বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

মিথ্যা আশ্বাস: ইসলাম কী বলে

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম

শেয়ার করুন:

মিথ্যা আশ্বাস: ইসলাম কী বলে

সমাজে অনেক সময় মানুষ নিজের স্বার্থসিদ্ধি করতে বা সাময়িক পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্যকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে থাকে। ইসলামি শরিয়তে এটি কেবল নৈতিক স্খলনই নয়, বরং একটি কবিরা গুনাহ এবং মুনাফিকের আলামত।

মিথ্যা আশ্বাসের প্রকৃতি

কাউকে এমন কোনো কথা দেওয়া যা পূরণ করার ইচ্ছা নেই, অথবা এমন কোনো আশা দেখানো যা বাস্তবে ধোঁকাবাজি- ইসলামের পরিভাষায় একে ‘ওয়াদা খেলাফ’ (প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ) এবং ‘খেয়ানত’ (বিশ্বাসঘাতকতা) বলা হয়।

একটি বাস্তব উদাহরণ

আমাদের যাপিত জীবনে এর প্রতিফলন প্রায়ই দেখা যায়। ধরুন, কোনো ব্যক্তি আর্থিক সংকটে পড়ে আপনার কাছে ঋণ চাইলেন এবং অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে কথা দিলেন যে, ‘আগামী মাসের ১০ তারিখে আমি অবশ্যই টাকাটা ফেরত দেব।’ অথচ মনে মনে তিনি জানেন যে, ১০ তারিখে টাকা দেওয়ার সক্ষমতা তার নেই বা ফেরত দেওয়ার নিয়তও নেই; স্রেফ টাকাটা পাওয়ার জন্যই তিনি এই আশ্বাস দিয়েছেন।

আরও পড়ুন: চাঁদাবাজি শুধু আইনভঙ্গ নয়, ইসলামেও মারাত্মক অপরাধ

ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, এই ব্যক্তি কেবল সময়মতো টাকা না দিয়ে একটি অপরাধ করেননি, বরং তিনি ‘মিথ্যা আশ্বাস’ ও ‘ধোঁকা’র মাধ্যমে একটি বড় ধরনের ঈমানি আমানত খেয়ানত করেছেন। একইভাবে, চাকুরির প্রলোভন দিয়ে কাউকে অপেক্ষায় রাখা বা রাজনৈতিক স্বার্থে জনগণকে এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া যা পূরণ করার কোনো পরিকল্পনা নেই- এসবই এই জঘন্য অপরাধের অন্তর্ভুক্ত।

কোরআন মাজিদের নির্দেশনা

পবিত্র কোরআনে মুমিনদের সত্যবাদিতা এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষার ওপর কঠোর তাকিদ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- ‘হে মুমিনগণ! তোমরা যা করো না, তা কেন বলো? তোমরা যা করো না, তা বলা আল্লাহর নিকট অত্যন্ত ক্রোধের বিষয়।’ (সুরা সফ: ২-৩)
আরেক আয়াতে প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন- ‘আর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করো। নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে তোমাদের কাছে কৈফিয়ত চাওয়া হবে।’ (সুরা ইসরা: ৩৪)

আরও পড়ুন: ৬ ক্ষেত্রে গিবত জায়েজ

হাদিসের আলোকে মিথ্যা আশ্বাসের ভয়াবহতা

রাসুলুল্লাহ (স.) মিথ্যা আশ্বাস দেওয়াকে মুনাফিকের অন্যতম প্রধান লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। নবীজি (সা.) ইরশাদ করেন, ‘মুনাফিকের চিহ্ন তিনটি: কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং আমানত রাখা হলে তাতে খেয়ানত করে।’ (সহিহ বুখারি: ৩৩)
এছাড়াও মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া এক ধরনের প্রতারণা। রাসুল (স.) কঠোরভাবে ঘোষণা করেছেন, ‘যে ব্যক্তি ধোঁকা দেয়, সে আমার দলভুক্ত নয়।’ (মুসলিম: ১০২)

সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব

মিথ্যা আশ্বাসের ফলে সমাজে গভীর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যেমন-

আস্থা সংকট: মানুষ একে অপরের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে, যা সামাজিক বন্ধন শিথিল করে দেয়।

মজলুমের বদদোয়া: মজলুমকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে প্রতারিত করলে মনের কষ্ট সীমাহীন পরিণতি ডেকে আনতে পারে। রাসুল (স.) মজলুমের বদদোয়া থেকে বাঁচার নির্দেশ দিয়েছেন।

মানসিক ক্ষতি: মিথ্যা আশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে মানুষ অনেক পরিকল্পনা করে, যা পণ্ড হয়ে গেলে সে চরম হতাশায় নিমজ্জিত হয়।

আরও পড়ুন: ১২ শ্রেণির মানুষকে ‘উম্মত নয়’ বলেছেন নবীজি

ফকিহ ও আলেমদের অভিমত

ইমাম গাজালি (রহ.) তাঁর ‘এহয়াউ উলুমিদ্দিন’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘ওয়াদা পালনে অসমর্থ হওয়া এক বিষয়, আর কাউকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। দ্বিতীয়টি জঘন্য অপরাধ।’ ফকিহদের মতে, যদি কেউ প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সময়ই মনে মনে তা ভঙ্গ করার নিয়ত রাখে, তাহলে সে মুনাফিকদের অন্তর্ভুক্ত হবে।

প্রতিকার ও সংশোধন

যদি কেউ অতীতে কাউকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে থাকেন, তবে তার করণীয় হলো:
১. আল্লাহর কাছে তওবা করা।
২. যার সাথে ধোঁকাবাজি করা হয়েছে, তার কাছে ক্ষমা চাওয়া।
৩. যদি সম্ভব হয়, তবে সেই ক্ষতি পূরণ করার চেষ্টা করা।

কাউকে মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া কেবল ‘কথার কথা’ নয়, এটি একজন মানুষের ঈমানি দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। একজন প্রকৃত মুসলিমের বৈশিষ্ট্য হলো- হয় সে সত্য প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাহায্য করবে, নতুবা বিনয়ের সাথে নিজের অপারগতা প্রকাশ করবে। কিন্তু কোনোভাবেই অন্যকে ধোঁকায় রাখবে না। 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর