ধর্ম ডেস্ক
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪২ পিএম
দোয়া করার পর মনে প্রশ্ন আসতেই পারে- আমার দোয়া কি কবুল হচ্ছে? কেউ মনে প্রশান্তি অনুভব করেন, কেউ কান্না করেন, আবার কেউ স্বপ্নে ভালো কিছু দেখেন। এসব কি দোয়া কবুলের লক্ষণ? কোরআন-হাদিসে কি এর কোনো নির্দিষ্ট উত্তর আছে?
আলেমদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দোয়া কবুল হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট ও নিশ্চিত লক্ষণ কোরআন বা সহিহ হাদিসে নির্ধারণ করা হয়নি। তাই কোনো স্বপ্ন, অনুভূতি বা হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনাকে নিশ্চিতভাবে দোয়া কবুলের আলামত বলা ঠিক নয়। তবে দোয়া সম্পর্কে কোরআন-হাদিসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আমার বান্দারা যখন আমার সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করে, (তখন বলে দিন যে) নিশ্চয় আমি অতি নিকটে। আহবানকারী যখন আমাকে আহবান করে আমি তার আহবানে সাড়া দেই।’ (সুরা বাকারা: ১৮৬)
আবার আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (সুরা গাফির: ৬০)
অর্থাৎ একজন মুমিনের দোয়া আল্লাহর কাছে পৌঁছায়। তবে সেই দোয়ার জবাব কখন, কীভাবে এবং কোন রূপে আসবে, তা আল্লাহর হেকমতের বিষয়।
রাসুলুল্লাহ (স.) জানিয়েছেন, কোনো মুসলিম এমন কোনো বিষয়ে দোয়া করলে যাতে গুনাহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় নেই, আল্লাহ তাকে তিনটির একটি দান করেন- হয় তার দোয়া দ্রুত কবুল করেন, অথবা তা আখেরাতের জন্য সঞ্চিত রাখেন, অথবা অনুরূপ কোনো অকল্যাণ তার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেন। সাহাবিরা বললেন, তাহলে তারা আরও বেশি দোয়া করবেন। নবীজি (স.) বললেন, আল্লাহ আরও বেশি দিতে পারেন। (মুসনাদ আহমদ)
এ থেকে বোঝা যায়, দোয়ার ফল শুধু চাওয়া বিষয়টি সঙ্গেসঙ্গে পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কখনো দোয়ার জবাব অন্যভাবে আসে, যা বান্দা তখন বুঝতেও নাও পারেন।
আরও পড়ুন: দোয়া কবুলের জন্য যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখবেন
কেউ দীর্ঘদিন দোয়া করেও নিজের চাওয়া পূরণ না হলে হতাশ হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (স.) দোয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করতে নিষেধ করেছেন।
তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের কারও দোয়া কবুল হতে থাকে, যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়া করে বলে, আমি দোয়া করেছি, কিন্তু আমার দোয়া কবুল হয়নি।’ (সহিহ বুখারি: ৬৩৪০; সহিহ মুসলিম: ২৭৩৫)
তাই দেরি হচ্ছে মনে করে দোয়া ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।
দোয়ার পর ভালো স্বপ্ন দেখা, মনের প্রশান্তি অনুভব করা, কান্না আসা কিংবা হঠাৎ কোনো সুযোগ তৈরি হওয়াকে কেউ কেউ দোয়া কবুলের আলামত মনে করেন। এসব অনুভূতি ব্যক্তিগতভাবে আশাব্যঞ্জক হতে পারে। তবে এগুলোকে দোয়া কবুল হওয়ার নিশ্চিত প্রমাণ বলা যায় না।
কারণ দোয়া কবুলের আগে এমন কোনো নির্দিষ্ট লক্ষণ শরিয়ত নির্ধারণ করেনি। তাই এসব অভিজ্ঞতার ওপর নিশ্চিত সিদ্ধান্ত না নিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে দোয়া চালিয়ে যাওয়া উচিত।
আরও পড়ুন: ৩ পদ্ধতিতে আল্লাহ দোয়া কবুল করেন
দোয়া কবুলের ক্ষেত্রে মানুষের জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (স.) এমন এক ব্যক্তির কথা বলেছেন, যে দীর্ঘ সফরে ধুলোমলিন অবস্থায় দুই হাত আকাশের দিকে তুলে দোয়া করে। কিন্তু তার খাদ্য, পানীয় ও পোশাক হারাম এবং সে হারাম দ্বারা লালিত হয়েছে। এরপর তিনি বলেন, ‘তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে?’ (সহিহ মুসলিম: ১০১৫)
তাই দোয়ার পাশাপাশি হালাল উপার্জন, হালাল খাবার এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার বিষয়েও সচেতন থাকা জরুরি।
দোয়া মানে চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়। চাকরির জন্য কেউ দোয়া করলে চাকরির সন্ধান ও প্রস্তুতিও নিতে হবে। অসুস্থ হলে সুস্থতার জন্য দোয়ার পাশাপাশি চিকিৎসাও নিতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যাতে তোমার উপকারে রয়েছে, তার প্রতি যত্নবান হও, আল্লাহর সাহায্য চাও এবং অক্ষম হয়ে বসে থেকো না।’ (সহিহ মুসলিম: ২৬৬৪)
দোয়া ও বৈধ চেষ্টা একসঙ্গে চলবে। ফলাফল আল্লাহর হাতে।
মূল কথা, দোয়া কবুল হওয়ার আগে নির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ দেখার কথা কোরআন বা সহিহ হাদিসে নেই। কান্না, মনের প্রশান্তি, স্বপ্ন বা কোনো আকস্মিক ঘটনাকে তাই নিশ্চিতভাবে দোয়া কবুলের আলামত বলা যায় না।
একজন মুমিনের কাজ হলো আল্লাহর কাছে দোয়া করা, দেরি হলে হতাশ না হওয়া, হালাল জীবনযাপন করা এবং বৈধ উপায়ে নিজের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। দোয়ার জবাব কখনো চাওয়া বিষয়টি পাওয়ার মাধ্যমে আসে, কখনো অন্যকোনো অকল্যাণ দূরে সরে যায়, আবার কখনো তা আখেরাতের জন্য সঞ্চিত থাকে।
তথ্যসূত্র: সুরা বাকারা ১৮৬; সুরা গাফির ৬০; সহিহ বুখারি: ৬৩৪০; সহিহ মুসলিম: ১০১৫, ২৬৬৪, ২৭৩৫; মুসনাদ আহমদ