ধর্ম ডেস্ক
০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০৮ পিএম
পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষ যখন একই ময়দানে সমবেত হন, তখন দেশ, ভাষা, বর্ণ ও সামাজিক অবস্থানের পার্থক্যগুলো যেন আড়ালে চলে যায়। আরাফাতের ময়দানে সবার পরিচয় একটাই- তারা আল্লাহর বান্দা।
পবিত্র মক্কা থেকে প্রায় ১৩-১৪ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত আরাফাতের ময়দান হেরেমের সীমানার বাইরে। জিলহজ মাসের ৯ তারিখে হজযাত্রীরা এখানে অবস্থান করেন। হজের অন্যতম প্রধান রুকন হলো আরাফাতে অবস্থান। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘হজ হলো আরাফা।’ (সুনানে তিরমিজি: ৮৮৯)
আরাফাতে অবস্থানের সময় হজযাত্রীরা আল্লাহকে স্মরণ করেন, দোয়া করেন এবং তাওবা-ইস্তেগফারে নিয়োজিত থাকেন। নিজের ভুল ও গুনাহের কথা স্মরণ করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ারও এটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।
আরাফার দিন তাই আত্মজিজ্ঞাসার সুযোগ তৈরি করে- জীবনের কোথায় ভুল হয়েছে, কারও অধিকার নষ্ট হয়েছে কি না, কোন গুনাহ থেকে ফিরে আসতে হবে এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক কতটা দৃঢ়-এসব নিয়ে ভাবার সময়।
আরও পড়ুন: আরাফাতের ময়দানে দাঁড়ালেই মানুষ কেন কেঁদে ওঠে?
আরাফাতের ময়দানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলমান একত্রিত হন। সম্পদ, বংশ, পদমর্যাদা কিংবা জাতীয়তা আল্লাহর কাছে মর্যাদার মাপকাঠি নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাবান, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াবান।’ (সুরা হুজুরাত: ১৩)
অর্থাৎ মানুষের মর্যাদার প্রকৃত মাপকাঠি সম্পদ বা সামাজিক অবস্থান নয়, তাকওয়া। আরাফাতের বিশাল সমাবেশ এই সত্যকে চোখের সামনে তুলে ধরে।
আরাফার দিনের দোয়ার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘শ্রেষ্ঠ দোয়া হলো আরাফার দিনের দোয়া।’ (সুনানে তিরমিজি: ৩৫৮৫)
সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, আরাফার দিনে আল্লাহ সবচেয়ে বেশি মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। (সহিহ মুসলিম: ১৩৪৮)
তাই এ দিন হজযাত্রীরা দোয়া, জিকির ও তাওবা-ইস্তেগফারে সময় কাটান। নিজের জন্য ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি পরিবার, আপনজন ও মুসলিম উম্মাহর জন্যও কল্যাণ কামনা করেন।
আরও পড়ুন: আরাফার ময়দানে কতক্ষণ থাকতে হবে, কী দোয়া পড়বেন- সম্পূর্ণ গাইড
আরাফাতের ময়দান মানুষকে তার সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করায়। দুনিয়ায় মানুষ যত পরিচয়ই বহন করুক, আল্লাহর সামনে সে তাঁর মুখাপেক্ষী বান্দা।
এই উপলব্ধি শুধু আরাফাতের ময়দানে থাকার সময়ের জন্য নয়। হজশেষে মানুষের জীবনেও এর প্রভাব থাকা উচিত। অহংকার থেকে দূরে থাকা, মানুষের অধিকার আদায় করা, গুনাহ থেকে ফিরে আসা এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করা- এসবই আরাফাতের শিক্ষা জীবনে ধারণ করার অংশ।
আরাফাতে দাঁড়িয়ে ক্ষমা চাওয়ার পরও যদি মানুষের প্রতি অন্যায়, অহংকার কিংবা জুলুমের অভ্যাস থেকে যায়, তাহলে সেই আত্মশুদ্ধির প্রভাব জীবনে কতটা পড়েছে, তা নিয়ে ভাবা দরকার।
আরাফাতের সঙ্গে বিদায় হজের স্মৃতি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। বিদায় হজে রাসুলুল্লাহ (স.) মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের মর্যাদা এবং পারস্পরিক অধিকারের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন।
কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে। পরে তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরের পরিচয় জানতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাবান, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াবান।’ (সুরা হুজুরাত: ১৩)
আরাফাতের ময়দানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলমানের সমাবেশ তাই সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও তাকওয়ার একটি শক্তিশালী স্মারক।
দুনিয়ায় মানুষ যত পরিচয়ই বহন করুক, আল্লাহর সামনে তার সবচেয়ে বড় পরিচয়- সে তাঁর বান্দা। আরাফাতের ময়দান সেই সত্যটিই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। সেখানে দেশ, বর্ণ ও মর্যাদার পার্থক্য মুছে গিয়ে মানুষ এক রবের সামনে দাঁড়ায়। আরাফাত তাই বান্দাত্বের পরিচয় নতুন করে ফিরে পাওয়ার এক অনন্য স্থান।
তথ্যসূত্র: সুরা হুজুরাত: ১৩; সুনানে তিরমিজি: ৮৮৯, ৩৫৮৫; সহিহ মুসলিম: ১৩৪৮