Dhaka Mail Logo

ইসলাম

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্তান নিরাপদ আছে কি না বুঝবেন কীভাবে

ধর্ম ডেস্ক

২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪৫ পিএম

সন্তানকে সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে অভিভাবকেরা দ্বীনি বা জেনারেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠান। তাদের আশা, সন্তান সেখানে জ্ঞানের পাশাপাশি নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ শিখবে। কিন্তু পড়াশোনার পরিবেশ ভালো হলেই শিশু নিরাপদ, এমন ধরে নেওয়া যায় না। যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শারীরিক নির্যাতন, মানসিক নিপীড়ন কিংবা যৌন হেনস্থার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই সন্তান কী পড়ছে, তা দেখার পাশাপাশি সে কেমন আছে, তার খোঁজ রাখাও জরুরি।

ইসলামেও সন্তানের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা করো।’ (সুরা তাহরিম: ৬)। পরিবারের কল্যাণ ও যত্নের এই দায়িত্বের মধ্যে সন্তানের নিরাপত্তার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত।

আচরণের পরিবর্তন যেসব সংকেত দেয়

আগে যে সন্তান আনন্দের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেত, সে হঠাৎ যেতে না চাইলে, কোনো শিক্ষক বা নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম শুনে ভয় পেলে কিংবা যাওয়ার কথা উঠলেই অস্থির হয়ে পড়লে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখুন। অস্বাভাবিক চুপচাপ থাকা, অতিরিক্ত রাগ বা কান্নাকাটি, ঘুমের সমস্যা, দুঃস্বপ্ন, খাওয়ায় অনীহা এবং পড়াশোনায় হঠাৎ অমনোযোগও উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

তবে এসব লক্ষণ দেখলেই নির্যাতন হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। পড়ার চাপ, সহপাঠীদের সঙ্গে বিরোধ বা অন্য সমস্যার কারণেও আচরণ বদলাতে পারে। তাই ধমক না দিয়ে শান্তভাবে কথা বলুন এবং পরিবর্তনের কারণ বোঝার চেষ্টা করুন।

আরও পড়ুন: শিক্ষাঙ্গনে একজন মুসলিম শিক্ষার্থীর করণীয়

শরীরে আঘাত থাকলে

শিশুর শরীরে বারবার কালশিটে, আঘাতের চিহ্ন বা পোড়া দাগ দেখা গেলে এবং তার ব্যাখ্যা অসংগত মনে হলে খোঁজ নিন। আঘাতের কথা বলতে ভয় পেলে, একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটলে কিংবা কারও সামনে অস্বস্তি প্রকাশ করলে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ইসলামে জুলুম ও অন্যায় আচরণ নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে আমার বান্দারা, আমি আমার নিজের ওপর জুলুম হারাম করেছি এবং তোমাদের মধ্যেও তা হারাম করেছি। অতএব, তোমরা একে অপরের ওপর জুলুম করো না।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৭৭)। তাই শাসনের নামে শিশুকে মারধর, অপমান বা ভয় দেখানোকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া যায় না। শৃঙ্খলা দরকার, তবে তা শিশুর মর্যাদা ও নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করে নয়।

যৌন হেনস্থার আশঙ্কা যেসব আচরণে

শিশু কোনো ব্যক্তির কাছে যেতে অস্বস্তি বোধ করলে, তার সঙ্গে একা থাকতে ভয় পেলে কিংবা নিজের শরীর নিয়ে অস্বাভাবিক আতঙ্ক দেখালে বিষয়টি অবহেলা করবেন না। বয়সের তুলনায় অস্বাভাবিক যৌন আচরণ বা কথা, কোনো ঘটনা গোপন রাখতে বলা কিংবা অনুপযুক্ত স্পর্শের মতো বিষয়ও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। কোনো ব্যক্তি বিশেষ উপহার বা সুবিধার মাধ্যমে শিশুকে গোপন সম্পর্কের দিকে টানার চেষ্টা করলেও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

শিশু অনেক সময় ভয়, লজ্জা বা হুমকির কারণে মুখ খোলে না। তাই তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। সে কিছু জানালে তাকে দোষারোপ বা অবিশ্বাস করবেন না। ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা কিংবা প্রতিষ্ঠানের সুনামের কারণে কোনো অভিযোগ চাপা দেওয়াও উচিত নয়।

আরও পড়ুন: শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বয়স সম্পর্কে যা বলছে ইসলাম

সন্তানের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ুন

শিশু যেন ভয় বা অস্বস্তির কথা নির্ভয়ে মা-বাবাকে বলতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করুন। শুধু ফলাফল নয়, প্রতিদিন তার বন্ধু, শিক্ষক ও অভিজ্ঞতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবে কথা বলুন। সম্ভব হলে একান্তে কথা বলুন, কারণ অন্যদের সামনে অনেক শিশু মন খুলতে পারে না।

বয়স অনুযায়ী সহজ ভাষায় তাকে বোঝান, তার শরীরের ব্যক্তিগত সীমানা রয়েছে এবং কেউ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করলে, ভয় দেখালে কিংবা কোনো ঘটনা গোপন রাখতে বললে সে মা-বাবাকে জানাতে পারবে। এতে তার কোনো দোষ হবে না। শিক্ষককে সম্মান করতে শেখানোর পাশাপাশি এটিও বোঝান, অন্যায় আচরণ কারও কাছ থেকেই মেনে নেওয়া উচিত নয়।

ভর্তির আগে ও পরে যা খেয়াল রাখবেন

স্কুল, মাদরাসা কিংবা আবাসিক যে ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই সন্তানকে পাঠান, ভর্তির আগে সেখানকার শিশু সুরক্ষার ব্যবস্থা জেনে নিন। শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া, থাকার জায়গা, শৌচাগার, তদারকি এবং অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা কেমন, তা খোঁজ নিন। আবাসিক প্রতিষ্ঠানে রাতে কারা শিক্ষার্থীদের দেখভাল করেন এবং শিশু সমস্যায় পড়লে কার কাছে যেতে পারে, তা-ও জানা জরুরি।

ভর্তির পরও দায়িত্ব শেষ হয় না। নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন, সম্ভব হলে প্রতিষ্ঠানে গিয়ে সন্তানকে দেখুন এবং ছুটিতে বাড়ি এলে তার আচরণ খেয়াল করুন। সে কোনো সমস্যা বা অস্বস্তির কথা জানালে তা গুরুত্বের সঙ্গে নিন।

নির্যাতনের আশঙ্কা হলে করণীয়

সন্তান কিছু জানালে প্রথমে তাকে আশ্বস্ত করুন যে সে কোনো অন্যায় করেনি এবং তার কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনা হচ্ছে। তাকে দোষারোপ করবেন না, অবিশ্বাস করবেন না কিংবা বারবার জেরা করে বিব্রত করবেন না। ঝুঁকি থাকলে অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে তাকে নিরাপদ দূরত্বে রাখুন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা করুন।

ঘটনার বিবরণ শিশুর নিজের ভাষায় যতটা সম্ভব নির্ভুলভাবে লিখে রাখুন। প্রাসঙ্গিক বার্তা, ছবি বা অন্য প্রমাণ থাকলে সংরক্ষণ করুন। অভিযুক্ত ব্যক্তির মুখোমুখি হয়ে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করা থেকে বিরত থাকুন।

প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে জানানো প্রয়োজন হতে পারে। তবে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে বা অভিযোগ গুরুতর হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নিন। বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন, সহিংসতা বা শোষণের ঘটনায় শিশু সহায়তা হেল্পলাইন ১০৯৮-এ যোগাযোগ করা যায়। তাৎক্ষণিক বিপদে জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করুন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব

প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্পষ্ট শিশু সুরক্ষা নীতিমালা থাকা দরকার। শিক্ষক ও কর্মীদের আচরণবিধি, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আবাসিক প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগ উঠলে প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার চেয়ে শিশুর নিরাপত্তা ও ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অভিযোগ জানানোর কারণে যেন শিশু বা তার পরিবার হয়রানির শিকার না হয়, সেই ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, আমানত তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে এবং মানুষের মধ্যে বিচার করলে ন্যায়বিচার করতে।’ (সুরা নিসা: ৫৮)। অভিভাবকেরা যে আস্থা নিয়ে সন্তানকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেন, তা রক্ষা করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। আবার যাচাই ছাড়া কাউকে দোষী ঘোষণা করাও ঠিক নয়। শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নিরপেক্ষ তদন্ত করাই সঠিক পথ।

শিশুর নিরাপত্তায় সবার জবাবদিহি

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি: ৭১৩৮)। এই হাদিস পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের দায়িত্বশীলদের জবাবদিহির কথা মনে করিয়ে দেয়। শিশুর নিরাপত্তা শুধু মা-বাবার দায়িত্ব নয়, শিক্ষক, পরিচালনা কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সবারই এতে ভূমিকা রয়েছে।

সচেতন অভিভাবক, দায়িত্বশীল শিক্ষক, নিয়মিত তদারকি এবং অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা থাকলে শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করা সহজ হয়। শিশুর প্রতি দয়া, ন্যায়বিচার ও আমানত রক্ষার ইসলামি শিক্ষা বাস্তবে প্রয়োগ করেই এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব।

তথ্যসূত্র: সুরা তাহরিম: ৬; সুরা নিসা: ৫৮; সহিহ মুসলিম: ২৫৭৭; সহিহ বুখারি: ৭১৩৮