Dhaka Mail Logo

ইসলাম

একটি হাদিস যাচাইয়ে মুহাদ্দিসরা যে কষ্ট করতেন

ধর্ম ডেস্ক

০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২৮ পিএম

আজ কোনো হাদিসের সূত্র জানতে চাইলে কয়েক সেকেন্ডেই ইন্টারনেটে তা খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু হাদিস সংরক্ষণের শুরুর যুগে ছিল না ডিজিটাল লাইব্রেরি, ছিল না মুহূর্তে তথ্য খুঁজে বের করার কোনো ব্যবস্থা। একটি হাদিস সরাসরি শোনার জন্য কখনো দীর্ঘ সফর করতে হতো। বর্ণনাকারী কেমন মানুষ, তাঁর স্মৃতি কেমন, তিনি সত্যিই তাঁর উস্তাদের কাছ থেকে হাদিসটি শুনেছেন কি না এসব বিষয়ও খুঁজে বের করতে হতো। এই দীর্ঘ পরিশ্রমের উদ্দেশ্য ছিল একটাই - রাসুলুল্লাহ (স.)-এর নামে যেন কোনো ভুল কথা প্রচারিত না হয়।

কেন এত সতর্কতা

রাসুলুল্লাহ (স.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।’ (সহিহ বুখারি: ১০৭)

তাবেঈ মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (রহ.) বলেছেন, ফিতনা দেখা দেওয়ার পর লোকেরা বর্ণনাকারীদের পরিচয় জানতে চাইতে শুরু করে। তাঁর আরেকটি বিখ্যাত উক্তি হলো, ‘এই ইলমই দ্বীন, তাই কার কাছ থেকে তোমার দ্বীন নিচ্ছ, তা দেখে নাও।’ (সহিহ মুসলিম, ভূমিকা)

একটি হাদিসের জন্য এক মাসের সফর

হাদিস অন্বেষণে সফরকে বলা হয় ‘রিহলা ফি তালাবিল হাদিস’। এর বিখ্যাত উদাহরণ সাহাবি জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.)। বর্ণিত আছে, তিনি জানতে পারেন আবদুল্লাহ ইবনে উনাইস (রা.) রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কাছ থেকে একটি হাদিস শুনেছেন। সেটি সরাসরি শোনার জন্য তিনি এক মাসের পথ পাড়ি দিয়ে শাম অঞ্চলে যান। ঘটনাটির বর্ণনা আল-আদাবুল মুফরাদ ও হাদিসের অন্যান্য গ্রন্থে পাওয়া যায়।

পরবর্তী যুগে এই ঐতিহ্য আরও বিস্তৃত হয়। খতিব বাগদাদি (রহ.) এ বিষয়ে ‘আর-রিহলা ফি তালাবিল হাদিস’ নামে স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেন। এতে সাহাবি, তাবেঈ ও পরবর্তী আলেমদের হাদিস অন্বেষণে সফরের বিভিন্ন ঘটনা সংকলিত হয়েছে।

আরও পড়ুন: ইমাম বুখারির দেখা সেই স্বপ্নটি

সনদ ও বর্ণনাকারীর যাচাই

হাদিসের বর্ণনায় মতন ও সনদ এই দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। মতন হলো হাদিসের মূল বক্তব্য, আর সনদ হলো সেই বক্তব্য কার কাছ থেকে কার কাছে বর্ণিত হয়ে রাসুলুল্লাহ (স.) পর্যন্ত পৌঁছেছে, তার ধারাবাহিকতা।

কেউ বললেন, ‘আমি অমুকের কাছে শুনেছি।’ মুহাদ্দিসরা এতেই থেমে যেতেন না। তাঁরা দেখতেন, দুজন একই সময়ে ছিলেন কি না, তাঁদের সাক্ষাতের সুযোগ ছিল কি না এবং একজন সত্যিই অন্যজনের কাছ থেকে হাদিসটি শুনতে পেরেছিলেন কি না।

বর্ণনাকারীর জীবনও হয়ে ওঠে গবেষণার বিষয়। তিনি সত্যবাদী ও আমানতদার কি না, তাঁর স্মরণশক্তি কেমন, কার কাছে পড়েছেন, কারা তাঁর কাছ থেকে হাদিস শুনেছেন- এসব তথ্য সংরক্ষণ করা হতো। এভাবেই বর্ণনাকারীদের গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য জারহ ওয়া তাদিল নামে একটি বিস্তৃত শাস্ত্র গড়ে ওঠে।

সৎ হওয়াই সব সময় যথেষ্ট ছিল না। একজন সৎ মানুষও স্মৃতির দুর্বলতার কারণে কোনো কথা ভুলভাবে বর্ণনা করতে পারেন। তাই চরিত্রের পাশাপাশি তাঁর বর্ণনার নির্ভুলতাও গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হতো।

একই হাদিসের সব সূত্র মিলিয়ে দেখা

মুহাদ্দিসরা একটি সূত্র পেয়েই সিদ্ধান্ত নিতেন না। একই হাদিসের অন্য সূত্র খোঁজা হতো। বিভিন্ন বর্ণনায় শব্দের পার্থক্য, বাড়তি-কমতি বা কোনো অসংগতি আছে কি না, তা তুলনা করে দেখা হতো।

কখনো একজন নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীও আরও নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের বিপরীত কিছু বর্ণনা করতে পারেন। আবার বাইরে থেকে সনদ নির্ভুল মনে হলেও তার ভেতরে সূক্ষ্ম কোনো ত্রুটি থাকতে পারে। এসব ত্রুটি শনাক্ত করার জন্য হাদিসশাস্ত্রে ইলাল নামে বিশেষ জ্ঞানচর্চা গড়ে ওঠে। এর জন্য প্রয়োজন ছিল দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, গভীর জ্ঞান ও অসাধারণ স্মৃতিশক্তি।

হাদিস সংরক্ষণও শুধু মুখস্থনির্ভর ছিল না। স্মৃতি, লিখিত নোট, উস্তাদের কাছ থেকে সরাসরি শ্রবণ এবং বিভিন্ন সূত্রের তুলনা সব মিলিয়েই নির্ভুলতা যাচাই করা হতো।

আরও পড়ুন: ইমাম মাহদি আসার পর কোন মাজহাব মানত হবে?

সহিহ হাদিসের পাঁচ শর্ত

মুহাদ্দিসদের পরিভাষায় একটি হাদিসকে সহিহ হিসেবে গ্রহণের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে পাঁচটি বিষয় দেখা হয়-

১. সনদ অবিচ্ছিন্ন হতে হবে।
২. বর্ণনাকারীরা ন্যায়পরায়ণ ও গ্রহণযোগ্য হতে হবে।
৩. তাঁদের বর্ণনা সংরক্ষণ ও স্মরণের ক্ষেত্রে নির্ভুলতা থাকতে হবে।
৪. বর্ণনাটি আরও নির্ভরযোগ্য বর্ণনার বিরোধী হবে না।
৫. বর্ণনায় কোনো গোপন বা সূক্ষ্ম ত্রুটি থাকবে না।

এসব শর্ত পূরণ না হলে হাদিসের মান ভিন্ন হতে পারে। হাদিসের গ্রহণযোগ্যতার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সহিহ, হাসান ও জঈফ উল্লেখযোগ্য। আর রাসুলুল্লাহ (স.)-এর নামে বানানো কথাকে বলা হয় মাওজু।

মুহাদ্দিসরা শুধু গ্রহণযোগ্য বর্ণনাকারীদের তথ্যই সংরক্ষণ করেননি। যাঁদের বর্ণনায় দুর্বলতা ছিল, তাঁদের সম্পর্কেও তথ্য লিপিবদ্ধ করেছেন, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম তাঁদের বর্ণনা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে পারে।

আজকের পাঠকের জন্য শিক্ষা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন অসংখ্য বক্তব্য ‘হাদিস’ নামে ছড়িয়ে পড়ে। কোনো বক্তব্যের শেষে ‘রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন’ লেখা থাকলেই তা হাদিস হয়ে যায় না। তথ্য সহজলভ্য হওয়া আর নির্ভুল হওয়া এক কথা নয়।

মুহাদ্দিসদের বড় শিক্ষা হলো- গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গ্রহণের আগে তার উৎস দেখা, বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করা এবং সম্ভব হলে একাধিক সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া। যাচাই ছাড়া রাসুলুল্লাহ (স.)-এর নামে কোনো কথা প্রচার করা তাই দায়িত্বশীল আচরণ নয়।

একটি হাদিসের জন্য মুহাদ্দিসরা দীর্ঘ সফর করেছেন, বর্ণনাকারীদের জীবন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেছেন এবং একটি বর্ণনার বিভিন্ন সূত্র গভীরভাবে তুলনা করেছেন। তাঁদের এই শ্রম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দ্বীনের কোনো কথা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আগে তার সত্যতা নিশ্চিত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

হাদিসের জ্ঞান শুধু সংগ্রহ করার বিষয় নয়। তা সঠিকভাবে সংরক্ষণ, যাচাই এবং দায়িত্বের সঙ্গে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াও একটি আমানত।

তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম, ভূমিকা; আল-আদাবুল মুফরাদ; খতিব বাগদাদি, আর-রিহলা ফি তালাবিল হাদিস; ইবনুস সালাহ, মুকাদ্দিমা; ইবনে হাজার, নুযহাতুন নাযার