Dhaka Mail Logo

ইসলাম

মুসলিম নাবিকরা কীভাবে সমুদ্রপথ চিনতেন

ধর্ম ডেস্ক

০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫১ পিএম

ইসলামি সভ্যতা ও বিস্মৃত ইতিহাস

আজকের নাবিকের হাতে জিপিএস, স্যাটেলাইট মানচিত্র ও আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু কয়েক শ বছর আগে এসব প্রযুক্তির কোনোটি ছিল না। অথচ ভারত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ জলপথে আরব ও মুসলিম নাবিকরা নিয়মিত যাতায়াত করতেন। ভারত, পূর্ব আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন বন্দরের সঙ্গে গড়ে উঠেছিল দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক যোগাযোগ।

প্রশ্ন হলো, আধুনিক নেভিগেশন প্রযুক্তি ছাড়া বিশাল সমুদ্রের মধ্যে তাঁরা পথ চিনতেন কীভাবে?

এর উত্তর খুঁজতে হলে তাকাতে হয় আকাশের নক্ষত্র, মৌসুমি বায়ু, সমুদ্রস্রোত, উপকূলের বৈশিষ্ট্য এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সঞ্চিত নাবিকদের অভিজ্ঞতার দিকে।

আকাশের নক্ষত্র ছিল অন্যতম দিকনির্দেশক

সমুদ্রের মাঝখানে চারপাশে যখন শুধু পানি, তখন নাবিকদের অন্যতম প্রধান সহায় ছিল আকাশ। আরব ও ভারত মহাসাগরের নাবিকরা বিভিন্ন নক্ষত্রের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে দিক ও অবস্থান সম্পর্কে ধারণা নিতেন।

বিশেষ করে ধ্রুবতারার উচ্চতা পর্যবেক্ষণ করে অক্ষাংশ সম্পর্কে ধারণা নেওয়া সম্ভব ছিল। এ কাজে ‘কামাল’ নামে পরিচিত একটি সরল নৌযন্ত্রও ব্যবহৃত হতো। কাঠের ছোট একটি পাত ও গিঁট দেওয়া দড়ি দিয়ে তৈরি এই যন্ত্রের সাহায্যে নাবিক নির্দিষ্ট নক্ষত্র ও দিগন্তের মধ্যকার কোণ মাপতেন। এর মাধ্যমে জাহাজের অক্ষাংশ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেত।

পরবর্তী সময়ে অ্যাস্ট্রোল্যাবের মতো জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্রও নৌ-নেভিগেশনে ব্যবহৃত হয়। ফলে সমুদ্রযাত্রা শুধু অনুমানের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। আকাশের নক্ষত্র ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ছিল পথনির্ণয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

আরও পড়ুন: ইসলামের স্বর্ণযুগ কখন ছিল, আবার আসবে কি?

মৌসুমি বায়ু ছিল সমুদ্রযাত্রার বড় চাবিকাঠি

ভারত মহাসাগরে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার জন্য মৌসুমি বায়ুর গতিপ্রকৃতি বোঝা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে এই অঞ্চলের বাতাসের প্রবাহের দিক পরিবর্তিত হয়। নাবিকরা দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এই পরিবর্তনের ধরন বুঝে নিয়েছিলেন।

এর ফলে কখন কোন বন্দর থেকে যাত্রা করা সুবিধাজনক এবং কোন সময়ে ফিরে আসা তুলনামূলক নিরাপদ- তা নির্ধারণ করা সম্ভব হতো। অর্থাৎ, সমুদ্রযাত্রায় শুধু দিক জানা নয়, সঠিক সময় নির্বাচনও ছিল নৌবিদ্যার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

১৫শ শতকের আরব নাবিক আহমাদ ইবনে মাজিদের রচনায় ভারত মহাসাগরের বিভিন্ন অঞ্চলের বাতাস, নৌপথ ও যাত্রার সময় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। তাঁর রচনাগুলো থেকে তৎকালীন নাবিকদের সমুদ্র সম্পর্কে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানের একটি ধারণা পাওয়া যায়। তাঁর কিতাব আল-ফাওয়ায়িদ গ্রন্থে ভারত মহাসাগর, লোহিত সাগর, পারস্য উপসাগরসহ বিভিন্ন জলপথ, বন্দর ও নৌযাত্রা সম্পর্কে বিস্তৃত তথ্য সংকলিত হয়েছে।

বাতাস, স্রোত ও উপকূলও ছিল পথের সংকেত

নাবিকদের জ্ঞান শুধু নক্ষত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁরা বাতাসের দিক, সমুদ্রস্রোত, ঢেউ এবং উপকূলের বৈশিষ্ট্যও পর্যবেক্ষণ করতেন।

কোন উপকূলের কাছে কী ধরনের পাহাড় বা ভূমিরেখা দেখা যায়, কোথায় প্রবালপ্রাচীর রয়েছে, কোথায় পানির গভীরতা কম এবং কোন বন্দরে কীভাবে প্রবেশ করতে হয়- এসব তথ্য ছিল নাবিকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অভিজ্ঞ নাবিকরা সমুদ্রের পরিবর্তিত পরিস্থিতি, বাতাস ও ঢেউয়ের ধরন এবং উপকূলের বিভিন্ন প্রাকৃতিক চিহ্নের সঙ্গে পরিচিত থাকতেন। এসব জ্ঞান দীর্ঘদিনের সমুদ্রযাত্রার মাধ্যমে অর্জিত হতো এবং পরবর্তী প্রজন্মের নাবিকদের কাছে পৌঁছে যেত।

মধ্যযুগীয় ভারত মহাসাগরের নেভিগেশন নিয়ে গবেষণায় নক্ষত্রনির্ভর পথনির্ণয়ের পাশাপাশি বাতাস, ঋতু, উপকূল, বন্দর ও সমুদ্রপথের তথ্য সংরক্ষণের বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে।

অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হয়েছিল নৌ-নির্দেশিকা

সমুদ্রযাত্রার অভিজ্ঞতা এক প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কোন পথে কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে, কোথায় প্রবালপ্রাচীর, কোন বন্দরে কীভাবে প্রবেশ করতে হয় এবং কোন মৌসুমে কোন পথে যাত্রা সুবিধাজনক- এসব তথ্য ধীরে ধীরে লিখিত নৌ-নির্দেশিকা ও সামুদ্রিক গ্রন্থে স্থান পায়।

আরও পড়ুন: চিকিৎসাবিজ্ঞানী ইবনে সিনার মেধা ও প্রতিভা

আহমাদ ইবনে মাজিদের বিখ্যাত গ্রন্থ কিতাব আল-ফাওয়ায়িদ ফি উসুল ইলম আল-বাহর ওয়াল-কাওয়ায়িদ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। গ্রন্থটিতে ভারত মহাসাগর, লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক অঞ্চলের নৌপথ, বন্দর, নক্ষত্রনির্ভর নেভিগেশন ও নৌযাত্রার নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা রয়েছে। লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, গ্রন্থটি ১৪৯০ সালের দিকে সংকলিত হয় এবং এতে সমুদ্রপথ ও বন্দর সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশনা রয়েছে।

ফলে একজন নাবিকের জ্ঞান শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত না। বহু প্রজন্মের নাবিকের অর্জিত অভিজ্ঞতাও লিখিত জ্ঞানের মাধ্যমে পরবর্তী নাবিকদের কাছে পৌঁছাত।

আহমাদ ইবনে মাজিদ: সমুদ্রজ্ঞান যার কলমে

মুসলিম সামুদ্রিক ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম আহমাদ ইবনে মাজিদ। ১৫শ শতকের এই আরব নাবিক ও লেখক সমুদ্রপথ, বন্দর, বাতাস, স্রোত এবং নক্ষত্রের মাধ্যমে নেভিগেশন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রচনা রেখে গেছেন। তাঁর রচনাগুলো মধ্যযুগীয় ভারত মহাসাগরের নৌ-নেভিগেশন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।

তাঁকে ঘিরে একটি বহুল প্রচলিত দাবি হলো, ১৪৯৮ সালে তিনি পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামাকে আফ্রিকা থেকে ভারত যাওয়ার পথ দেখিয়েছিলেন। তবে এ দাবির ঐতিহাসিক ভিত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। তাই ইবনে মাজিদকে দা গামার পথপ্রদর্শক হিসেবে নিশ্চিত ঐতিহাসিক তথ্যের ভাষায় উল্লেখ করা সতর্কতার সঙ্গে এড়িয়ে চলাই যুক্তিযুক্ত।

তবে এ দাবি সত্য হোক বা না হোক, ভারত মহাসাগরের নৌবিদ্যা সম্পর্কে ইবনে মাজিদের রেখে যাওয়া রচনাগুলো তাঁর সময়ের সামুদ্রিক জ্ঞানের মূল্যবান সাক্ষ্য।

তাহলে সমুদ্রপথ চিনতেন কীভাবে?

সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, মুসলিম নাবিকদের সমুদ্রপথ চেনার পদ্ধতি কোনো একক যন্ত্র বা কৌশলের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। আধুনিক জিপিএসের যুগে দাঁড়িয়ে এই পদ্ধতি বিস্ময়কর মনে হতে পারে, কিন্তু তাঁদের কাছে আকাশ ছিল দিকনির্দেশক, মৌসুমি বায়ু ছিল যাত্রার সময়ের সংকেত, সমুদ্রস্রোত ছিল পথের ইঙ্গিত, আর বহু প্রজন্মের অভিজ্ঞতা ছিল এক বিশাল অদৃশ্য মানচিত্র।

এই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই আরব ও মুসলিম নাবিকরা দীর্ঘ সময় ধরে ভারত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ জলপথে বাণিজ্য ও যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্কে অংশ নিয়েছিলেন।

তথ্যসূত্র: লাইব্রেরি অব কংগ্রেস; জি. আর. টিবেটস, ‘আরব নেভিগেশন ইন দ্য ইন্ডিয়ান ওশান’; আহমাদ ইবনে মাজিদের ‘কিতাব আল-ফাওয়ায়িদ’