ঢাকা মেইল ডেস্ক
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম
ইসলামের পবিত্র নগরী মক্কা ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে সামরিক অভিযান, অবরোধ, দখল ও সশস্ত্র হামলার মুখোমুখি হয়েছে। তবে ‘মক্কা কতবার আক্রান্ত হয়েছে’— এর সংখ্যা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। কারণ কোনো ঘটনায় নগরী অবরোধ করা হয়েছে, কোনো ঘটনায় দখল নেওয়া হয়েছে, আবার কোনোটি ছিল মক্কার ভেতরে সশস্ত্র বিদ্রোহ। প্রাচীন যুগের কিছু ঘটনার বিস্তারিত বিবরণও পরবর্তী ঐতিহাসিক সূত্রের ওপর নির্ভরশীল।
ইসলামপূর্ব যুগে মক্কার বিরুদ্ধে সবচেয়ে পরিচিত সামরিক অভিযান আবরাহার। ইয়েমেনের শাসক আবরাহা কাবা ধ্বংসের উদ্দেশ্যে হাতির বাহিনী নিয়ে মক্কার দিকে অগ্রসর হন বলে ইসলামি ঐতিহ্যে বর্ণিত হয়েছে। কোরআনের সুরা ফিলে এ ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। তবে অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ পরবর্তী ইসলামি সূত্রে পাওয়া যায়।
৬৮৩ সালে আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইরের নিয়ন্ত্রণে থাকা মক্কা উমাইয়া বাহিনী অবরোধ করে। অবরোধের সময় কাবা ক্ষতিগ্রস্ত ও অগ্নিদগ্ধ হয়। ইয়াজিদের মৃত্যুর পর উমাইয়া বাহিনী অবরোধ তুলে নেয়।
৬৯২ সালে হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের নেতৃত্বে উমাইয়া বাহিনী আবার মক্কা অবরোধ করে। কয়েক মাসের সংঘর্ষের পর ইবনে জুবাইর নিহত হন এবং মক্কা উমাইয়া নিয়ন্ত্রণে আসে।
৮৬৫ সালে হাসানীয় বংশের ইসমাইল ইবনে ইউসুফ মক্কায় বিদ্রোহ করে নগরীর নিয়ন্ত্রণ নেন। মধ্যযুগীয় ঐতিহাসিক সূত্রে তার অনুসারীদের লুটপাটের কথাও পাওয়া যায়।
৯৩০ সালে কারমাতি নেতা আবু তাহির আল-জান্নাবির বাহিনী হজের সময় মক্কায় হামলা চালায়। এতে বহু মানুষ নিহত হন এবং কাবার হাজরে আসওয়াদ নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় দুই দশক পর পাথরটি মক্কায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
প্রথম সৌদি রাষ্ট্রের সম্প্রসারণের সময় সৌদি-ওয়াহাবি বাহিনী হিজাজে অগ্রসর হয়ে মক্কার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ১৮০৫ সালের শেষ দিকে মক্কা অবরোধের মুখে পড়ে এবং ১৮০৬ সালের জানুয়ারিতে শহরটি সৌদি-ওয়াহাবি নিয়ন্ত্রণে যায়।
আরও পড়ুন: মক্কায় ড্রোন হামলার নিন্দা বাংলাদেশের
এরপর উসমানি সাম্রাজ্যের পক্ষে মিসরের মুহাম্মদ আলী পাশার বাহিনী হিজাজে অভিযান চালায়। ১৮১৩ সালের ২৩ জানুয়ারি মক্কা পুনরায় উসমানি নিয়ন্ত্রণে আসে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় শরিফ হুসাইন ইবনে আলীর নেতৃত্বে আরব বিদ্রোহ শুরু হলে মক্কায় অটোমান বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। ১৯১৬ সালের জুন-জুলাইয়ে কয়েক সপ্তাহের লড়াইয়ের পর অটোমান বাহিনী মক্কা থেকে সরে যায়। সংঘর্ষের সময় মক্কায় গোলাবর্ষণও হয় এবং কাবা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিবরণ ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়।
হিজাজে সৌদি বাহিনীর অগ্রযাত্রার ধারাবাহিকতায় ১৯২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর মক্কা ইবনে সৌদের বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে। এর আগে হিজাজের রাজা হুসাইন ইবনে আলী মক্কা ছেড়ে জেদ্দায় চলে যান।
১৯৭৯ সালের ২০ নভেম্বর জুহাইমান আল-ওতাইবির নেতৃত্বে সশস্ত্র একদল ব্যক্তি মসজিদুল হারাম দখল করে। তারা মুসল্লিদের জিম্মি করে সৌদি সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। প্রায় দুই সপ্তাহের সংঘর্ষের পর সৌদি বাহিনী মসজিদুল হারামের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নেয়।
নির্দিষ্ট সংখ্যা বলা কঠিন। কারণ বহিরাগত সামরিক হামলার পাশাপাশি অবরোধ, সামরিক দখল এবং মক্কার ভেতরের সশস্ত্র বিদ্রোহও এই হিসাবের আওতায় আনা যায়।
তবে ইতিহাসে নথিভুক্ত বড় ঘটনাগুলোর মধ্যে আবরাহার অভিযান, ৬৮৩ ও ৬৯২ সালের উমাইয়া অবরোধ, ৮৬৫ সালের বিদ্রোহ, ৯৩০ সালের কারমাতি হামলা, উনিশ শতকের শুরুর দিকের সৌদি-উসমানি সংঘাত, ১৯১৬ সালের যুদ্ধ, ১৯২৪ সালের সৌদি দখল এবং ১৯৭৯ সালের মসজিদুল হারাম দখল উল্লেখযোগ্য।
৬৩০ সালের মক্কা বিজয় এখানে আলাদা করে ‘আক্রমণ’ হিসেবে ধরা হয়নি। কারণ এটি ছিল মুসলিম বাহিনীর সামরিক অভিযানের মাধ্যমে মক্কার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের ঘটনা, যা প্রচলিত অর্থে বহিরাগত শত্রুর হামলা নয়।
সুতরাং, মক্কার ইতিহাসে সামরিক হামলা, অবরোধ, দখল ও সশস্ত্র সংঘাতের একাধিক নথিভুক্ত ঘটনা রয়েছে। তবে এগুলোর একটি নির্দিষ্ট মোট সংখ্যা দাবি করা ইতিহাসের জটিলতার কারণে সতর্কতার সঙ্গে করা উচিত।
তথ্যসূত্র: আল-তাবারি, আল-আজরাকি, এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলাম, ব্রিটানিকা, ইয়ারোস্লাভ ট্রোফিমভ