ধর্ম ডেস্ক
২৭ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫৯ পিএম
হিজরি বর্ষপঞ্জির তৃতীয় মাস রবিউল আউয়াল। রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনা এ মাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় মুসলিমদের কাছে মাসটি বিশেষভাবে পরিচিত। এ সময় নবীজি (স.)-এর সীরাত, সুন্নাহ ও আদর্শ নিয়ে আলোচনা ও চর্চা বাড়ে।
তবে একটি বিষয় শুরুতেই স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন- কোরআন ও সহিহ হাদিসে রবিউল আউয়াল মাসের জন্য আলাদাভাবে নির্ধারিত কোনো বিশেষ নামাজ, রোজা, জিকির বা ইবাদতের কথা পাওয়া যায় না। তাই এ মাসের নির্দিষ্ট কোনো দিন বা রাতকে বিশেষ ফজিলতের আমলের জন্য নির্ধারণ করতে হলে নির্ভরযোগ্য দলিল থাকা জরুরি।
তবে রবিউল আউয়ালে অন্যান্য সময়ের মতোই সব প্রমাণিত নেক আমল করা যায়। নবীজি (স.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ, সীরাত অধ্যয়ন, দরুদ পাঠ, দান-সদকা ও মানুষের উপকার করার মতো আমলগুলো সারা বছরই করা যায়। রবিউল আউয়ালও এসব আমলের চর্চা বাড়ানোর একটি সুন্দর উপলক্ষ হতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো তাঁর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠ করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর ওপর দরুদ পাঠান। হে মুমিনরা, তোমরাও তাঁর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠ করো।’ (সুরা আহজাব: ৫৬)
হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি নবীজি (স.)-এর ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর ১০ বার রহমত নাজিল করেন। (সুনান নাসায়ি: ১২৯৭)
তাই রবিউল আউয়ালে বেশি বেশি দরুদ পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। তবে এটিকে শুধু এ মাসের জন্য নির্ধারিত বিশেষ আমল মনে করা যাবে না।
আরও পড়ুন: দরুদ শরিফের আধ্যাত্মিক শক্তি ও প্রভাব
রবিউল আউয়ালের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক একটি সুন্নাহ হলো সোমবারের নফল রোজা। রাসুলুল্লাহ (স.) সোমবারের রোজার কারণ হিসেবে নিজের জন্মের দিনের কথা উল্লেখ করেছেন।
হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.)-কে সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘এ দিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনই আমার ওপর ওহি নাজিল হয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)
তাই রবিউল আউয়ালের কোনো নির্দিষ্ট তারিখকে কেন্দ্র করে বিশেষ রোজা নির্ধারণ না করে সোমবারের সুন্নাহ অনুযায়ী নফল রোজা রাখা যেতে পারে।
রবিউল আউয়ালকে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জীবন ও আদর্শ জানার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে। তাঁর দাওয়াতের পদ্ধতি, ইবাদত, পারিবারিক জীবন, মানুষের সঙ্গে আচরণ, ক্ষমাশীলতা, ন্যায়বিচার ও সমাজ সংস্কারের শিক্ষা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সীরাত ও হাদিসের গ্রন্থ পড়া যেতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহজাব: ২১)
সীরাত পড়ার পাশাপাশি সেখান থেকে একটি শিক্ষা নিজের জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করাও গুরুত্বপূর্ণ। নির্ভরযোগ্য অনুবাদ ও সংস্করণ যাচাই করে সীরাতের গ্রহণযোগ্য গ্রন্থ পড়া যেতে পারে।
আরও পড়ুন: জীবনে অন্তত একবার নবীজির সীরাত পড়ুন: শায়খ আহমাদুল্লাহ
নবীজি (স.)-এর প্রতি ভালোবাসার প্রকৃত প্রকাশ তাঁর অনুসরণে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ করো। আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপগুলো ক্ষমা করবেন।’ (সুরা আলে ইমরান: ৩১)
তাই এ মাসে নতুন কোনো বিশেষ আমল খোঁজার পাশাপাশি নামাজ, লেনদেন, পারিবারিক আচরণ, প্রতিবেশীর অধিকার, সত্যবাদিতা ও আমানতদারির মতো বিষয়ে নবীজি (স.)-এর সুন্নাহ অনুসরণের অঙ্গীকার করা যেতে পারে।
গরিব-দুঃখীকে সাহায্য করা, ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া, অসুস্থের খোঁজ নেওয়া, ঋণগ্রস্তকে সহযোগিতা করা এবং মানুষের প্রয়োজন পূরণে এগিয়ে আসা ইসলামে প্রশংসনীয় আমল।
রবিউল আউয়ালেও এসব নেক কাজ করা যায়। তবে এগুলোকে এই মাসের জন্য নির্ধারিত বিশেষ আমল মনে করা যাবে না। এগুলোর ফজিলত সাধারণভাবে কোরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত।
নবীজি (স.)-এর জীবনে মানুষের প্রতি দয়া, সহমর্মিতা ও কল্যাণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে মানুষের উপকার করাও নবীপ্রেমের সুন্দর প্রকাশ হতে পারে।
আরও পড়ুন: মানুষের উপকার করার ফজিলত
তাহাজ্জুদ, নফল নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, ইস্তেগফার ও দোয়া এসব উত্তম আমল। রবিউল আউয়ালে এগুলোর চর্চা বাড়ানো যেতে পারে।
তবে এসব আমলের কোনো একটিকে রবিউল আউয়ালের বিশেষ আমল হিসেবে নির্ধারণ করার জন্য আলাদা শরিয়তসম্মত দলিল প্রয়োজন। তাই এগুলো সাধারণ নেক আমল হিসেবেই করা উচিত।
১২ রবিউল আউয়াল রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ইন্তেকালের তারিখ হিসেবে একটি প্রসিদ্ধ মত রয়েছে। তাঁর জন্মতারিখ নিয়েও ঐতিহাসিকদের মধ্যে একাধিক মত রয়েছে। তাই কোনো নির্দিষ্ট তারিখকে কেন্দ্র করে রবিউল আউয়ালকে শরিয়ত নির্ধারিত শোকের মাস মনে করার সুযোগ নেই।
এ মাসে বিয়ে, ব্যবসা, নতুন কাজ শুরু বা অন্য কোনো বৈধ আনন্দের বিষয়কে অশুভ মনে করে বর্জন করারও শরিয়তসম্মত ভিত্তি নেই। ইসলামে কোনো মাসকে এভাবে অশুভ মনে করার শিক্ষা নেই।
রবিউল আউয়ালকে কেন্দ্র করে নবীজি (স.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে এমন কোনো আমলকে বিশেষ সওয়াবের কাজ হিসেবে নির্ধারণ করা উচিত নয়, যার পক্ষে নির্ভরযোগ্য দলিল নেই।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন সংযোজন করে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।’ (সহিহ বুখারি: ২৬৯৭, সহিহ মুসলিম: ১৭১৮)
তাই নবীজি (স.)-এর প্রতি ভালোবাসার ক্ষেত্রেও আবেগের পাশাপাশি কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।
রবিউল আউয়ালকে কেন্দ্র করে সীরাতচর্চা শুরু করে তা সারা বছর চালিয়ে নেওয়া যেতে পারে। প্রতিদিন কিছু সময় নবীজি (স.)-এর জীবন পড়া, তাঁর একটি সুন্নাহ নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা এবং পরিবারে তাঁর জীবন ও চরিত্র নিয়ে আলোচনা করার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।
নবীজি (স.) কীভাবে মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন, পরিবার ও প্রতিবেশীর সঙ্গে কেমন আচরণ করতেন, বিপদে কীভাবে ধৈর্য ধরতেন এবং ক্ষমতার মুহূর্তে কীভাবে ক্ষমা করতেন-এসব জানার মধ্য দিয়ে তাঁর আদর্শ জীবনে ধারণ করার সুযোগ তৈরি হয়।
রবিউল আউয়ালের জন্য আলাদাভাবে নির্ধারিত কোনো বিশেষ ইবাদত সহিহ দলিলে প্রমাণিত নেই। তবে এ মাসকে নবীজি (স.)-এর জীবন, আদর্শ ও সুন্নাহ নতুন করে জানার একটি উপলক্ষ হিসেবে নেওয়া যেতে পারে।
বেশি বেশি দরুদ পাঠ, সোমবার নফল রোজা, সীরাত অধ্যয়ন, সুন্নাহ অনুসরণ, কোরআন তেলাওয়াত, ইস্তেগফার, দান-সদকা ও মানুষের উপকার এসব আমল করা যায়। এগুলোকে রবিউল আউয়ালের বিশেষ আমল মনে না করে সাধারণ নেক আমল হিসেবেই করা উচিত।
নবীজি (স.)-এর প্রতি ভালোবাসা শুধু মুখের দাবি নয়। তাঁর দেখানো পথে চলা, তাঁর চরিত্র ধারণ করা এবং তাঁর সুন্নাহকে জীবনের অংশ করে নেওয়াই সেই ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ।
রবিউল আউয়াল তাই হোক নবীজি (স.)-কে নতুন করে জানার, তাঁর সুন্নাহ অনুসরণের অঙ্গীকার করার এবং সেই ভালোবাসাকে নিজের জীবনে বাস্তবায়নের সময়।
তথ্যসূত্র: পবিত্র কোরআন, সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম ও সুনানে নাসায়ি