বন্ধুদের মধ্যে ঝগড়া হলে মীমাংসাকারী অনেক সময় এমন কথা বলতে চান, যা শুনলে দুজনের মন নরম হয়। কিন্তু সেই কথা সত্য না হলে কি তা বলা যাবে, আর বললে কি সওয়াব হবে? ইসলামে মূলনীতি সত্য বলা। তবে মানুষের মধ্যে মীমাংসার ক্ষেত্রে হাদিসে বিশেষ ছাড়ের কথা এসেছে।
মীমাংসা বড় নেক আমল
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুমিনরা তো পরস্পর ভাই। কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপোষ মীমাংসা করে দাও।’ (সুরা হুজুরাত: ১০)
তিনি আরও বলেন, ‘তাদের অধিকাংশ গোপন পরামর্শে কোনো কল্যাণ নেই, তবে কল্যাণ আছে যে নির্দেশ দেয় সদকা, সৎকাজ ও মানুষের মধ্যে শান্তি স্থাপনের; আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় কেউ তা করলে তাকে অবশ্যই আমি মহা প্রতিদান দেব।’ (সুরা নিসা: ১১৪)
আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘আমি কি তোমাদের এমন আমলের কথা বলব না, যা নামাজ, রোজা ও সদকার চেয়েও উত্তম?’ সাহাবিরা বললেন, ‘অবশ্যই।’ তিনি বললেন, ‘পারস্পরিক সম্পর্ক সংশোধন করা। আর পরস্পরের মধ্যে ঝগড়া বাধানো ধ্বংসের কারণ।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৯১৯; জামে তিরমিজি: ২৫০৯)
আরও পড়ুন: ইসলাম 'ভালো বন্ধু' বলেছে যাদের
অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) দুজন মানুষের মধ্যে মীমাংসা করে দেওয়াকে সদকা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (সহিহ মুসলিম: ২২২৫)
মিথ্যার মূলনীতি
ইসলামে মিথ্যা বলা মূলত নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ (সুরা তাওবা: ১১৯)
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘সত্য পুণ্যের পথ দেখায়, আর পুণ্য জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়। মিথ্যা পাপের পথ দেখায়, আর পাপ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।’ (সহিহ বুখারি: ৬০৯৪; সহিহ মুসলিম: ২৬০৭)
মীমাংসার ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়
উম্মু কুলসুম বিনতে উকবা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘ওই ব্যক্তি মিথ্যাচারী নয়, যে মানুষের মধ্যে মীমাংসা করার জন্য ভালো কথা পৌঁছে দেয় কিংবা ভালো কথা বলে।’ (সহিহ বুখারি: ২৬৯২; সহিহ মুসলিম: ২৬০৫)
সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় আরও এসেছে, উম্মু কুলসুম (রা.) বলেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (স.)-কে তিনটি ক্ষেত্রে মিথ্যার অনুমতির কথা বলতে শুনেছেন: যুদ্ধ, মানুষের মধ্যে মীমাংসা এবং স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে।
আরও পড়ুন: ভাই ভাইয়ে দ্বন্দ্ব নিরসনে ইসলামের ৫ নির্দেশনা
সওয়াব মিথ্যার জন্য নয়
মিথ্যা বলাটাই সওয়াবের কাজ নয়। সওয়াবের বিষয় হলো মানুষের মধ্যে মীমাংসা করা এবং সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টা। হাদিসে মীমাংসাকারীকে ‘মিথ্যাবাদী নয়’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ মীমাংসার উদ্দেশ্যে শরিয়তসম্মত সীমার মধ্যে এমন কথা বলার অনুমতি রয়েছে, যা সাধারণ অবস্থায় বলা বৈধ হতো না। তাই কেউ যদি সত্যিই দুই বন্ধুর বিরোধ মেটানোর জন্য, কারও অধিকার নষ্ট না করে এবং ক্ষতি সৃষ্টি না করে এই বিশেষ ছাড়ের আওতায় কথা বলেন, তাহলে সওয়াবের আশা করা হবে তাঁর মীমাংসার কাজ ও ভালো নিয়তের কারণে, মিথ্যা বলার কারণে নয়।
সম্ভব হলে তাওরিয়া উত্তম
মীমাংসার ক্ষেত্রে সরাসরি মিথ্যার পরিবর্তে এমন কথা বলা উত্তম, যার একটি সত্য অর্থ রয়েছে। ফিকহের ভাষায় একে ‘তাওরিয়া’ বা ‘মা‘আরিজ’ বলা হয়।
ইমাম নববি (রহ.) সহিহ মুসলিমের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন, মীমাংসার ক্ষেত্রে এ ধরনের অনুমতির উদ্দেশ্য এমন কথা বলা, যা বাহ্যিকভাবে এক অর্থ প্রকাশ করলেও বক্তার উদ্দেশ্য অন্য একটি সত্য অর্থ হতে পারে। সম্ভব হলে এ পদ্ধতি অবলম্বন করা উচিত।
ইমাম গাজালি (রহ.) ইহইয়াউ উলুমিদ্দিনে উল্লেখ করেছেন, শরিয়তসম্মত কোনো লক্ষ্য সত্য কথা বলার মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব না হলে প্রয়োজনের ক্ষেত্রে মিথ্যার সুযোগ আসে।
সীমারেখা
এই ছাড় সাধারণভাবে মিথ্যা বলার অনুমতি নয়। তাই-
- সত্য বা তাওরিয়ার মাধ্যমে মীমাংসা সম্ভব হলে মিথ্যা বলার সুযোগ নেই।
- একজনের কথা অন্যজনের কাছে এমনভাবে পৌঁছানো যাবে না, যাতে বিরোধ আরও বাড়ে।
- অপবাদ, প্রতারণা বা নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য এই ছাড় ব্যবহার করা যাবে না।
- কারও সম্পদ, সম্মান, অধিকার বা নিরাপত্তা অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা মীমাংসার অজুহাতে বৈধ হয়ে যায় না।
তথ্যসূত্র: সুরা হুজুরাত, নিসা, তাওবা; সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, জামে তিরমিজি; শরহুন নববি আলা সহিহ মুসলিম, ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন




