Dhaka Mail Logo

ইসলাম

সত্য গোপন করা কি মিথ্যা বলার সমান?

ধর্ম ডেস্ক

০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩১ পিএম

সত্য বলা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক শিক্ষা, আর মিথ্যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু একটি প্রশ্ন প্রায়ই ওঠে- যে ব্যক্তি মুখে মিথ্যা বলেনি, কিন্তু জানা সত্যটিও বলেনি, সে কি দায়মুক্ত? দুটি বিষয় এক নয়। মিথ্যা হলো যা সত্য নয়, তা সত্য বলে প্রকাশ করা। আর সত্য গোপন করা হলো জানা কোনো সত্য প্রকাশ না করা। তবে পরিস্থিতি ও উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে সত্য গোপন করাও গুনাহের কাজ।

মিথ্যা কী

বাস্তবতার বিপরীত কথা বলাই মিথ্যা। কোনো ঘটনা ঘটেনি জেনেও ‘ঘটেছে’ বলা, কিংবা ঘটেছে জেনেও ‘ঘটেনি’ বলা দুটোই মিথ্যা।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘সত্য নেকির দিকে পরিচালিত করে, আর নেকি জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়। মানুষ সত্য বলতে বলতে একসময় আল্লাহর কাছে সিদ্দীক হিসেবে লিখিত হয়। আর মিথ্যা মানুষকে পাপের দিকে নিয়ে যায়, আর পাপ তাকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। মানুষ মিথ্যা বলতে বলতে একসময় আল্লাহর কাছে মহামিথ্যাবাদী হিসেবে লিখিত হয়।’ (সহিহ বুখারি: ৬০৯৪; সহিহ মুসলিম: ২৬০৭)

তাই মিথ্যা শুধু একটি ভুল কথা নয়। এটি মানুষের চরিত্র, বিশ্বাসযোগ্যতা ও নৈতিকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

আরও পড়ুন: মিথ্যা আশ্বাস: ইসলাম কী বলে

নীরব থাকা কি মিথ্যা?

কেউ কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিলে বা কোনো তথ্য প্রকাশ না করলে সেটি সরাসরি মিথ্যা নয়, কারণ সে অসত্য কিছু বলেনি। কেউ ব্যক্তিগত কোনো বিষয় জানতে চাইলে ‘এ বিষয়ে আমি আলোচনা করতে চাই না’ বলা মিথ্যা নয়।

তবে বিষয়টি গুরুতর হয়ে ওঠে, যখন নীরবতার উদ্দেশ্য হয় অন্যকে ধোঁকা দেওয়া, তার অধিকার নষ্ট করা কিংবা তাকে ভুল সিদ্ধান্তে ঠেলে দেওয়া।

যখন সত্য গোপন করা গুনাহ

আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ো না এবং জেনেশুনে সত্য গোপন করো না।’ (সুরা বাকারা: ৪২)

সাক্ষ্যের ক্ষেত্রে নির্দেশ আরও স্পষ্ট যে ‘তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না। যে তা গোপন করে, তার অন্তর পাপী।’ (সুরা বাকারা: ২৮৩)

লেনদেনের ক্ষেত্রেও সত্য গোপন করার ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা রয়েছে। একবার রাসুলুল্লাহ (স.) খাদ্যশস্যের একটি স্তূপে হাত ঢুকিয়ে ভেতরে ভেজা অংশ পেলেন। বিক্রেতা জানালেন, বৃষ্টিতে তা ভিজে গেছে। নবীজি (স.) বললেন, ভেজা অংশ ওপরে রাখলে না কেন, যাতে মানুষ তা দেখতে পায়? এরপর বললেন, ‘যে ধোঁকা দেয়, সে আমার সাথে কোনো সম্পর্ক রাখে না।’ (সহিহ মুসলিম: ১০২)

বিক্রেতা সরাসরি কোনো মিথ্যা বলেননি। তিনি পণ্যের ত্রুটি আড়াল করেছিলেন। কিন্তু এই গোপন করাই ক্রেতাকে না জানিয়ে বিক্রি করার ক্ষেত্রে প্রতারণার রূপ নিয়েছিল।

আরও পড়ুন: বন্ধুদের ঝগড়া মেটাতে মিথ্যা বললে কি সওয়াব হবে? 

যখন নীরব থাকাই উত্তম

এর অর্থ এই নয় যে, প্রতিটি জানা কথা সবাইকে বলতে হবে। ইসলাম ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানুষের সম্মানকেও মূল্য দিয়েছে। কারও গোপন কথা রক্ষা করা মিথ্যা নয়। অপ্রয়োজনীয় কথা এড়িয়ে চলাও ইসলামের শিক্ষার অংশ।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে, নয়তো চুপ থাকে।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

তাই সব সত্য প্রকাশ করা জরুরি নয়। নিজের ব্যক্তিগত বিষয়, অন্যের গোপন কথা কিংবা এমন তথ্য যা প্রকাশ করলে অকারণে কারও ক্ষতি বা অপমান হয়, সেসব ক্ষেত্রে নীরব থাকা দোষের নয়।

পার্থক্য বোঝার তিন প্রশ্ন

কোনো সত্য গোপন করা গুনাহ কি না, তা বুঝতে তিনটি প্রশ্ন সহায়ক।

প্রথমত, সত্যটি প্রকাশ করা কি দায়িত্ব ছিল?
সাক্ষ্য, লেনদেন বা এমন কোনো বিষয়ে যেখানে অন্যের সিদ্ধান্ত ওই তথ্যের ওপর নির্ভর করছে, সেখানে সত্য গোপন করা গুরুতর হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, নীরবতায় কারও হক নষ্ট হচ্ছে কি না?
কোনো তথ্য গোপন করার কারণে যদি অন্য ব্যক্তি আর্থিক, সামাজিক বা অন্যকোনো ক্ষতির শিকার হন, তাহলে ‘আমি তো মিথ্যা বলিনি’ বলে দায় এড়ানো যায় না।

আরও পড়ুন: বেশি চুপ থাকা মানুষকে নিয়ে ইসলাম কী বলে

তৃতীয়ত, উদ্দেশ্য কী?
নিজের গোপনীয়তা রক্ষা করা আর অন্যকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য তথ্য লুকানো এক বিষয় নয়।

আংশিক সত্যের ফাঁদ

আজকের সময়ে সত্য গোপন করার একটি পরিচিত রূপ হলো আংশিক সত্য বলা। এতে বলা কথাগুলো আলাদাভাবে সত্য হতে পারে, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য বাদ দেওয়ার কারণে শ্রোতা ভুল ধারণা পেতে পারেন।

বিজ্ঞাপন, ব্যবসা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক বিভিন্ন ক্ষেত্রেই এর উদাহরণ দেখা যায়। তাই সত্যবাদিতা শুধু এমন কথা না বলার নাম নয়, যা সরাসরি মিথ্যা। এমনভাবে সত্য উপস্থাপন করাও উচিত নয়, যাতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আড়াল করে অন্যকে বিভ্রান্ত করা হয়।

সত্যবাদিতার পূর্ণতা

সত্যবাদিতা শুধু মুখে মিথ্যা না বলার নাম নয়। একজন মুমিনের কথা, কাজ ও আচরণেও সত্যনিষ্ঠা থাকা প্রয়োজন।

আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো।’ (সুরা আহজাব: ৭০)

তাই কথা বলার আগে ভাবা দরকার- যা বলছি, তা সত্য কি না। আর চুপ থাকার আগে ভাবা দরকার- এই নীরবতায় কারও হক নষ্ট হবে কি না।

সব সত্য সবাইকে বলা জরুরি নয়। কিন্তু যে সত্য প্রকাশ করা দায়িত্ব, তা গোপন করে অন্যের ক্ষতি করা চলে না। কথা ও নীরবতা- দুটোই ন্যায়ের অধীন থাকলেই সত্যবাদিতা পূর্ণ হয়।

তথ্যসূত্র: সুরা বাকারা; সুরা আহজাব; সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম