধেকের বেশি লেনদেন হয় শুধু রমজান ও ঈদ মৌসুমে। ঈদ ঘিরে এবারো রমজানের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে রাজধানীজুড়ে জমে উঠেছে কেনাকাটা। শপিংমল থেকে ফুটপাত, সবখানেই পুরুষদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে পাঞ্জাবি-পায়জামা। রোজার শেষ দশকে বিক্রি আরও কয়েকগুণ বাড়বে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।


বিজ্ঞাপন


খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সারা বছর যত পাঞ্জাবি বিক্রি হয়, তার প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বিক্রি হয় রমজান ও ঈদকে ঘিরে। পহেলা বৈশাখ ও বিয়ের মৌসুম যুক্ত হলে বছরের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ লেনদেন কয়েকটি নির্দিষ্ট সময়েই সম্পন্ন হয়। ফলে উৎপাদন পরিকল্পনাও মৌসুমভিত্তিক।

ঈদ ঘিরে কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস পল্লীর শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা এবার স্বস্তির নিশ্বাস নিচ্ছেন। গত কয়েক বছরের অস্থিরতার কারণে কাজ ও আয়ের ঘাটতি থাকলেও এবার তারা বিক্রি বাড়ার আশায় অতিরিক্ত সময় কাজ করছেন।

10

ব্যবসায়ীরাও জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতায় আগের বছরে বাজারে মন্দা ছিল। তবে এবার পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় অনেকে গত বছরের তুলনায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি বিক্রির আশা করছেন।


বিজ্ঞাপন


নিউ ফ্যাশনের মালিক মো. ইয়াসিন বলেন, গত বছর ৮ হাজার পাঞ্জাবি বিক্রি হলেও এ বছর ১২ থেকে ১৪ হাজার পিস বিক্রির লক্ষ্য ধরেছেন।

কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী আনোয়ার হোসেনের আশা, রমজানজুড়ে জমজমাট বিক্রি হবে এবং গত কয়েক বছরের চেয়ে এ বছর ব্যবসা ভালো যাবে।
গাজীপুরের একটি কারখানার মালিক জাহিদুর রহমান বলেন, ঈদের তিন মাস আগে থেকেই পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন শুরু করতে হয়। সাধারণ সময়ের তুলনায় তখন উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হয়। অনেক কারখানায় চালু থাকে বাড়তি শিফট।

উৎপাদনের বিস্তৃত চেইন

পাঞ্জাবি উৎপাদনের মূল কেন্দ্র ঢাকা। রাজধানীর ইসলামপুর, চকবাজার, গাউছিয়া ও আশপাশের এলাকায় ঈদ মৌসুমে শত শত ছোট ও মাঝারি কারখানা ব্যস্ত থাকে। নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী সুতি ও খাদি কাপড়ের বড় উৎস, আর গাজীপুরে হয় কাটিং, সেলাই ও ফিনিশিংয়ের কাজ। কুমিল্লা ও সিরাজগঞ্জেও ছোট উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়ছে।

সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, সারাদেশে কয়েক হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানা এ খাতে যুক্ত। ঈদ মৌসুমে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় এক থেকে দেড় লাখ শ্রমিক কাজ করেন।

20

উৎপাদন ব্যয় ও বাজারদর

মাঝারি মানের একটি পাঞ্জাবি তৈরি করতে কাপড়, সেলাই, বোতাম, লেবেল, প্যাকেজিং ও শ্রম মিলিয়ে ৫০০ থেকে ৯০০ টাকা খরচ পড়ে। উন্নত মানের কাপড় ও সূচিশিল্প থাকলে ব্যয় ১ হাজার টাকার বেশি হয়।

পাইকারি বাজারে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকায় কেনা পণ্য খুচরা বাজারে ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। ব্র্যান্ডভেদে দাম ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা বা তার বেশি।

রাজধানীর শপিংমলগুলোতে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকার পাঞ্জাবির চাহিদা বেশি হলেও ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার পণ্যও উল্লেখযোগ্য হারে বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতাদের প্রতিক্রিয়া মিশ্র-কেউ দাম বাড়ার কথা বলছেন, কেউ আবার বলছেন মানের তুলনায় দাম সহনীয়।

রাজধানীর সায়েন্সল্যাব, শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেট, কাঁটাবন, গুলিস্তানের পীর ইয়ামেনী মার্কেট, মৌচাকসহ নয়াপল্টন এলাকার শপিংমল ঘুরে দেখা যায়, সুতির পাশাপাশি সফট লিলেন, কাবুলি ও প্রিন্টের পাঞ্জাবির চাহিদা বেশি। ক্রেতারা জানান, গতবছরের চেয়ে এ বছর পাঞ্জাবির ডিজাইনে নতুনত্ব এসেছে। আবহাওয়া বিবেচনায় আকর্ষণীয় ও আরামদায়ক পাঞ্জাবিকে প্রাধান্য দিচ্ছেন তারা।

30

এসব মার্কেটে ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দামের পাঞ্জাবি পাওয়া যায়। মানভেদে ৩০০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত পায়জামা বিক্রি হয়।

নয়াপল্টনের পলওয়েল, চায়না টাউন, সিটি হার্টের বড় দোকানগুলোতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পাঞ্জাবি পাওয়া যায়। 

রাজধানীর মসজিদের সামনে জমজমাট বেচাকেনা

ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন মসজিদসংলগ্ন এলাকায় পায়জামা-পাঞ্জাবির অস্থায়ী বাজার বসেছে। বিশেষ করে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সামনে ফুটপাতজুড়ে সাশ্রয়ী মূল্যের পাঞ্জাবির বিক্রি চোখে পড়ার মতো।

৩০০ থেকে ৫০০ টাকা হাঁকডাক করে বিক্রি হচ্ছে নানা রঙের পাঞ্জাবি। দরদাম করলে কিছুটা কমেও পাওয়া যাচ্ছে। শিশুদের পাঞ্জাবি-পায়জামা সেট মিলছে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায়। ইফতারের পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ভিড় বাড়ে। নির্দিষ্ট বাজেটের মধ্যে পরিবারের সবার জন্য কেনাকাটা করতে চান এমন ক্রেতাদের কাছে এসব বাজারই ভরসা। শহরের নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকেরা ফুটপাতেই কেনাকাটা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

কাপড়, রং ও ডিজাইনে বৈচিত্র্য

সুতি কাপড় এখনও সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। তবে খাদি, লিনেন ও সিল্ক-ব্লেন্ড কাপড়ের চাহিদাও বাড়ছে। নরসিংদীর কাপড় ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদের আগে সুতি কাপড়ের চাহিদা প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।

50

ডিজাইনে এবার মিনিমাল লুক এবং ঐতিহ্যনির্ভর সূচিশিল্প—দুই ধারাই জনপ্রিয়। কলারে হালকা কাজ, বুকের অংশে সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারি যেমন আছে, তেমনি ব্লক প্রিন্ট ও নকশিকাঁথা অনুপ্রাণিত কাজও রয়েছে। ‘কাবুলি’ ও সেমি-শর্ট কাটের পাঞ্জাবি তরুণদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে।

ব্র্যান্ড ও অনলাইন বাজারের বিস্তার

দেশীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো ঈদ উপলক্ষে বিশেষ সংগ্রহ এনেছে। সঙ্গে যুক্ত করেছেন বিভিন্ন ছাড় কিংবা অফার। আড়ং, ইল্লিয়্যিন, রঙ বাংলাদেশ, লা রিভ, টুয়েলভ ক্লথিং ও কে ক্র্যাফট–এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো গরম উপযোগী কাপড় ও আধুনিক কাটে জোর দিয়েছে। তবে মোট বিক্রির প্রায় ৬০ শতাংশ এখনো পাইকারি বাজার ও স্থানীয় দোকাননির্ভর। অনলাইন বিক্রি বাজারের অন্তত ১৫ থেকে ২০ শতাংশ দখল করেছে। অনেক উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে মোট বিক্রির প্রায় এক-তৃতীয়াংশই আসে অনলাইন থেকে।

প্রবাসী বাজার ও সম্ভাবনা

মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাজ্য ও উত্তর আমেরিকায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে ঈদকেন্দ্রিক সময়ে পাঞ্জাবির চাহিদা বাড়ে। ছোট চালানে নিয়মিত পণ্য পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বছরে কয়েক কোটি টাকার পাঞ্জাবি বিদেশে যাচ্ছে।

60

একজন রফতানিকারক জানান, আমরা বছরে তিন থেকে চারবার মধ্যপ্রাচ্যে চালান পাঠাই। পরিমাণ সীমিত হলেও চাহিদা স্থিতিশীল।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, পাঞ্জাবি আলাদা শিরোনামে পরিসংখ্যানভুক্ত না হলেও তৈরি পোশাকের আওতায় সীমিত রফতানি হচ্ছে। প্রবাসী বাজারে আরও সম্ভাবনা রয়েছে।

ব্যবসায়ীদের মতে, মান নিয়ন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক বিপণন ও প্রণোদনা সহায়তা পেলে পাঞ্জাবিকে ঐতিহ্যভিত্তিক বিশেষায়িত রফতানি পণ্যে রূপ দেওয়া সম্ভব।

অনলাইন মাধ্যমে পাঞ্জাবি বিক্রি করেন জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ফিরোজ হাসান। এবার ঈদে তার বেচাকেনা নিয়ে ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে সাধারণত ঈদ উপলক্ষে পায়জামা পাঞ্জাবি সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। আমাদের অনলাইনভিত্তিক বেচাকেনার ধরন আপডাউন করে। এখানে বিশ্ব পরিস্থিতি, অনলাইন ট্রেন্ড, মানুষের প্রবৃত্তির ওপর নির্ভর করে। 

ঈদ বাজারে অনলাইন বেচাকেনা সাধারণত ১০ থেকে ২৫ রোজায় হয়। তার মধ্যে ১৫ থেকে ২০ রোজায় বেশি হয়। তবে বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে অনলাইন বেচাকেনা কিছুটা পিছিয়ে পড়তে পারে।’

এমআর/এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর